

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত সাম্প্রতিক বাণিজ্যচুক্তির ফলে বাংলাদেশের কৃষি খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা কৃষিপণ্যের ওপর শুল্ক প্রত্যাহার এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য ক্রয়ের বাধ্যবাধকতা দেশীয় উৎপাদনকারীদের অসম প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তিটি গত ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত হয়।
পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতে বাংলাদেশ সম্মত হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রকে শিল্প ও কৃষিপণ্যের বাজারে কিছু অগ্রাধিকার সুবিধা দেবে।
এসব পণ্যের মধ্যে থাকবে রাসায়নিক, চিকিৎসা সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি, মোটরগাড়ি ও যন্ত্রাংশ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সরঞ্জাম, জ্বালানি, সয়াবিন, দুগ্ধজাত পণ্য, গরুর মাংস, পোলট্রি, বাদাম ও ফল।
চুক্তির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বড় অঙ্কের ক্রয়ের পরিকল্পনাও জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিমান ক্রয়, প্রায় ৩৫০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য (গম, সয়াবিন, তুলা ও ভুট্টা) আমদানি এবং আগামী ১৫ বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি ডলারের জ্বালানি পণ্য কেনা।
ইতিমধ্যে এই চুক্তিকে অসম চুক্তি উল্লেখ করে তা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন এই সেক্টরের বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তিটি করার সময় বাংলাদেশ যথেষ্ট সময় নিয়ে দর-কষাকষি করেনি। ফলে শর্তগুলো এমন হয়েছে, যেখানে আমাদের লাভের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের লাভ বেশি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা অনেক পণ্যের ওপর শুল্ক ও অন্যান্য কর কমানোর বা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত কৃষিপণ্য কম দামে বাংলাদেশের বাজারে আসবে।
এতে দেশীয় কৃষকদের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং তাদের উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে দুগ্ধজাত পণ্য ও মাংসের ক্ষেত্রে মার্কিন মানদণ্ডকে সরাসরি স্বীকৃতি দেওয়ার ফলে এসব পণ্য সহজে এবং দ্রুত বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে। এতে বড় আকারের ও প্রযুক্তিনির্ভর মার্কিন উৎপাদনের সঙ্গে দেশীয় ছোট ও মাঝারি খামারিদের পক্ষে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে এই পরিস্থিতি অনেক খামারির জন্য টিকে থাকার সংকট তৈরি করতে পারে।
চুক্তি অনুযায়ী, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের নামে বাংলাদেশ নির্দিষ্ট পরিমাণ মার্কিন কৃষিপণ্য ক্রয়ের অঙ্গীকার করেছে।
এর মধ্যে রয়েছে—প্রতিবছর অন্তত সাত লাখ মেট্রিক টন গম। এক বছরে অন্তত ১২৫ কোটি ডলার সমমূল্যের বা ২৬ লাখ মেট্রিক টন সয়াবিন ও সয়াজাত পণ্য। ৩৫০ কোটি ডলার মূল্যের তুলা আমদানির লক্ষ্যমাত্রা।
বিপুল পরিমাণ এই আমদানির বাধ্যবাধকতা দেশীয় গম ও তেলবীজ চাষিদের নিরুৎসাহ করতে পারে। যখন বাজার সস্তা আমদানিকারকদের পণ্যে সয়লাব থাকবে, তখন স্থানীয় কৃষকরা তাঁদের ফসলের ন্যায্য দাম পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন। কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, ‘পোশাকশিল্পের সুবিধার কথা চিন্তা করে কৃষি পণ্য আমদানির যে কঠিন শর্তগুলো মেনে নেওয়া হয়েছে, তা সঠিক হয়নি। ফলে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ এবং কৃষি খাত বেশ কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে। এক খাতকে বাঁচাতে গিয়ে অন্য খাতকে (কৃষি) ঝুঁকিতে ফেলা হয়েছে। এই চুক্তির ফলে বাজারে বেশ কিছু প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘চাল, ডাল বা নিত্যপণ্যের দাম যখন বেড়ে যায়, তখন তার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে এবং তারা আর্থিক সংকটে পড়বে। বাইরে থেকে আমদানির শর্ত সহজ বা বাধ্যতামূলক হলে দেশি কৃষকরা তাঁদের পণ্যের সঠিক দাম না-ও পেতে পারেন, যা দীর্ঘমেয়াদে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি।’
চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র যেসব কৃষি বায়োটেকনোলজি বা জিএমও পণ্য নিজ দেশে বাজারজাত করে, বাংলাদেশ সেগুলোকে কোনো ধরনের অতিরিক্ত পরীক্ষা বা অনুমোদন ছাড়াই বাজারজাত করার অনুমতি দিতে বাধ্য থাকবে। এটি দেশের পরিবেশ ও দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগের অবকাশ রয়েছে। এ ছাড়া মার্কিন স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি ব্যবস্থা মেনে নেওয়ায় বাংলাদেশের নিজস্ব মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শিথিল হয়ে যেতে পারে।
চুক্তিতে মেধাস্বত্ব কঠোরভাবে পালনের কথা বলা হয়েছে। এর ফলে মার্কিন বীজ কম্পানিগুলোর আধিপত্য বাড়তে পারে, যা দেশীয় কৃষকদের চিরাচরিত বীজ সংরক্ষণ ও বিনিময়ের অধিকারকে খর্ব করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, যুক্তরাষ্ট্র তার কৃষকদের বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দেয়, ফলে তাঁদের উৎপাদন খরচ কম। অন্যদিকে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র কৃষকরা বড় ধরনের কোনো ভর্তুকি ছাড়াই লড়াই করছেন। এই অসম লড়াইয়ে দেশীয় কৃষি খাত টেকসই সক্ষমতা হারাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি সম্পাদিত বাণিজ্য চুক্তিকে বাংলাদেশের কৃষি ও পোলট্রি খাতের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রিপন কুমার মণ্ডল। এই চুক্তিকে অসম আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘এর ফলে দেশীয় পোলট্রি শিল্প দুই ধরনের বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে। মুক্ত বাণিজ্যের নামে দেশীয় খামারিদের সুরক্ষা না দিয়ে এভাবে বাজার উন্মুক্ত করে দেওয়া দেশের স্বয়ংসম্পূর্ণ পোলট্রি খাতের জন্য আত্মঘাতী হবে।’
তাঁর মতে, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কোনো প্রকার শুল্ক ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রের পোলট্রি পণ্য বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশ করবে। উন্নত প্রযুক্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে পোলট্রি পণ্যের উৎপাদন খরচ অনেক কম। অন্যদিকে বাংলাদেশে পোলট্রি ফিড ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেশি হওয়ায় স্থানীয় খামারিদের উৎপাদন খরচ অনেক বেশি পড়ে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘বিনা শুল্কে সস্তা মার্কিন পণ্য বাজারে এলে আমাদের দেশীয় ক্ষুদ্র খামারিরা অসম প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। ফলে হাজার হাজার ক্ষুদ্র খামার বন্ধ হয়ে যাবে এবং এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা জীবিকা হারাবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়টিও উদ্বেগের। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী মার্কিন পোলট্রি পণ্যগুলো কোনো প্রকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই সরাসরি বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশ ও ব্যবহারের অনুমতি পাবে। এতে বায়োসেফটি বা জৈব-নিরাপত্তার সংকট তৈরি হতে পারে।’
যুক্তরাষ্ট্রের এসব পণ্যের মাধ্যমে কোনো ক্ষতিকর জীবাণু বা রোগবালাই দেশে ছড়িয়ে পড়বে কি না, তা যাচাই করার সুযোগ না থাকায় দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ হুমকিতে পড়বে। বিশেষ করে বায়োটেকনোলজির মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরো বেশি। সরকারের উচিত দেশীয় শিল্পের স্বার্থ রক্ষায় এই চুক্তির শর্তগুলো পুনরায় খতিয়ে দেখা।
বাংলাদেশ কৃষি রাসায়নিক প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি খন্দকার সৈয়দ মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমরা বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে বাজার যাচাই করে কৃষিপণ্য আমদানি করতে পারি। শুধু শুল্কমুক্ত পণ্য আনার কারণে বাংলাদেশের খুব বেশি লাভ হবে না। যদি যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের শিল্প-কারখানা স্থাপনে বিনিয়োগ করে, তবে সেটি বেশি উপকারী হবে। আমাদের দেশে বছরে প্রায় ৬০ লাখ টন সার আমদানি করতে হয়, যার মধ্যে ২০ লাখ টন হলো ফসফেটিক সার। যুক্তরাষ্ট্র যদি সার কারখানা স্থাপনে বিনিয়োগ করে, তাহলে সেটি আমাদের জন্য সত্যিকারের উপকার বয়ে আনবে।’
