ঢাকা
logo
প্রকাশিত : February 2, 2026

তীব্র লোডশেডিংয়ের শঙ্কা

আর কদিন পরই রমজান। তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুম। এই সময়টায় দেশজুড়ে তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, গ্যাস উৎপাদনের ধারাবাহিক পতন এবং বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিপুল বকেয়া পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতায় পরিস্থিতি আরো জটিল হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশঙ্কা করছেন, চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে এ সময়টায় দেড় হাজার মেগাওয়াট থেকে দুই হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হতে পারে, যা রমজানে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবেলা। গ্রীষ্মকাল ও সেচ মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যায়।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরও তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকার আভাস পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ফেব্রুয়ারিতে বিদ্যুতের চাহিদা হবে ১৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট, মার্চে ১৬ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং এপ্রিল ও মে মাসে তা বেড়ে দাঁড়াতে পারে ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে।

তীব্র লোডশেডিংয়ের শঙ্কাখাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। সূত্র জানায়, বিদ্যুৎ উৎপাদকরা একাধিকবার লিখিতভাবে জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন বিল পরিশোধ না হওয়ায় জ্বালানি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা যাচ্ছে না।

ব্যাংকঋণের সুদ ও সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধে ব্যর্থতা তৈরি হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। অথচ বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির ধারা অনুযায়ী দীর্ঘস্থায়ী অর্থ পরিশোধে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আর্থিক সংকট থেকে সৃষ্ট উৎপাদন ব্যাঘাতের দায় উৎপাদকদের ওপর চাপানো চুক্তি ও আইনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘সামনে রমজান ও গ্রীষ্মকাল আসছে।

এ সময়টায় স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুতের ওপর চাপ বাড়ে এবং চাহিদা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে। এই বিষয়টি মাথায় রেখেই আমরা আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো (আইপিপি) আমাদের পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের ছাড়া এই চাহিদা মোকাবেলা করা অসম্ভব। সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ দেবে, এই বিশ্বাস আমাদের আছে। আমরা সবাইকে নিয়েই পরিকল্পনা করছি। এপ্রিল-মে মাসে প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে আমরা এগোচ্ছি।’

গ্যাস সরবরাহ প্রসঙ্গে জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘পেট্রোবাংলার সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে প্রায় প্রতিদিনই সভা হচ্ছে। তারা আমাদের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ গ্যাস এলোকেশন দিয়েছে, তবে আমরা আরো বেশি গ্যাস চাই। আমদানি করা এলএনজি ও নিজস্ব উৎপাদনের গ্যাস যত বেশি পাওয়া যাবে, তত বেশি স্বস্তিতে থাকা যাবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডেভিড হাসানাত বলেন, ‘রমজান, সেচ মৌসুম ও গ্রীষ্মকাল—বিদ্যুতের চাহিদার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময় বকেয়া বিল পরিশোধ করা না হলে জ্বালানি আমদানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছয় মাসেরও বেশি সময়ের বিল পরিশোধ হয়নি। ফলে উদ্যোক্তাদের ব্যাংকঋণের সুদ দিতে গিয়ে চরম চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বেসরকারি বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর।’

ডেভিড হাসানাত বলেন, ‘বেসরকারি খাতে মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৯ হাজার মেগাওয়াট। এসব কেন্দ্রে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার। এই বিশাল বিনিয়োগ দেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই বিপুল বিনিয়োগের পরও বেসরকারি বিদ্যুৎ খাতের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে। পৃথিবীর কোথাও এভাবে চুক্তিভিত্তিক পাওনা আটকে রাখা হয় না। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে যারা প্রকৃতপক্ষে ভুল করেছে, তাদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যেত।’

সক্ষমতা থাকলেও উৎপাদনে সংকট : বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে গ্রিডভিত্তিক মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ১২ হাজার ২০৪ মেগাওয়াট, কয়লাভিত্তিক সাত হাজার ২০৩ মেগাওয়াট, ফার্নেস অয়েল পাঁচ হাজার ৬৩৪ মেগাওয়াট, ডিজেল ৭৬৮ মেগাওয়াট, নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে এক হাজার ৫৯ মেগাওয়াট ও আমদানি করা বিদ্যুৎ দুই হাজার ৬৯৬ মেগাওয়াট।

