

মো. নাজমুল হোসেন ইমন, চট্টগ্রাম: বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর। দেশের আমদানি-রপ্তানির সিংহভাগ এই বন্দর দিয়েই পরিচালিত হয়। বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে বন্দরের সক্ষমতা, প্রযুক্তি ও পরিচালন দক্ষতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। এ প্রেক্ষাপটে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ড-কে যুক্ত করার উদ্যোগকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০১৯ সাল থেকে বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে সরকার-টু-সরকার (G2G) এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) কাঠামোয় আলোচনা শুরু হয়। ধারাবাহিক কয়েকটি যৌথ বৈঠকে এনসিটিতে বিনিয়োগ ও পরিচালনা নিয়ে আলোচনা এগিয়েছে এবং বর্তমানে বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কনটেইনার টার্মিনালগুলোর একটি এনসিটি। ২০০৭ সালে অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হলেও পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৭ সালে। বর্তমানে টার্মিনালটি দেশের সর্বাধিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং করলেও দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে যন্ত্রপাতির সক্ষমতা কমেছে। যেখানে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী যন্ত্রপাতির সচলতা প্রায় ৯৩ শতাংশ হওয়া উচিত, সেখানে এনসিটিতে তা প্রায় ৭০ শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে বিদ্যমান অবকাঠামোর পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটর নিয়োগের মূল উদ্দেশ্য শুধু পরিচালনা নয়; বরং আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, বৈশ্বিক লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক এবং প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করা। বিশ্বমানের অপারেটররা উন্নত টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম (TOS), স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গতি বাড়াতে সক্ষম। এর ফলে জাহাজের টার্ন-অ্যারাউন্ড টাইম কমে, বন্দরের উৎপাদনশীলতা বাড়ে এবং ব্যবসায়ীদের ব্যয় হ্রাস পায়।
ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ টার্মিনাল অপারেটর। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৭০টিরও বেশি দেশে বন্দর ও লজিস্টিকস কার্যক্রম পরিচালনা করছে। উন্নত প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা এবং বৈশ্বিক শিপিং নেটওয়ার্কের কারণে প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুপরিচিত। বাংলাদেশে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহও প্রকাশ করেছে তারা, যা বন্দর অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নতুন প্রযুক্তি সংযোজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সম্পৃক্ততায় এনসিটির কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি, জাহাজের অপেক্ষার সময় কমানো, পরিচালন ব্যয় হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনের আগ্রহ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর সুফল সরাসরি পাবেন আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকরা। পণ্য দ্রুত খালাস হওয়ায় ব্যবসায়ীদের লিড টাইম কমবে এবং বাংলাদেশের রপ্তানি আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে।
এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে যুক্ত করার বিষয়ে নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠলেও বাস্তবে প্রস্তাবিত চুক্তি কেবল টার্মিনাল পরিচালনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। বন্দরের নিরাপত্তা, নজরদারি, কাস্টমস নিয়ন্ত্রণ, সাইবার নিরাপত্তা এবং সংরক্ষিত তথ্যের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় সংস্থার হাতে। আন্তর্জাতিক ISPS Code অনুযায়ী নিরাপত্তা মান বজায় রাখা এবং সরকারি তদারকি অব্যাহত থাকবে।
বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনৈতিক সম্পর্কও ক্রমেই গভীর হচ্ছে। দেশটিতে প্রায় ১২ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত, যারা প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠান। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ চলমান। এই প্রেক্ষাপটে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বিনিয়োগ শুধু বন্দর উন্নয়নেই নয়, বরং বৃহত্তর অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দরকে আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট ও লজিস্টিকস হাবে পরিণত করতে আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের বিকল্প নেই। জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো অভিজ্ঞ অপারেটরের সঙ্গে অংশীদারিত্ব বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও আরও শক্তিশালী ভিত্তি লাভ করবে।
