

রমজান আলী, সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি: একজন পল্লী চিকিৎসক। ছোট্ট পরিসরে মানুষের সেবা করেই যাঁর জীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে। অসুস্থ মানুষের কষ্ট, স্বজনদের উৎকণ্ঠা আর একজন চিকিৎসকের প্রতি মানুষের আস্থা—খুব কাছ থেকে দেখেছেন তাঁর দুই মেয়ে। বাবার পাশে বসে সেই দৃশ্যগুলো দেখতে দেখতেই তাঁদের মনে জন্ম নেয় একটি স্বপ্ন—একদিন তাঁরাও চিকিৎসক হবেন, মানুষের পাশে দাঁড়াবেন।
সেই স্বপ্ন আজ বাস্তব। একই পরিবারের দুই বোন তাসরিফা আক্তার (জনি) ও নারগিস আক্তার (সনি) একসঙ্গে অর্জন করেছেন এমবিবিএস ডিগ্রি। তাঁদের এই সাফল্যে শুধু পরিবার নয়, আনন্দ ও গর্বে ভাসছে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার ঢেমশা ইউনিয়নের উত্তর ঢেমশা ফকিরপাড়া এলাকার মানুষ। দুই বোনের চিকিৎসক হয়ে ওঠার গল্পটি যেন একটি স্বপ্নের পথচলা—যার শুরু হয়েছিল বাবার হাত ধরে।
বাবার পেশাই হয়ে উঠেছিল অনুপ্রেরণা
তাসরিফা ও নারগিসের বাবা আব্দুল ছালাম দীর্ঘদিন ধরে কেরানীহাটসহ আশপাশের এলাকায় পল্লী চিকিৎসক হিসেবে মানুষের সেবা করে আসছেন। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও তিনি অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর কাছে চিকিৎসা শুধু পেশা নয়, মানুষের সেবা করার একটি মাধ্যম।
শৈশবেই বাবার এই মানবিক কাজ দুই বোনের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। রোগী দেখতে বাবার কাছে আসা, অসুস্থ মানুষের কষ্ট, তাঁদের সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়া—সবকিছুই তাঁদের মনে চিকিৎসক হওয়ার আগ্রহ তৈরি করে। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই আগ্রহ পরিণত হয় স্বপ্নে। আর স্বপ্ন পূরণে শুরু হয় কঠিন অধ্যায়—পড়াশোনা, পরিশ্রম, অপেক্ষা ও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে চিকিৎসা শিক্ষার দীর্ঘ পথচলা। শেষ পর্যন্ত সেই পথ তাঁদের নিয়ে যায় চিকিৎসা পেশার সর্বোচ্চ স্বপ্নের দ্বারপ্রান্তে।
একই দিনে দুই স্বপ্নের পূর্ণতা
দুই বোনই বিজিসি ট্রাস্ট মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেছেন। একই পরিবারের দুই মেয়ের একসঙ্গে চিকিৎসক হয়ে ওঠার ঘটনা তাঁদের পরিবারে যেমন আনন্দের, তেমনি পুরো এলাকার জন্যও এটি একটি অনন্য অর্জন। তাঁদের সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে উৎসাহ ও আনন্দ। বিশেষ করে এলাকার শিক্ষার্থীদের কাছে তাঁরা এখন অনুপ্রেরণার নাম। শুধু ভালো ফলাফল নয়, এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, বাবার অনুপ্রেরণা এবং দুই বোনের নিরলস পরিশ্রম।
বাবার চোখে সবচেয়ে বড় অর্জন
মেয়েদের সাফল্যে আবেগাপ্লুত বাবা আব্দুল ছালাম। জীবনের দীর্ঘ সময় মানুষের সেবা করে আসা এই পল্লী চিকিৎসকের কাছে দুই মেয়ের চিকিৎসক হয়ে ওঠা যেন নিজের স্বপ্ন পূরণেরও সমান।
আব্দুল ছালাম বলেন, ছোটবেলা থেকেই মেয়েরা তাঁর পাশে বসে মানুষের চিকিৎসা দেখেছে। মানুষের সেবা করার বিষয়টি তাঁদের মনে গভীরভাবে জায়গা করে নেয়। আজ তাঁরা এমবিবিএস শেষ করেছে—এটাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ ও গর্ব। তিনি চান, তাঁর মেয়েরা শুধু ভালো চিকিৎসকই নয়, মানবিক চিকিৎসক হিসেবেও মানুষের পাশে দাঁড়াক।
পুরো এলাকার গর্ব
ঢেমশা ইউনিয়নের কৃতী সন্তান, পাবলিক স্কুলের অধ্যক্ষ ও বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী মোহাম্মদ জাবেদ বলেন, তাসরিফা ও নারগিসের এই সাফল্য শুধু তাঁদের পরিবারের নয়, পুরো ঢেমশাবাসীর জন্য গর্ব ও আনন্দের। একই পরিবারের দুই বোনের একসঙ্গে চিকিৎসক হওয়া নিঃসন্দেহে একটি অনন্য সাফল্য। তাঁদের এই অর্জন এলাকার শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখতে এবং কঠোর পরিশ্রম করতে অনুপ্রাণিত করবে।
স্বপ্ন এখন সেবার
এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে তাসরিফা ও নারগিসের শিক্ষাজীবনের একটি বড় অধ্যায় শেষ হয়েছে। তবে তাঁদের কাছে এটি শেষ নয়—বরং নতুন যাত্রার শুরু।
যে বাবাকে দেখে তাঁরা চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই বাবার আদর্শকে সামনে রেখে এখন তাঁদের স্বপ্ন মানুষের সেবা করা। বিশেষ করে গ্রামের সাধারণ ও অসহায় মানুষ যেন সহজে চিকিৎসাসেবা পায়—এমন প্রত্যাশাই তাঁদের পরিবার ও এলাকাবাসীর।
একদিন উত্তর ঢেমশা ফকিরপাড়ার একটি ঘরে বসে দুই কন্যার মনে যে স্বপ্ন জন্ম নিয়েছিল, আজ সেই স্বপ্নের গায়ে সাদা অ্যাপ্রন। বাবার হাত ধরে শুরু হওয়া সেই স্বপ্ন এখন মানুষের সেবার পথে হাঁটার অপেক্ষায়।
তাসরিফা ও নারগিসের এই সাফল্য তাই শুধু দুটি এমবিবিএস ডিগ্রির গল্প নয়—এটি একজন বাবার স্বপ্ন, দুই বোনের অধ্যবসায় এবং একটি এলাকার গর্বের গল্প।
