ঢাকা
logo
প্রকাশিত : January 4, 2026

প্রকল্প স্থবিরতায় সংকটে নির্মাণশিল্প

নানা জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরেই স্থবির হয়ে আছে দেশের মেগাপ্রকল্পগুলো। অর্থায়নের অনিশ্চয়তায় নতুন কাজ হাতে নিতে ভয় পাচ্ছেন ঠিকাদাররা। একই সঙ্গে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগকারীরা পিছিয়ে যাচ্ছেন নতুন সিদ্ধান্ত থেকে। ফলে নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপন বা বিদ্যমান শিল্পের সম্প্রসারণ কার্যক্রম কার্যত থমকে গেছে।

অনেক ব্যবসায়ী কেবল গতানুগতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন, আবার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বেশ কিছু শিল্প-কারখানাও। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানে—নতুন চাকরির সুযোগ কমছে, কর্মসংস্থানের পথও ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে এর নেতিবাচক অভিঘাত পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে।

পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে উন্নয়ন কার্যক্রম ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।

সদ্যঃসমাপ্ত অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৫৫ শতাংশ, যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। চলতি অর্থবছরেও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। প্রথম পাঁচ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ১১ শতাংশ, যা আইএমইডির তথ্যে আবারও সর্বনিম্ন রেকর্ড।

খাতভিত্তিক চিত্র আরো উদ্বেগজনক।

চলতি অর্থবছরে সড়ক ও মহাসড়ক খাতে কাজ হয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরে এই খাতে কাজ হয়েছিল ৪০ শতাংশেরও কম। রেল, নৌ, সেতু, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য—কোনো খাতেই কাজের অগ্রগতি ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের বেশি হয়নি। ফলে বড় অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জনসেবামূলক প্রকল্পগুলোর সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না।

গত কয়েক বছর ধরে বাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল নির্মাণসামগ্রীর লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি।

রড, সিমেন্ট, ইটসহ প্রায় সব উপকরণের দাম একসময় আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। তবে গত এক বছরে এই চিত্র কিছুটা বদলেছে। নির্মাণ খাতে বেচাকেনায় ভাটা পড়ায় রড ও সিমেন্টের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কিন্তু দাম কমলেও চাহিদা নেই।

রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা নির্মাণসামগ্রীর বাজার ঘুরে দেখা যায়, নির্মাণের প্রধান উপকরণ রড বর্তমানে প্রতি টন ৭৩ থেকে ৮২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছর যা ছিল ৮০ থেকে ৮৮ হাজার টাকা।

২০২৩ সালের মধ্যভাগে রডের দাম একসময় এক লাখ টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। একইভাবে ইট ও সিমেন্টের দামও কমেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত বছরের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে নতুন প্রকল্প নেওয়ার প্রবণতা কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে নির্মাণসামগ্রীর চাহিদায়। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে ব্যক্তি পর্যায়ের বাড়ি নির্মাণও আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।

রাজধানীর কুড়িল এলাকার হেলমি এন্টারপ্রাইজের ব্যবসায়ী শামীম বলেন, ‘একেবারেই বেচাকেনা নেই। আগে যে পরিমাণ বিক্রি হতো, এখন তার অর্ধেকও হচ্ছে না। কেউ নতুন কাজ শুরু করছে না। সরকারি কাজও প্রায় বন্ধ।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস প্রাইস ইনডেক্স অনুযায়ী, গত অর্থবছরের শুরু থেকেই ভবন নির্মাণসামগ্রীর দাম কমছে। গত বছরের জানুয়ারিতে ভবন নির্মাণে প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যস্ফীতি ছিল ৫.৯৬ শতাংশ, যা নভেম্বর মাসে নেমে এসেছে ৩.৫৩ শতাংশে।

তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গত তিন বছরের বেশি সময় ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক উচ্চ সুদহার আরোপ করে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। এর ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি তলানিতে ঠেকেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি গত অক্টোবরে নেমে আসে ৬.২৩ শতাংশে, যা জানুয়ারিতে ছিল ৭.১৫ শতাংশ। করোনাকালেও ঋণ প্রবৃদ্ধি ৭.৫ শতাংশের নিচে নামেনি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, কৃষি, শিল্প ও অবকাঠামো নির্মাণ খাতের উপকরণ আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে হাই স্পিড ডিজেল আমদানি কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ। ফার্নেস অয়েল আমদানি কমেছে ১০ শতাংশ, সিমেন্ট ক্লিংকার কমেছে এক লাখ ৩৯ হাজার মেট্রিক টন। বিটুমিন আমদানি কমেছে ২২ শতাংশ এবং পাথর আমদানি কমেছে ১৬ শতাংশ। এসব উপকরণ কম আসায় অর্থনীতির গতি আরো শ্লথ হচ্ছে।

এর প্রভাব পড়ছে শ্রমবাজারেও। ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বছর শেষে দেশে বেকারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ লাখ ৩০ হাজারে, যা আগের বছর ছিল ২৪ লাখ। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, গত অর্থবছরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৩.৩ শতাংশ, করোনাকাল বাদ দিলে গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

প্রিমিয়ার সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিরুল হক বলেন, সরকার বর্তমানে মুদ্রা সংকোচন নীতিতে রয়েছে। প্রায় এক বছর ধরে উন্নয়ন কার্যক্রম স্থবির। নতুন প্রকল্প না হলে বা নির্মাণকাজ না বাড়লে চাহিদা কমবে—এটাই স্বাভাবিক।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বিনিয়োগের বর্তমান প্রবৃদ্ধিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা গেলেও সামগ্রিক বিনিয়োগ সম্ভাবনার তুলনায় তা অপ্রতুল। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নির্বাচন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ছাড়া এই স্থবিরতা কাটানো কঠিন।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) বলছে, উন্নয়ন ও বিনিয়োগে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতার প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দ্রুত গতি না ফিরলে অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে স্থবিরতার ফাঁদে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে। তাই রাজস্ব আদায় জোরদার, উন্নয়ন ব্যয়ে শৃঙ্খলা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. মো: জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram