ঢাকা
logo
প্রকাশিত : September 10, 2026

২০ ব্যাংকেই খেলাপি ঋণ সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকা

দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পাহাড় এখন অল্প সংখ্যক ব্যাংককে ঘিরেই সবচেয়ে বেশি উঁচু হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশের ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৯১ শতাংশই মাত্র ২০টি ব্যাংকের হাতে কেন্দ্রীভূত। এসব ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকারও বেশি। তবে এসব ব্যাংকের অধিকাংশের বর্তমান খেলাপি ঋণের চিত্র হঠাৎ তৈরি হয়নি। বিগত আওয়ামী লীগ আমলে বিতর্কিত ঋণ অনুমোদন, প্রভাবশালী গ্রাহকদের বিশেষ সুবিধা, দুর্বল তদারকি এবং প্রকৃত ঝুঁকি গোপন থাকার ফল ক্রমেই ব্যাংকগুলোর হিসাবে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খেলাপি ঋণের এই উচ্চমাত্রার কেন্দ্রীভূত ব্যাংকিং খাতের জন্য বিশেষ উদ্বেগের। কারণ ব্যাংক খাতের ঝুঁকি সমগ্র খাতে সমানভাবে ছড়িয়ে না থেকে এসব ব্যাংকের মধ্যে বেশি মাত্রায় কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে।

পলিসি থিঙ্ক অ্যান্ড রিসার্চের চেয়ারম্যান ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মাজেদুল হক বলেন, হাতে গোনা কয়েকটি ব্যাংকের কাছে খেলাপি ঋণের এত বড় অংশ কেন্দ্রীভূত হওয়া ব্যাংক খাত ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বারবার সরকারি অর্থ দিয়ে সহায়তা করলেও যদি তাদের মূল সমস্যার সমাধান না হয়, তাহলে সেই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হবে। এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের আইনের আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করেন মাজেদুল হক। এ জন্য তিনি ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরামর্শ দেন। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ আদায়ে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন, অর্থঋণ আদালতকে আরও কার্যকর করা এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন। তার মতে, ব্যাংক লুট ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করলে ব্যাংক খাতের ওপর মানুষের আস্থা ফিরবে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিগত আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে ব্যাংক খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাট হয়েছে। নানা ধরনের ছাড় ও সুবিধা, পুনঃতফসিল এবং দুর্বল তদারকির কারণে অনিয়মের প্রকৃত চিত্র অনেক ক্ষেত্রেই আড়ালে ছিল। ফলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত অবস্থাও পুরোপুরি সামনে আসেনি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ফলে আগে চাপা থাকা অনেক ঋণের প্রকৃত অবস্থা এখন শ্রেণিকরণ ও প্রভিশন হিসাবের মাধ্যমে দৃশ্যমান হচ্ছে। বিশেষ করে এস আলম, বেক্সিমকো, নাসা, বিসমিল্লাহ, হল-মার্ক, অ্যাননটেক্স ও ক্রিসেন্টসহ কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে আলোচিত ঋণ এবং বিভিন্ন ব্যাংকে সংঘটিত আর্থিক কেলেঙ্কারি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। ন্যাশনাল ও বেসিক ব্যাংককে ঘিরে আলোচিত অনিয়মও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, বিগত সময়ে বড় গ্রাহকদের খেলাপি ঋণের তথ্যই বেশি লুকানো হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কঠোর নজরদারিতে সেই তথ্য বেরিয়ে আসে। ফলে সার্বিক খাতেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ কমাতে নগদ আদায়ে জোর দিতে হবে। সেই সঙ্গে ঋণ বিকেন্দ্রীকরণ করে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঋণ বিতরণ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ঋণের নামে যারা লুটপাট করেছে, তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা বা ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এর মধ্যে শীর্ষ ২০ ব্যাংকের কাছেই খেলাপি ঋণ কেন্দ্রীভূত রয়েছে ৫ লাখ ৫১ হাজার ৪৩ কোটি টাকা, যা ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৯০ দশমিক ৮৫ শতাংশ। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, খেলাপি ঋণে শীর্ষ ব্যাংকগুলোর মধ্যে সরকারি-বেসরকারি বেশ কয়েকটি বিশেষভাবে আলোচিত। এর মধ্যে ৬টি ব্যাংক একসময় বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলমের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এছাড়া ব্যাংকমালিকদের সংগঠন বিএবির সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার এবং আওয়ামী লীগ সরকারের শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণসংশ্লিষ্ট একটি করে ব্যাংকও আলোচিত তালিকায় রয়েছে।

