

মো. আবুল হাসেম, মাটিরাঙ্গা (খাগড়াছড়ি) প্রতিনিধি: খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার মাহবুব মেম্বার পাড়ার মাহবুব মেম্বার কুল চাষ করে বাজিমাত করেছেন। তিনি ১.৬০ একর জমিতে ৮৫০টি কুলগাছ রোপণ করে এ বছর প্রায় ১২ লাখ টাকা আয় করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তার এ সাফল্য দেখে অন্যরাও ঝুঁকছেন কুল চাষে।
মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি অফিস থেকে জানা যায়, অত্র উপজেলায় ২৮ হেক্টর জমিতে কুল চাষ করা হয়। সম্ভাব্য উৎপাদন ২৮০ মেট্রিক টন। এ বছর পুরো উপজেলায় প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার কুল বিক্রি করা যেতে পারে।
মাহবুব মেম্বার মাটিরাঙ্গার গোমতী ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার। জনপ্রতিনিধিত্ব ছেড়ে কৃষি কে প্রধান পেশা হিসেবে আঁকড়ে ধরেছেন তিনি। কুল বাগানের জমিতে পূর্বে তামাক, ধান ও বিভিন্ন সবজির চাষ করা হতো। এসব জমিতে বিভিন্ন জাতের কুল চাষ করে বেশ লাভবান তিনি। দৃষ্টিনন্দন বাগানটি দেখতে আশপাশের লোকজন ছুটে আসেন এখানে। ভেতরে ডুকতে না পারলেও দুর থেকে লালচে সবুজ বড়ই দেখে একটি সেলফি তুলেই তৃপ্তি মিটছে অনেকের।
স্বাদ ও পুষ্টিতে মৌসুমি ফল কুল একটি উৎকৃষ্ট মানের ফল। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং শক্তি প্রদান করে। কুলে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং ভিটামিন সি, এ, বি-কমপ্লেক্স, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং আয়রন রয়েছে, যা শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে এবং বিভিন্ন রোগ থেকে রক্ষা করে।
সরেজমিনে বাগান গুরে দেখা যায়, সবুজ, সোনালী হলুদ আভার বল সুন্দরী কুল দুলছে বাগানে। প্রতিটি গাছের থোকায় থোকায় ঝুলে আছে কুল। কুল বাগান থেকে কুল সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত শ্রমিক, তারা খুব যত্নে গাছ থেকে কুল পেরে বাজার জাত করেন। বাদুড়, কাঠবিড়ালী ও বিভিন্ন পতঙ্গের হাত থেকে রেহাই পেতে পুরো বাগানের উপরিভাগ থেকে চারদিকে নেট ও চারপাশ তারকাঁটা দিয়ে ঘেরাও দেয়া হয়েছে। এছাড়াও বাগান ঘুরে কিছু উৎসুক জনতার দেখা মিলেছে, তারা বাগান থেকে সতেজ কুল ক্রয় করতে এসেছে।
কুল চাষ অত্র অঞ্চলে বেশ লাভজনক হয়ে উঠেছে মন্তব্য করে মাহবুব মেম্বার বলেন, গত বছরের মার্চ মাস থেকে কুল গাছ লাগানো শুরু করেন তিনি। বল সুন্দরী, বাউকুল, আপেল কুল, কাশ্মীরীকুল মিলে চার প্রজাতির ৮৫০টি কুল গাছ রয়েছে এ বাগানে। প্রতিদিন ১০/১২জন শ্রমিক এ বাগানে কাজ করে তাদের সংসার চালায়। এবছর গাছ প্রতি ১৪/১৫ কেজি কুল এসেছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর সবকটি গাছে ফল এসেছে। এভাবে টানা ৫-৭ বছর পর্যন্ত ফল বিক্রি করা যাবে। পুরো বাগানে প্রথামবারে খরছ লেগেছে ৪লাখ। গত বছর প্রায় ৭ লাখ টাকার কুল বিক্রি করা হয়েছে। এবার বিক্রি বেড়ে ১২ লাখ টাকা হতে পারে বলে তিনি জানান।

তিনি আরো বলেন, সরকারি সহায়তা এবং প্রশিক্ষণ পেলে আমরা আরও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়াতে পারবো। তবে পরিবহনের সমস্যা ও ন্যায্য মূল্য পাওয়া আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। যদি সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো আমাদের আরও সহযোগিতা করে, তাহলে আমরা আরও লাভবান হতে পারব এবং দেশের ফলের চাহিদা পূরণেও ভূমিকা রাখতে পারব।
বাগানের শ্রমিক দীপু ত্রিপুরা বলেন, আমি প্রতিদিন সকালে কুল গাছগুলোর পরিচর্যা করি। প্রথমেই মাটির অবস্থা দেখি, যদি শুকনো থাকে, তাহলে পানি দেই। আগাছা পরিষ্কার করে গাছের চারপাশের মাটি নরম করি, যাতে গাছ ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পারে। কুল গাছে বিভিন্ন রোগবালাই হয়, সেগুলো প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় কীটনাশক বা জৈব সার ব্যবহার করি। ফল উত্তোলন শেষে প্রোনিং করি যাতে নতুন ডালপালা গজায় এবং বেশি ফল ধরে। আমাদের পরিশ্রমের ফল যখন সুস্বাদু কুল হয়ে বাজারে যায়, তখন খুব ভালো লাগে। কুল চাষ শুধু কাজ নয়, এটি আমাদের জীবিকারও অংশ।
কুল ক্রয় করতে আসা জোনায়েদ বলেন, গাছ থেকে কুল পাড়ার আনন্দ নিতে কুল ক্রয় করতে এসেছি। প্রাকৃতিক এবং ভেজালমুক্ত বিধায় বেশি করে কুল কিনে স্বজনদের বাসায় পাঠাবো।
মাটিরাঙ্গা উপ-সহকারী কৃষি অফিসার মো. জয়নাল আবেদিন বলেন, সঠিক নিয়মে কুল চাষ করলে কৃষকরা ভালো লাভ করতে পারেন। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ও সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে ফলন বাড়ানো সম্ভব। কৃষক মাহবুব মেম্বার গত বছর কুল বাগানটি করেছেন। উপজেলা কৃষি অফিস থেকে তাকে সকল প্রকার পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে। গত বছরের চেয়ে এবছর বেশ ভাল ফলন হয়েছে।
মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. সবুজ আলী বলেন, রৌদ্রুজ্জ্বল, উচুঁ জমিতে কুল বাগান ভালো হয়। যে বাগানে যত বেশি রোদের আলো লাগবে সেই জমির কুল বেশি মিষ্টি হবে। তাছাড়া কুল গাছে তুলানামূলক রোগ-বালাইও কম। নতুনভাবে কেউ যদি বিভিন্ন কুলের বাগান করতে পরামর্শ চান তাকে অবশ্যই সার্বিক সহযোগিতার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হবে।
