

ভারতে এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভের সফলতার পর পূর্ণকালীন রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে দলটি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়, মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা (নিট) ও বেশ কয়েকটি সরকারি চাকরির নিয়োগের প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদে বিক্ষুব্দ শিক্ষার্থী ও তরুণদের নিয়ে অনলাইনে গড়ে ওঠে ককরোচ জনতা পার্টি। মাসব্যাপী ব্যাপক আন্দোলনের পর শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিয়ে শনিবার (২৫ জুলাই) বিকেলে পদত্যাগ করেন দেশটির কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।
এরপর তারা আরো দুই দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিলে সেগুলোও যৌক্তিক বিবেচনায় সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তার আশ্বাসে আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্ষোভ প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় সিজেপির নেতারা।
এর পরপরই গুঞ্জন ওঠে, তরুণ ছাত্রজনতার সমর্থনে গড়ে ওঠা দলটি পূর্ণকালীন রাজনীতিতে নামার পরিকল্পনা করছে। তবে সেই সম্ভাবনাকে কেবলই গুজব বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন সিজেপির নেতারা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, “এই মুহূর্তে আমার মাথায় একটাই চিন্তা- বাড়ি গিয়ে ঘুমানো, কিছুটা বিশ্রাম নেওয়া এবং পরিবারের সঙ্গে দেখা করা। গত কয়েক মাস ধরে আমি বাড়ির বাইরে ছিলাম। এখন আমি সত্যিই কিছুটা স্বস্তিতে সময় কাটাতে চাই এবং গত দুই মাসে যা কিছু ঘটেছে, তা নিয়ে ভাবতে চাই।”
“আমার মনে হয়, ঘটনাগুলো আমাদের সবার জন্যই অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ও অভিভূত করার মতো। এটি গর্বের মুহূর্ত। এটি সত্যিই আনন্দিত ও স্বস্তি পাওয়ার মুহূর্ত। এরপর পরিস্থিতি কীভাবে এগোয়, তা আমরা দেখব”, যোগ করেন তিনি।
সরাসরি জানতে চাওয়া হয়, তিনি রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশের সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করছেন কি না। জবাবে রাঙ্কা বলেন, ‘আমার মনে হয়, ভারতে কোনো কিছুকেই কখনো না বলতে নেই।’
আশুতোষ ভবিষ্যতে রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে না দিলেও সিজেপির আরেক মুখপাত্র সৌরভ দাস জোর দিয়ে বলেন, রাজনীতিতে প্রবেশ করা তাদের সংগঠনের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য নয়।
তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে আমাদের লক্ষ্য একেবারেই স্পষ্ট। এই আন্দোলনকে তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। কারণ দেশে এরইমধ্যে ৭৫০ থেকে ৮০০টি রাজনৈতিক দল রয়েছে। অথচ তাদের কেউই তরুণদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারছে না।”
“আমরা আন্দোলনটিকে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে চাই, যাতে ক্ষমতায় যে রাজনৈতিক দল বা নেতাই থাকুন না কেন, তারা তরুণদের জন্য কাজ করতে এবং তাদের দাবি পূরণ করতে বাধ্য হন। এই মুহূর্তে এটিই আমাদের মূল লক্ষ্য”, যোগ করেন সৌরভ দাস।
শনিবার (২৫ জুলাই) শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সভাপতি জে পি নাড্ডা এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংয়ের সঙ্গে চূড়ান্ত বৈঠক করেন সিজেপি নেতারা। সরকার পক্ষের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বেশ ইতিবাচক জবাব দেন আশুতোষ রাঙ্কা।
বলেন, “বৈঠকের পরিবেশ আগের দফার আলোচনাগুলোর তুলনায় আলাদা ছিল। আজকের বৈঠকটি বেশ আন্তরিক পরিবেশে হয়েছে। আমার ধারণা, আমরা সেখানে পৌঁছানোর আগেই পদত্যাগ হয়ে গিয়েছিল। আলোচনার বেশির ভাগ অংশ বাকি দুটি দাবিকে কেন্দ্র করে হয়েছে।”
রাঙ্কা বলেন, “খুব দ্রুত একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়। এরপর আমরা সবাই একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেই, পুরো বিষয়টি আন্তরিক পরিবেশে শেষ করা হবে। আমরা যেভাবে চেয়েছিলাম, সরকার সেভাবে দাবিগুলো মেনে নেওয়ায় তাদের এ উদ্যোগের প্রশংসা করছি।”
শনিবার পদত্যাগের বিবৃতিতে ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের শেষ ১০ দিনের ঘটনাপ্রবাহ তাকে গভীরভাবে ‘ব্যথিত’ করেছে এবং বিষয়টি আর তার ব্যক্তিগত মর্যাদার প্রশ্ন নয়।
‘দেশবিরোধী শক্তি’ যেন পরিস্থিতির সুযোগ নিতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করতেই তিনি পদত্যাগ করেছেন বলে জানান। একই সঙ্গে ‘দেশের ঐক্য অটুট রাখা’, ‘একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎও যেন আইনি জটিলতায় আটকে না যায়’ এবং শিক্ষার্থীরা যেন পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে, সেটিও তিনি নিশ্চিত করতে চান।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে আন্দোলনের প্রতি সরকারের অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত ২০ জুন ভারতের রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টি অনির্দিষ্টকালের বিক্ষোভ শুরু করার পর এ আন্দোলন অনলাইন থেকে পুরোপুরি রাজপথে নেমে আসে।
সাবেক আম আদমি পার্টি নেতা অভিজিৎ দিপকের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি অল্প সময়ের মধ্যেই সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বৃহৎ যুব আন্দোলনে পরিণত হয়। পরে সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক আন্দোলনে যোগ দিলে তা আরো গতি পায়।
গত ২০ জুলাই কেন্দ্রীয় সরকার প্রথমবারের মতো ককরোচ জনতা পার্টির নেতাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে। একইসঙ্গে সরকার ওয়াংচুকের সঙ্গেও আলোচনা করে। তবে শিক্ষার্থীরা পার্লামেন্ট অভিমুখে পদযাত্রার কর্মসূচি দিলে তাতে বাধা দেয় পুলিশ। এতে দফায় দফায় দুই পক্ষ সংঘর্ষ জড়ালে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা থামাতে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে আলোচনার প্রস্তাব দেয় সরকার। কনস্টিটিউশন ক্লাবে দ্বিতীয় দফার আলোচনায় কেন্দ্র সরকারের আশ্বাস, প্রধানমন্ত্রী মোদির ভিডিও বার্তায় দেওয়া প্রতিশ্রুতি আমলে নিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে অনশন ভাঙেন সোনম ওয়াংচুক।
শনিবার বিকেলের মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের জন্য বিক্ষোভকারীরা আল্টিমেটাম দেন এবং তার আগেই পদত্যাগ করেন ধর্মেন্দ্র প্রধান।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে জনসমক্ষে সৃষ্টি হওয়া কোনো বিতর্কের পর পদত্যাগ করা দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হলেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। এর আগে ২০১৮ সালে যৌন হয়রানির অভিযোগ সামনে আসার পর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান এম জে আকবর।