কোন ব্যাংকে কত খেলাপি ঋণ : খেলাপি ঋণ সবচেয়ে বেশি রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে। ৩০ জুন পর্যন্ত ব্যাংকটির মোট শ্রেণিকৃত ঋণ ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় প্রভিশনের তুলনায় ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি ৮২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৭৫ হাজার ৭২৮ কোটি ৯১ লাখ টাকা, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের ৭৫ দশমিক ৫ শতাংশ। খেলাপি ঋণের তালিকায় তৃতীয় ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির শ্রেণিকৃত ঋণ ৬০ হাজার ৬৪৫ কোটি ৪ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৯৭ দশমিক ৮ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ ব্যাংকটির প্রায় পুরো ঋণপোর্টফোলিওই শ্রেণিকৃত হয়ে গেছে। চতুর্থ অবস্থানে থাকা এক্সিম ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩৮ হাজার ৫২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৭০ দশমিক ৮১ শতাংশ। পঞ্চম অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩২ হাজার ১৩৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৪৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৯ হাজার ৭৯৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের ৭৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। এরপর আইএফআইসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৮ হাজার ৫২০ কোটি ৪২ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৬৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ। ন্যাশনাল ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৮ হাজার ২৭৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৬৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ইউনিয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৭ হাজার ১৩৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের ৯৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অন্যদিকে এবি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২০ হাজার ৩২৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৫৬ দশমিক ৪ শতাংশ।

রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১৯ হাজার ৭৯০ কোটি ৫১ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৪১ দশমিক ৩১ শতাংশ। সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১৫ হাজার ৭১০ কোটি ৬ লাখ টাকা যা মোট ঋণের ১৮ দশমিক ২৭ শতাংশ। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১৫ হাজার ১৬০ কোটি ৮০ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৪১ দশমিক ৯৫ শতাংশ। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১৪ হাজার ২১৯ কোটি ১৯ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৯৭ দশমিক ২৭ শতাংশ। প্রিমিয়ার ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১১ হাজার ৭৫৪ কোটি ৭ লাখ টাকা, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের ৩৫ শতাংশ। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) খেলাপি ঋণ ১০ হাজার ৬৪৮ কোটি ৭৬ লাখ টাকা, য০০০া মোট ঋণের ১৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ। আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের খেলাপিঋণ ৯ হাজার ৯৮৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ১৯ দশমিক ২৪ শতাংশ। পদ্মা ব্যাংকের খেলাপিঋণ ৪ হাজার ৯৩২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৮৯ দশমিক ৬ শতাংশের বেশি। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের খেলাপিঋণ ৪ হাজার ৯২৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ২৪ দশমিক ৩০ শতাংশ। এছাড়া ২০তম অবস্থানে থাকা মার্কেন্টাইল ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৪ হাজার ৩৭৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের ১৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ।

একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন চাপ : খেলাপি ঋণের শীর্ষ ২০ ব্যাংকের মধ্যে একাধিক ব্যাংক এখন বড় ধরনের প্রভিশন ঘাটতিতেও রয়েছে। অর্থাৎ খেলাপি হয়ে পড়া ঋণের বিপরীতে বিধি অনুযায়ী যে পরিমাণ অর্থ সংরক্ষণ করার কথা, তার পুরোটা রাখতে পারছে না এসব ব্যাংক। বড় প্রভিশন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে— ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, জনতা ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, ইউসিবি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ও মার্কেন্টাইল ব্যাংক। ফলে এসব ব্যাংকের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণ শুধু সম্পদের গুণমান নষ্ট করছে না, আর্থিক সক্ষমতার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram