

সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নবগঠিত সরকারের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে দাঁড়াচ্ছে শিক্ষা খাত। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অপর্যাপ্ত অর্থায়ন, নীতিগত অসংগতি এবং বাস্তবায়নের ঘাটতিতে জর্জরিত শিক্ষাব্যবস্থা আজ কাঠামোগত সংস্কারের এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে। শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষা উদ্যোক্তা- সব পক্ষই প্রায় এক বাক্যে বলেছেন, এবার আর কসমেটিক পরিবর্তন নয়; প্রয়োজন গভীর, সাহসী ও টেকসই সংস্কার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা খাতে সংকটের মূল সূত্রপাত হয় বাজেট বরাদ্দ থেকে। জাতীয় বাজেটে জিডিপির তুলনায় শিক্ষায় বরাদ্দ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের চেয়েই কম, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে অবকাঠামো, শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং সামগ্রিক শিক্ষার মানে। এ প্রসঙ্গে শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন- শিক্ষাকে যদি উন্নয়নের খরচ হিসেবে দেখা হয়, ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে দেখা না হয়, তাহলে কোনো সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী হবে না।’
তিনি আরও বলেন, বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোডিং ও সৃজনশীল দক্ষতার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের পাঠ্যক্রম এখনও প্রায় এক দশক আগের চিন্তাধারায় আবদ্ধ। তার মতে, সরকার যদি স্টার্টআপ, এডটেক ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় নীতিগত সহায়তা দেয়, তবে শিক্ষিত বেকারত্ব ও কর্মসংস্থান সংকট অনেকটাই লাঘব করা সম্ভব।
শিক্ষকদের বড় অংশের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। বহু প্রতিষ্ঠানে যোগ্য শিক্ষকের সংকট থাকলেও নতুন নিয়োগ প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে আছে।
মতিঝিলের একটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলেন, ‘আমরা শুধু বেতন বৃদ্ধির কথা বলছি না। আমরা চাই নিয়মিত প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ ও পেশাগত মর্যাদা। দক্ষ শিক্ষক ছাড়া আধুনিক পাঠ্যক্রমও শেষ পর্যন্ত অর্থহীন হয়ে পড়ে।’
পাঠ্যক্রমের পুরনো কাঠামো নিয়েও শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের ভাষায়- বর্তমান শিক্ষা এখনও মুখস্থনির্ভর ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক। কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী তানজিয়া আক্তার বলেন, ‘আমরা নম্বর পাচ্ছি, কিন্তু দক্ষতা অর্জন করছি না। বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করেও চাকরির বাজারে গিয়ে নিজেকে অপ্রস্তুত মনে হয়। বাধ্য হয়েই আবার কোচিংনির্ভর প্রস্তুতিতে যেতে হয়।’
অভিভাবকরাও চান এমন শিক্ষা, যা সন্তানকে বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করবে, শুধু সনদধারী করে তুলবে না। এ বিষয়ে অভিভাবকদের সংগঠন অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. জিয়াউল কবির দুলু বলেন, ‘শিক্ষা মানে শুধু ভালো ফল নয়; শিক্ষা মানে জীবনবোধ, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের বিকাশ। আমরা চাই, বিদ্যালয় থেকেই শিশুদের সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ দক্ষতা, দলগত কাজ ও প্রযুক্তির মৌলিক জ্ঞান শেখানো হোক।’
শিক্ষা উদ্যোক্তাদের দৃষ্টিতে, সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি বেসরকারি শিক্ষাকে সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মিজানুর রহমান বলেন, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উদ্যোক্তারা সীমিত সম্পদ ও নানামুখী চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তার মতে, নিবন্ধন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজীকরণ, স্বল্প সুদে ঋণ ও প্রণোদনা এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে শিক্ষার মান টেকসইভাবে বাড়বে।
শিক্ষা প্রশাসনের ভেতরের চিত্রও কম উদ্বেগজনক নয়। বহু প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক শূন্যতা, কোথাও আবার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘নীতিমালা আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। সংস্কার শুরু করতে হলে প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই হবে।’
নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা তাই স্পষ্ট। এ বিষয়ে শিক্ষাবিদ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ বলেন- ‘প্রথমত, শিক্ষা বাজেট উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, পাঠ্যক্রমকে দক্ষতাভিত্তিক ও যুগোপযোগী করতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণে স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা শুধু একটি খাত নয়- এটি গণতন্ত্র, অর্থনীতি ও সামাজিক অগ্রগতির ভিত্তি। নতুন সরকার শুরুতেই শিক্ষাকে অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে রাখলে এই আস্থার সংকট কাটিয়ে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
