

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের সবজি রপ্তানি খাতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। ইরান ও ইসরায়েলের সংঘাতের প্রভাবে ওই অঞ্চলের আকাশপথ ও বিমানবন্দরগুলোর কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ায় প্রধান বাজারগুলোতে বাংলাদেশ থেকে সবজি পাঠানো প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে রপ্তানিকারক, ব্যবসায়ী ও কৃষক সবাই অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
রপ্তানিকারকদের সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত মাসের ২৮ তারিখ রাত থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বেশির ভাগ দেশে সবজি পাঠানো কার্যত বন্ধ।
সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও কুয়েত—এই পাঁচটি দেশেই বাংলাদেশের সবজি রপ্তানির বড় অংশ যায়। এর মধ্যে বেশি রপ্তানি হয় লাউ, কুমড়া, পটোল, বেগুন, ঢেঁড়স, আলু, পেঁপে, চিচিঙ্গা, কাঁকরোল, কাঁচা মরিচ, বরবটি, শিম, টমেটো ও বিভিন্ন ধরনের শাক। পচনশীল বলে আলু ছাড়া এসব পরিবহন করতে হচ্ছে কার্গো বিমানে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব দেশে নিয়মিত কার্গো ফ্লাইট না থাকায় পণ্য পাঠানো যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মোহাম্মদ মনসুর জানিয়েছেন, বাংলাদেশের মোট সবজি রপ্তানির প্রায় ৬০ শতাংশ যায় মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে। বাকি প্রায় ৪০ শতাংশ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়। কিন্তু ইউরোপে পাঠানো পণ্যের বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যের বিমানবন্দর হয়ে ট্রানজিট নেয়। ফলে ওই অঞ্চলের বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় ইউরোপের বাজারেও রপ্তানি কমে গেছে।
বর্তমানে মোট রপ্তানির মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কার্যক্রম চালু রয়েছে।কৃষিপণ্য ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের বড় অংশই দ্রুত নষ্ট হওয়ার মতো ‘ফ্রেশ পণ্য’। তাই সেগুলো দ্রুত বিমানযোগে গন্তব্যে পৌঁছানো জরুরি। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আকাশপথে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় রপ্তানির পুরো সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি কৃষকরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
প্রতিযোগী দেশগুলো এগিয়ে যাচ্ছে : এই সংকটের সুযোগে প্রতিবেশী দেশগুলো বাজার দখলের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রপ্তানিকারকদের। বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তান বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে দ্রুত পণ্য পাঠাতে পারছে। রপ্তানিকারকদের ভাষ্য, ভারতের মুম্বাই বন্দর থেকে সমুদ্রপথে মাত্র তিন দিনের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে সবজি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের সেই সক্ষমতা এখনো গড়ে ওঠেনি। ফলে দীর্ঘমেয়াদে বাজার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পরিবহন খরচের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, ভারতের তুলনায় বাংলাদেশ থেকে বিমানযোগে সবজি পাঠাতে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বেশি ভাড়া দিতে হয়। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, দেশের সবজি রপ্তানিতে দীর্ঘদিন ধরে নীতিমালা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। বিমান কার্গো ভাড়ার ওপর সরকারের কোনো নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ বা নীতিমালা নেই। ফলে বিমান সংস্থাগুলো অনেক সময় নিজেদের মতো করে ভাড়া বাড়িয়ে দেয়, যা রপ্তানিকারকদের জন্য বড় চাপ তৈরি করে। রপ্তানিকারকদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সংকটের মধ্যেও কার্গোভাড়া কমানোর বদলে কিছু ক্ষেত্রে তা আরো বাড়ানো হয়েছে। এতে রপ্তানি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া আরো কঠিন হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোতে আধুনিক কোল্ড চেইন, বিশেষ কনটেইনার সুবিধা বা কৃষিপণ্য রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এখনো পর্যাপ্ত নয়। ফলে সমুদ্রপথে দ্রুত নষ্ট হওয়া সবজি পাঠানো প্রায় অসম্ভব।
কমেছে রপ্তানির পরিমাণও : একসময় বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা সবজি রপ্তানির সম্ভাবনা নিয়ে বেশ আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতা, উচ্চ পরিবহন ব্যয় এবং পরিকল্পনার অভাবে বর্তমানে তা কমছে প্রতিনিয়ত। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সরকারি প্রণোদনা কমে যাওয়ার বিষয়টি। আগে সবজি রপ্তানিতে প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ সহায়তা পাওয়া গেলেও বর্তমানে তা কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা আরো কঠিন হয়ে গেছে। এখন যুক্ত হয়েছে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ।
ইপিবির তথ্য বলছে, দেশের সবজি রপ্তানি গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৮.৬৪ শতাংশ কমেছে। যেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সবজি রপ্তানি হয়েছিল প্রায় ১১ কোটি ২৪ লাখ ডলারের, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় প্রায় আট কোটি ১১ লাখ ডলারে।
প্রয়োজন নতুন বাজারের খোঁজ : মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে বিকল্প বাজার খোঁজারও পরামর্শ দিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালদ্বীপ, নেপাল ও ভুটানের মতো দেশগুলোতে বাংলাদেশের সবজি রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উৎপাদন ও প্যাকেজিং নিশ্চিত করাও জরুরি।
কৃষি বিশেষজ্ঞ মজিবুল হক মনে করেন, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের মতো আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে বাংলাদেশের সবজি রপ্তানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভারত বিকল্প পথে সবজি পাঠাতে পারলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশ তা পারছে না। সমুদ্রপথে সবজি পাঠানোর জন্য আমাদের প্রয়োজনীয় ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা অবকাঠামো (যেমন : কুল চেইন, বিশেষ কনটেইনার সুবিধা এবং পোর্টে ফ্রেশ ভেজিটেবল হ্যান্ডলিং সুবিধা) নেই। তিনি সবজি রপ্তানি বাড়াতে একটি পাঁচ থেকে ১০ বছর মেয়াদি দীর্ঘমেয়াদি ‘ভিশন’ বা রোডম্যাপ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, সারা বছর সবজি উৎপাদনের যে সক্ষমতা বাংলাদেশের আছে, তাকে কাজে লাগিয়ে একটি শক্তিশালী ‘ব্যাকওয়ার্ড ইন্ডাস্ট্রি’ গড়ে তোলা প্রয়োজন। তিনি শুধু কাঁচা সবজি রপ্তানির ওপর নির্ভর না থেকে ফ্রোজেন (হিমায়িত) সবজি, রেডি-টু-কুক বা রেডি-টু-ইট পণ্যের বাজার ধরার পরামর্শ দিয়েছেন। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হলেও কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না।
সাবেক কৃষিসচিব আনোয়ার ফারুক মনে করেন, শুধু আকাশপথের ওপর নির্ভর না করে সমুদ্রপথে সবজি পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় কোল্ড স্টোরেজ এবং অবকাঠামো গড়ে তুলতে ফ্রেশ সবজির পাশাপাশি ‘ফ্রোজেন’ বা হিমায়িত সবজি এবং রেডি-টু-কুক সবজির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

