ঢাকা
logo
প্রকাশিত : February 22, 2026

বাজার-মূল্যস্ফীতি ভোগাচ্ছে মানুষকে

দায়িত্ব নেওয়ার পর বিএনপি সরকারের সামনে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাজার ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। গত বুধবার মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই নতুন সরকারপ্রধান প্রথম তিন মাসের পরিকল্পনায় দ্রব্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার ওপর জোর দিয়েছেন। নির্বাচন-পরবর্তী অর্থনৈতিক চাপ, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং রমজান ঘিরে বাড়তি চাহিদা- সব মিলিয়ে বাজার এখনো পুরোপুরি স্বস্তিতে নেই। মন্ত্রিসভার বৈঠকে স্পষ্ট নির্দেশনা এসেছে, রমজানে জ্বালানি সরবরাহে যেন কোনো ঘাটতি না থাকে, নিত্যপণ্যের বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি না হয় এবং প্রশাসন মাঠপর্যায়ে সক্রিয় থাকে। একই সঙ্গে নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের একটি বিশেষ কর্মপরিকল্পনা তৈরির কথা বলা হয়েছে। কোন মন্ত্রণালয় কী পদক্ষেপ নেবে, তার সুস্পষ্ট তালিকা দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠাতে বলা হয়েছে। বাজার তদারকি জোরদার, সরবরাহ ব্যবস্থায় সমন্বয় বাড়ানো, মজুতদারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রয়োজনে আমদানিনীতিতে পরিবর্তনের মতো বিষয়েও নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এর মধ্যেই রোজা শুরু হয়েছে। প্রতি বছরের মতো এবারও বেশকিছু পণ্যের দাম আবার বেড়েছে। এতে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ চাপে পড়েছেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজারে শুধু অভিযান চালিয়ে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ আনা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা পেতে হলে উৎপাদন, আমদানি, পরিবহন ও খুচরা পর্যায়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। ডলারের বিনিময় হার, আমদানি ব্যয় এবং সরবরাহ শৃঙ্খলার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রথম তিন মাসে যদি দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখানো যায়, তাহলে বাজারে ইতিবাচক বার্তা যাবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নতুন সরকারের আগামী তিন মাসের কর্মপরিকল্পনায় বাজার পরিস্থিতি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত যৌক্তিক। গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের আর্থিক সুরক্ষা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এ পরিস্থিতিতে বাজার স্থিতিশীল করতে পারলে জনগণের ভোগান্তি কিছুটা হলেও লাঘব হবে।

তিনি বলেন, এই লক্ষ্য অর্জনে সরকারকে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রথমেই উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। উৎপাদন, আমদানি থেকে শুরু করে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলা নিয়মতান্ত্রিক ও স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হতে হবে। সময়মতো প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি নিশ্চিত করার পাশাপাশি পর্যাপ্ত মজুত রাখার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নজরদারি জোরদার করা গেলে বাজার ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব হবে। সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমেই মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণে আনা যেতে পারে। মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে উৎপাদন বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করার বিকল্প নেই।

সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সাধারণ মানুষের আয়ের তুলনায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় হয়ে উঠেছে। মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই সরকারপ্রধান দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছেন, এটি ইতিবাচক বার্তা। তবে শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়, সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, আমদানি-রপ্তানি নীতিতে সামঞ্জস্য আনা, বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সঙ্গে সমন্বয় জরুরি। প্রথম তিন মাসই হবে নতুন সরকারের দক্ষতা, সমন্বয়ক্ষমতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রকৃত পরীক্ষা। সফলতা পেলে জনগণের আস্থা বাড়বে। ব্যর্থ হলে চাপ বহুগুণে বাড়বে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ বছর সরবরাহ পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো ছিল। ডলারের দাম স্থিতিশীল থাকায় আমদানিতে সুবিধা হয়েছে। আগে যেখানে শতভাগ মার্জিনে এলসি খুলতে হতো, এখন ১০ থেকে ২০ শতাংশ মার্জিনেই তা সম্ভব হয়েছে। বিদায়ী বাণিজ্য উপদেষ্টা পর্যন্ত দাবি করেছিলেন, রমজানের পণ্যে ঘাটতি নেই; বরং আমদানি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। কিন্তু বাজারে সেই স্বস্তি পুরোপুরি দেখা যায়নি। এতে প্রশ্ন উঠছে- সমস্যা কি সরবরাহে, নাকি বাজার ব্যবস্থাপনায়?

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, গত তিন মাসে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়েই অবস্থান করেছে। গত জানুয়ারি মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। গত ডিসেম্বর ও নভেম্বরেও মূল্যস্ফীতি বেড়েছিল। খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও ঊর্ধ্বমুখী। গত জানুয়ারি মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। আর খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয় ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ। টানা চার মাস ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। ২০২৫ সালে গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি ও সবজির দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আগের সরকার (অন্তর্বর্তীকালীন) সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছিল, যা এখনো অব্যাহত আছে। মুদ্রানীতি অনুযায়ী নীতি সুদহার বাড়ানো হয় এবং ঋণপ্রবাহ কমানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাতে প্রত্যাশিত ফল মেলেনি। বরং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার প্রভাব বিনিয়োগ ও উৎপাদনে পড়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল কঠোর মুদ্রানীতির ওপর জোর দিলেও দেশীয় বাস্তবতায় উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়টি সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।

সব মিলিয়ে নতুন সরকারের সামনে এখন সময়ের পরীক্ষা। প্রথম তিন মাসে যদি বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফেরানো যায়, তাহলে মানুষের আস্থা বাড়বে। আর যদি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান অগ্রগতি না আসে, তাহলে অর্থনৈতিক চাপ আরও গভীর হতে পারে। তাই সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তব প্রয়োগ কত দ্রুত ও কতটা কার্যকর হয়- সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

সুত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. মো: জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram