

জসিম সিদ্দিকী, কক্সবাজার: কক্সবাজারের ঐতিহ্যবাহী বাঁকখালী নদীর পাড় থেকে কয়েক বছর ধরে কৃষিজমি সুরক্ষা আইনের তোয়াক্কা না বালু মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করছেন স্থানীয় প্রভাবশালী ভূমিদূস্যরা। এ নিয়ে রহস্যজনক কারণে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করে আসছেন। এতে জনৈক দিদার বলী ও তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। তারা ফসলি জমি ও বাঁকখালী নদী থেকে বালু-মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করছেন।
পাশাপাশি রামু উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ির উমখালী গ্রামের নদীর পাড়সহ রেললাইনের পাশের অন্ততপক্ষে ৫টি স্থানে দিন রাত সমানতালে মাটি লুট করা হচ্ছে। জমির কয়েকজন মালিকদের অল্প কিছু টাকা দিয়ে জোরজবরদস্তি করে মাটি কাটতে সহযোগিতা করছেন। প্রতিবাদ করলে মারধর ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন সচেতন গ্রামবাসী। এভাবেই ফসলি জমিসহ রেল লাইনের পাড় কেটে বিক্রি করে গত কয়েক বছরে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন মাটি খেকো চক্রটি।
যার কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন রাজারকুল-মিঠাছড়ি সড়কের চলাচলকারী পথচারীরা। ধরপাড়া এলাকার পশ্চিমের বিলে ২টি, গণি সওদাগর পাড়া বিলে ২টি, রাজারকুল ১ নং ওয়ার্ড মৌলভি পাড়া বিলে ১টি, পূর্ব উমখালী ফল্লানের বিলে ১টি স্কেভেটর দিয়ে দিন রাত সমান তালে ফসলী জমির মাটি কাটছে দিদার বলী নামের একজন।
উপজেলার মিঠাছড়ির প্রায় সাত বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলছে তাদের লুটতরাজ। তারা দিনে অন্তত ৬ শত গাড়ি মাটি বিক্রি করছেন। যার আনুমানিক বাজার মূল্য ৬০ হাজার টাকা। এদিকে তাদের কারণে নিঃস্ব হয়েছে অসংখ্য মানুষের ঘরবাড়ি।
স্থানীয়রা বলছেন, মাটি লুট চক্রের সঙ্গে প্রশাসনেরও চলে চোর-পুলিশ খেলা। মাঝে মাঝে অভিযান হয়। কিছুদিন পর যে কে সেই। এভাবেই চলছে বছরের পর বছর।
দেখা যায়, বসতভিটার কিছু দূরেই ফসলি জমি। পাশেই বাঁকখালী নাদী। নদীর দু’পাড়ের মাঠে সবজির সমারোহ। চাষ করা হয়েছে ধান, বেগুন, মরিচ, মুলা, শাকসহ বিভিন্ন জাতের সবজি। এসব ক্ষেতের পাশেই অনেক জমি ৮ থেকে ১০ ফুট নীচু। সেখান থেকে স্কেভেটর দিয়ে মাটি কেটে নেয়া হচ্ছে ইটভাটা ও বিভিন্ন স্থাপনা ভরাটের কাজে। এই চিত্র রামুর চাকমারকুল ইউনিয়নের কলঘর বাজারের এন আলম ফিলিং স্টেশনের সামনে ফুয়ারচর এলাকার।
স্থানীয়রা আরও বলছেন, জোরপূর্বক ফসলি জমি থেকে গভীরভাবে খনন করে মাটি ও বালু উত্তোলন করায় আশপাশের জমি ভেঙ্গে পড়ছে। কৃষকরা সব সময় আতঙ্কে থাকেন কখন কার জমি ভেঙ্গে পাশের গর্তে পড়ে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সাথে মোটা অঙ্কের মাসোহারা ভিত্তিক চুক্তিতে বছরের পর বছর বিস্তীর্ণ ফসলি জমির বুকে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে আসছেন স্থানীয় জিয়াবুল ও তার ছেলে জামশেদ। তারা ওই এলাকার ফসলি জমির শত্রুর হয়ে উঠেছেন।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, সব মহলকে ম্যানেজ করে ফসলি জমি থেকে মাটি-বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে জোর প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন জামশেদ। তাই ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেন না। তারা এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
আরও দেখা যায়, ফসলি জমির বুক চিরে ছুটছে বড় বড় ট্রাক। লক্ষ্য বাঁকখালীর তীর ও জমি থেকে কাটা মাটি ইট ভাটা এবং বিভিন্ন স্থাপনার কাজে নিয়ে যাওয়া। সামান্য অদূরেই চলছে বিস্তীর্ণ ফসলি জমির মাঝখান থেকে অত্যাধুনিক স্কেভেটর দিয়ে জমির মাটি কাটার কর্মযজ্ঞ। সে মাটি সংগ্রহে ব্যস্ত অসংখ্য ডাম্পারও রয়েছে। যেই জমির উপরিভাগে সবজি এবং ধান বুনা হতো সে জমিতে এখন বিশাল আকারের গর্ত। ওই গ্রামের চারপাশ ঘুরে দেখা যায় এক অন্যরকম কর্মব্যস্ততা।
এভাবেই কলঘর বাজারের পশ্চিম পাশের ফুয়ারচর এলাকার বাঁকখালীর তীরসহ বিপুল পরিমাণ ফসলি জমির বালু ও মাটি যাচ্ছে ইটভাটার পেটে। এতে করে ওই জমিগুলো যেমন উর্বরতা হারাচ্ছে তেমনি ধ্বংস হচ্ছে এসব ফসলি জমি। পরিবেশ অধিদপ্তর আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে ফসলি জমি ধ্বংসের মহোৎসব হরহামেশাই চোখে পড়ছে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন বলেন, এসব অবৈধ মাটি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ইউএনও এবং এসিল্যান্ডকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এদিকে সচেতন মহল মনে করেন, বাঁকখালী নদী থেকে বালু উত্তোলনের কারণে নদী ভাঙন বাড়ছে এবং নৌযান চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। প্রভাবশালীদের অবৈধ বালু উত্তোলন, বালু উত্তোলনকারীদের ঠেকানোর জন্য সাহস পাচ্ছেন না স্থানীয়রাও। এ ব্যাপারে তারা সংশ্লিষ্ট উচ্চ মহলের কাছে হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