তবে বাস্তবে এই সক্ষমতার অর্ধেক উৎপাদন করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। গ্যাস, কয়লাসহ কোনো জ্বালানি উৎস থেকেই পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে গ্যাসসংকট সবচেয়ে প্রকট আকার ধারণ করেছে। পেট্রোবাংলার তথ্যানুযায়ী, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। আন্তর্জাতিক কম্পানি শেভরনের উৎপাদনও কমতির দিকে। সরকার চাইলে বাড়তি এলএনজি আমদানি করে উৎপাদন বাড়ানোর সম্ভাবনাও নেই। কারণ দুটি এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতা মাত্র এক হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে সরকার চাইলেই বিদ্যুৎকেন্দ্রে বাড়তি গ্যাস সরবরাহের সুযোগ নেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘দেশে গ্যাস উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে এবং উৎপাদন বাড়াতে নেওয়া আগের উদ্যোগগুলো কার্যকর হয়নি। এর ফলে সামনে আরো বড় গ্যাসসংকট দেখা দিতে পারে, যার প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদনেও পড়বে।’

তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের বিল বকেয়া রয়েছে। বর্তমান সরকার বকেয়াগুলো যাচাই করছে—এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে অনিয়ম না থাকলে বিল পরিশোধে দেরি করা উচিত নয়। সরকার আদানিসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পাওনা পরিশোধ করলেও দেশীয় উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে একই ন্যায়সংগত আচরণ প্রয়োজন।’

অধ্যাপক তামিম সতর্ক করে বলেন, ‘বকেয়া দ্রুত পরিশোধ না করা হলে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উৎপাদন বন্ধ করে দিতে পারে, যা বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে মারাত্মক সংকট সৃষ্টি করবে। শিল্প, বিদ্যুৎ ও গৃহস্থালি খাত এরই মধ্যে এর প্রভাব অনুভব করছে।’

এই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে ‘আসন্ন রমজান মাস, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গ্রীষ্মকালীন সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি’ শীর্ষক এক আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকট ও সম্ভাব্য উত্তরণের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়। অনলাইনে যুক্ত হয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘নির্বাচনকালীন সময়সহ রমজান, সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে হবে। গত বছর যেমন বিদ্যুৎ সরবরাহে তুলনামূলক স্বস্তি ছিল, চলতি বছরও তেমন ব্যবস্থা নিতে হবে।’

নির্বাচনের পর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ইঙ্গিত : সম্প্রতি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানিতে বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, বিপুল আর্থিক ঘাটতি কমাতে নির্বাচনের পর বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। বিদ্যুৎ বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ সোলায়মান বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের লোকসান হচ্ছে এবং নির্বাচনের পরই দাম সমন্বয়ের জন্য বিইআরসিতে প্রস্তাব দেওয়া হবে।’ তবে পাইকারি না গ্রাহক পর্যায়ে, কোথায় দাম বাড়বে, তা স্পষ্ট করা হয়নি।

গণশুনানিতে বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম জানান, ফার্নেস অয়েলের উচ্চমূল্যের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ বেড়েছে। বিপিসির কাছ থেকে তেল কিনতে বেশি খরচ পড়ছে, যেখানে আমদানিতে তুলনামূলক কম ব্যয় হয়। তিনি বলেন, ‘একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান লাভ করতে গিয়ে আরেকটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিগ্রস্ত করা ঠিক নয়।’

বিপিডিবির পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ ১১.৮৩ টাকা হলেও পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ৬.৯৯ টাকায়। এতে প্রতি ইউনিটে প্রায় ছয় টাকা ঘাটতি হচ্ছে। ওই অর্থবছরে ৩৮ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েও বিপিডিবির লোকসান হয়েছে ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা। তিনি আরো জানান, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিটে খরচ পড়ছে ২৭.৩৯ টাকা, যেখানে গ্যাসে ৭.০৯ টাকা এবং কয়লায় ১৩.২০ টাকা। বিপিডিবির দাবি, বিপিসির কাছ থেকে ফার্নেস অয়েল কিনে তারা বড় লোকসানে পড়ছে অথচ বিপিসি লাভ করছে।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. মো: জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram