ঢাকা
৯ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
সকাল ১০:২১
logo
প্রকাশিত : এপ্রিল ৯, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ধাক্কায় বাংলাদেশে বাড়বে ১২ লাখ দরিদ্র মানুষ

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে এ বছর বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ গরিব মানুষ বাড়তে পারে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের প্রকৃত আয় কমতে পারে এবং তারা দারিদ্র্য সীমার ওপরে উঠতে পারবে না বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

আজ বুধবার বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনের এপ্রিল সংস্করণ প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। সেখানে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের কত মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারবেন না, তার একটি হিসাব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে কোনো কর্মক্ষম ব্যক্তি দিনে তিন ডলারের কম আয় করলে তাকে দরিদ্র হিসেবে ধরা হয়।

প্রতিবেদনটি প্রকাশ উপলক্ষে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে সকালে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতিসহ নানা কারণে দারিদ্র্য বাড়ছে। ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে। ২০২৫ সালে নতুন করে ১৪ লাখ মানুষ গরিব হয়েছেন।

বিশ্বব্যাংক বলছে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের আগে ধারণা করা হয়েছিল চলতি বছর ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠবেন। কিন্তু যুদ্ধের কারণে মাত্র ৫ লাখ মানুষ তা পারতে পারেন। অর্থাৎ, প্রায় ১২ লাখ মানুষ গরিব থেকে যাবেন। যুদ্ধাবস্থা না থাকলে ২০২৮ সাল নাগাদ দারিদ্র্যের হার ১৯ দশমিক ৩ শতাংশে নামতে পারত।

দারিদ্র্য বাড়ার পেছনে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, শ্রমের কম মজুরি এবং কর্মসংস্থানের ধীরগতিকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বৈষম্য বাড়ার আশঙ্কাও করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, ইরান যুদ্ধের কারণে এ বছর দারিদ্র্যের হার কমবে মাত্র দশমিক ৭ শতাংশ, যেখানে সাধারণত প্রতিবছর গড়ে ১ শতাংশের বেশি হারে দারিদ্র্য কমে।

বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর (বাংলাদেশ ও ভুটান) জ্যঁ পেম বলেন, “বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের কারণে বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া কয়েক বছর ধরে দারিদ্র্য কমার গতি কমেছে।” তিনি আরও বলেন, “শোভন কর্মসংস্থানের জন্য বিনিয়োগ পরিবেশ সহজ করা দরকার।”

তিনি বলেন, “বিগত দিনে প্রয়োজনীয় যেসব সংস্কারের উদ্যোগ শুরু হয়েছে, তা যেন অব্যাহত থাকে। যদিও সংস্কার খুব কঠিন হবে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে দ্রুত স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।”

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের অন্তত ছয়টি খাতে পড়তে পারে। এর মধ্যে রয়েছে চলতি হিসাবের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, দারিদ্র্য বৃদ্ধি, আর্থিক চাপ বৃদ্ধি এবং বৈষম্য বাড়া। ২০২৬ সালে গিনি সূচক দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে বলেও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এর আগে জানুয়ারিতে এই হার ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে সেই পূর্বাভাস কমানো হয়েছে।

বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির হার সাড়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল। তবে নতুন সরকার এখনো এ পূর্বাভাস সংশোধন করেনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৩ দশমিক ৮ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংক আরও বলছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখনো চারটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে—উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিম্ন রাজস্ব আয়, আর্থিক খাতের ঝুঁকি এবং বহিঃখাতের চাপ। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে এসব চ্যালেঞ্জ আরও তীব্র হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের সুযোগ সীমিত। দুর্বল রাজস্ব আদায়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সীমিত মুদ্রানীতি, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকিং খাত এবং অপর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার মজুত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

বিশ্বব্যাংক মনে করে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি তেলের দাম ও আমদানি ব্যয় বাড়বে, যা দেশে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়াতে পারে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৮ শতাংশের মতো, যা সীমিত আয়ের মানুষের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে।

তারা আরও বলছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সীমিত, রাজস্ব ও মুদ্রানীতি কঠোর এবং ব্যাংক খাত ভঙ্গুর থাকায় দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা কম। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে এবং কাঠামোগত সংস্কারে অগ্রগতি হলে অর্থনীতিতে পুনরুদ্ধার সম্ভব। এজন্য সামষ্টিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব বাড়ানো, আর্থিক খাত শক্তিশালী করা এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে জরুরি সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক বলছে, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে স্বল্পমেয়াদে অগ্রাধিকারভিত্তিতে সংস্কার প্রয়োজন। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়া, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ, সরবরাহব্যবস্থা উন্নয়ন এবং ব্যাংক খাতকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তৈরি পোশাক খাত প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা উচ্চ ব্যয়, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং অর্থায়নের সংকটে ভুগছেন। বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি বাড়াতে নিয়ন্ত্রণ শিথিল, প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন জরুরি।

বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা বলেন, “দ্রুত বাড়তে থাকা কর্মশক্তিকে কাজে লাগাতে এবং প্রবৃদ্ধি টেকসই রাখতে ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মনীতির অনিশ্চয়তা কমানো, প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং উদ্যোক্তাদের বাধা দূর করা গেলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে।”

logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram