ঢাকা
১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
রাত ১২:২২
logo
প্রকাশিত : মে ১২, ২০২৬

লোকসানে হাবুডুবু ৫৪ কম্পানি

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে এখনো স্থিতিশীলতা ফেরেনি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ক্রমাগত বাজার চাহিদা হ্রাস, বিনিয়োগ মন্দা, ব্যাংকিং খাতের তীব্র চাপে দেশের করপোরেট খাতে মুনাফা কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এক সময়ের মুনাফাধারী বহুজাতিক কম্পানি থেকে শুরু করে দেশীয় নামি অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানের খাতায় নাম লিখিয়েছে। এই সংকটের ঢেউ লেগেছে দেশের পুঁজিবাজারে, যেখানে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতায় সূচক এখন খাদের কিনারায়।

বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতায় পুঁজিবাজারের মন্দাভাব কাটছেই না। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। অনেকে পোর্টফোলিও বিক্রি করে লোকসান মেনে নিচ্ছেন। বাজারে তারল্য কমে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগও আসছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগ তুলে নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। চলতি অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে বিভিন্ন কম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তালিকাভুক্ত ৫৪টি কম্পানি নতুন করে লোকসানে পড়েছে। ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবনমন হওয়া কম্পানির সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে, যা বাজারের মোট কম্পানির ২৫ শতাংশ। এমনকি নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত ব্যাংক খাতও এখন লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।

এক সময়ের ভালো মৌলভিত্তির কম্পানিও একের পর এক ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে যাচ্ছে। কম্পানিগুলোর প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন ও ও সংশ্লিষ্ট তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চলতি হিসাব বছরে লোকসানের পেছনে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, ডলার সংকট, ঋণের উচ্চ সুদহার এবং কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি বড় কারণ হয়ে উঠেছে। উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, এসব চাপের কারণে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা ব্যাবসায়িক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। উচ্চ সুদহার, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ-পরবর্তী জ্বালানি সংকট ও গ্যাস সংকটে ৩০ শতাংশের বেশি কমেছে উৎপাদন। উচ্চমূল্যস্ফীতি বাজার চাজিদা কমে যাওয়ায় বিক্রিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, ‘দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বর্তমানে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যার সরাসরি এবং নেতিবাচক প্রভাব আমরা পুঁজিবাজারে লক্ষ্য করছি। বেশ কয়েক বছর ধরেই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা প্রতিকূল ফ্যাক্টর, যা শিল্প উৎপাদন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটে থাকা পুঁজিবাজার মূলত অর্থনীতির আয়না। ফলে সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো যতক্ষণ পর্যন্ত ইতিবাচক ধারায় না ফিরবে, ততক্ষণ বাজার থেকে ভালো কিছু আশা করা কঠিন।’

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বেশি লভ্যাংশ প্রদানকারী খাত হচ্ছে ব্যাংক ও লিজিং কম্পানি। কিন্তু বর্তমানে এই দুই খাতই সবচেয়ে বেশি সংকটের মধ্যে রয়েছে। এরই মধ্যে ১০টির বেশি ব্যাংক ও চারটি লিজিং কম্পানি গভীর সংকটে পড়েছে এবং ভবিষ্যতেও তারা লভ্যাংশ দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ব্যর্থতা।’

তিনি আরো বলেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও এখন খুব একটা ইতিবাচক নয়। প্রায় সব খাতেই উৎপাদন ও চাহিদা কমে গেছে। কিন্তু ডলার সংকট, উচ্চ সুদের হার ও জ্বালানি ব্যয়ের কারণে ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের তুলনায় প্রত্যাশিত মুনাফা আসছে না। এতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতাও কমে গেছে।

সাইফুল ইসলাম বলেন, অর্থনীতি আবার প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে না পারা পর্যন্ত এই চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। তবে নতুন সরকারকে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য অন্তত এক বছর সময় দেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও আইসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ‘উচ্চ সুদের হার, উৎপাদন ও চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে দেশের বেসরকারি খাতে ব্যবসা-বাণিজ্য বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। এর প্রভাব এখন বহুজাতিক কম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনেও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। অনেক কম্পানি লোকসানে পড়েছে, আবার অনেককে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামতে হয়েছে। যেসব কম্পানি এখনো প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে, তাদেরও মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।’

লোকসানের চিত্র : ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা গেছে, উৎপাদন ও সেবা খাতের তালিকাভুক্ত দেশীয় কম্পানির সংখ্যা ২৩১। চলতি অর্থবছরের ৩১ মার্চ সমাপ্ত তৃতীয় প্রান্তিকের প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১১৩টি কম্পানি মুনাফায় থাকলেও ৫৪টি কম্পানি লোকসানে রয়েছে। মুনাফায় থাকা কম্পানিগুলোর মধ্যেও ৫৭টির মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। অন্যদিকে ৬৪টি কম্পানি এখনো আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি।

বস্ত্র, সিমেন্ট, ইস্পাত, প্রকৌশল, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ওষুধ খাত সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। অনেক কম্পানির বিক্রি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ থেকে ৪৫ শতাংশ কমেছে। কাঁচামাল আমদানিতে ডলার সংকট, উচ্চ সুদের হার (১৬-১৭ শতাংশ), অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতি (৯ শতাংশের ওপরে) এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে ব্যাপকভাবে।

লোকসানের পেছনে একাধিক সংকট : কম্পানিগুলোর প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, লোকসানের পেছনে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, তীব্র ডলার সংকট, ঋণের অস্বাভাবিক উচ্চ সুদহার (১৬-১৭ শতাংশ) এবং কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি প্রধান কারণ। উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ডলার সংকটে সময়মতো কাঁচামাল আমদানির এলসি খুলতে পারেনি অনেক প্রতিষ্ঠান। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় বাজার থেকে বেশি দামে কাঁচামাল কিনতে বাধ্য হয়েছে তারা। দেশবন্ধু পলিমার জানিয়েছে, কাঁচামালের সংকটের সঙ্গে বিদ্যুৎ ঘাটতিও উৎপাদন সক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

বহুজাতিক কম্পানিও রক্ষা পায়নি : দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক দুর্বলতার প্রভাব বহুজাতিক কম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনেও স্পষ্ট। ২০২৫ সালে ৯টি প্রধান বহুজাতিক কম্পানির সম্মিলিত মুনাফা ২৬ শতাংশ কমে ৪৮৬১ কোটি টাকায় নেমেছে। রাজস্ব কমেছে ২.৬ শতাংশ।

ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর মুনাফা ৬৭ শতাংশ কমে ৫৮৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ২০২৩ সালে ছিল এক হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা। কোম্পানি জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া তাদের ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

আরএকে সিরামিকস ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৩৯ কোটি টাকা লোকসান করেছে। সিঙ্গার বাংলাদেশের লোকসান ২২৪ কোটি টাকা, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। হাইডেলবার্গ সিমেন্টের মুনাফা ২০২১ সালের তুলনায় অর্ধেকের বেশি কমে গেছে। গ্রামীণফোনের মুনাফা কমেছে ১৮.৫ শতাংশ। তবে ব্যতিক্রম রবি আজিয়াটা, যার মুনাফা ৩৩ শতাংশ বেড়ে ৯৩৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

ব্যাংক খাতের ভয়াবহ চিত্র : বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নিয়মে এনপিএল ১০ শতাংশের বেশি হলে বা প্রভিশনিং ডেফারাল সুবিধা নিলে লভ্যাংশ ঘোষণা করা যায় না। ফলে ২০২৫ সালে অর্ধেকের বেশি ব্যাংক লভ্যাংশ দিতে পারেনি। ১১টি তালিকাভুক্ত ব্যাংক কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি, যার মধ্যে ১০টি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে চলে গেছে।

সম্প্রতি আরো ১০টি ব্যাংককে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামিয়েছে ডিএসই। ব্যাংকগুলো হলো—এবি ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, ইউসিবি, এনআরবি ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংক। এর আগে ইসলামী ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ও সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার ব্যাংককেও ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামানো হয়।

এ ছাড়া বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করতে না পারায় বেস্ট হোল্ডিংস, জেমিনি সি ফুড, এস আলম কোল্ড রোলড স্টিলস, আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ, ওইমেক্স ইলেকট্রোড, কাট্টলি টেক্সটাইল, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, বিচ হ্যাচারি ও ফু-ওয়াং ফুডকেও ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবনমন করা হয়েছে।

ডিএসইর তথ্যমতে, বর্তমানে ‘জেড’ ক্যাটাগরির কম্পানির সংখ্যা প্রায় ১০০টি, যা মোট তালিকাভুক্ত কম্পানির প্রায় ২৫ শতাংশ। ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে যাওয়ার অর্থ কম্পানি লভ্যাংশ দিতে পারছে না, এজিএম করতে পারছে না বা আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ব্যাংকিং সংস্কার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগ উৎসাহিত করা গেলে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরো গভীর হবে।

সুত্র: কালের কণ্ঠ

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram