

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে বিদ্যুৎ জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ আইনের কারণে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা ছাড়াই বিদ্যুৎ ও জ্বালানির প্রকল্পগুলো অনুমোদনের সুযোগ ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই আইনটি বাতিল এবং বিগত সরকারের দেওয়া ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমোদন বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে নতুন করে প্রকল্পগুলো যাচাই-বাছাই এবং ট্যারিফ কমিয়ে আনতে কাজ শুরু করে বিদ্যুৎ বিভাগ। অবশেষে যাচাই-বাছাই শেষে বাতিল করা প্রকল্পগুলো থেকে ১২টি প্রকল্প লেভেলাইজড ট্যারিফে অনুমোদন দেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৯১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার ১২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ২০ বছর মেয়াদে বিদ্যুৎ কিনবে সরকার। তবে আগের তুলনায় খরচ কমবে। ট্যারিফ কমিয়ে আনায় নতুন ট্যারিফে বছরে সাশ্রয় হবে ৪২০ কোটি টাকা।
বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত ৯ ডিসেম্বর সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে ১২টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের নতুন ট্যারিফ অনুমোদনের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। প্রস্তাবটি উপস্থাপন করে বিদ্যুৎ বিভাগ। এগুলোর বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বাবিউবো)।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাজুল করিম খান বলেন, আগে অনুমোদন দেওয়া প্রকল্পগুলোর ট্যারিফ বেশি ছিলো। সেগুলো বাতিল করে নতুন করে মূল্যায়নে নতুন ট্যারিফে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় দুই থেকে তিন সেন্ট করে কমেছে। সার্বিকভাবে ১২টি কেন্দ্রে বছরে সাশ্রয় হবে ৪২০ কোটি টাকা। শুধু সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়, অন্যান্য বিদ্যুৎ কেন্দ্রেও ট্যারিফ কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। জানা গেছে, দরপত্র ছাড়া চুক্তির কারণে বিগত সরকার অনুমোদিত ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সম্মতিপত্র গত বছর বাতিল করে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এর মধ্যে ৩১টি বেসরকারি খাতের।
৯ ডিসেম্বর উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে অনুমোদিত কেন্দ্রগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামে হবে তিনটি। এর মধ্যে ফটিকছড়িতে ২০০ মেগাওয়াটের একটি ও ৪৫ মেগাওয়াটের একটি এবং হাটহাজারীতে ১৮ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্র। কক্সবাজারে ১০০ মেগাওয়াট করে চকরিয়ার খুটাখালীতে একটি এবং রামু উপজেলার জোয়ারিয়া নালায় একটি। পাবনা সদরে ১০০ মেগাওয়াটের একটি ও একই জেলার হেমায়েতপুরে ৭০ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হবে। এ ছাড়া নোয়াখালীর সুধারামে ১০ মেগাওয়াট, মৌলভীবাজারে ২৫ মেগাওয়াট, নীলফামারীর জলঢাকায় ৫০ মেগাওয়াট, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জের বিবিয়ানায় ৫০ মেগাওয়াট এবং বাগেরহাটের মোংলার বুড়িরডাঙ্গায় ১০০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হবে।
ক্রয়সংক্রান্ত কমিটির বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, আগে এসব কেন্দ্র থেকে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুতের দাম ধরা হয়েছিল ১৩ টাকার কিছু বেশি। নতুন করে ট্যারিফ নির্ধারণ করায় প্রতি কিলোওয়াটের দাম কিছুটা কমেছে। বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবে বলা হয়, বিদ্যুৎ খাতের সংস্কার কার্যক্রম পর্যালোচনা এবং এ খাতে অধিকতর সক্ষমতা, গতিশীলতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের লক্ষ্যে বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে গত বছরের ২৫ আগস্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি গণখাতে ক্রয় আইন, ২০০৬ ও গণখাতে ক্রয় বিধিমালা, ২০০৮ অনুসারে বিদ্যুৎ কেনার জন্য প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বানের জন্য একটি খসড়া দরপত্র দলিল তৈরি করে। খসড়ার আওতায় বাবিউবো বেসরকারি খাতে নির্মাণ, মালিকানা ও পরিচালনা (বিওও) ভিত্তিতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করে তা থেকে বিদ্যুৎ কেনার দরপত্র আহ্বান করে।
ক্রয় কমিটিকে বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, আগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর আওতায় অযাচিত প্রস্তাবের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এগুলোর সম্মতিপত্র (লেটার অব ইনটেন্ট) বাতিল করা হয়। তখন প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুতের গড় দাম ধরা হয়েছিল ১৩ টাকার বেশি।
যাচাই কমিটি বলছে, গত ১৫ বছরে দলীয় বিবেচনায় একের পর এক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার বেশির ভাগই অনুমোদন পেয়েছে বিশেষ আইন ও রাজনৈতিক বিবেচনায়। অনুমোদনের ক্ষেত্রে অকৃষি জমির কথা বলা থাকলেও কার্যত অধিকাংশ ক্ষেত্রে কৃষি জমিকে অকৃষি দেখিয়ে অনুমোদন নেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রকল্পে বিদ্যুতের ট্যারিফ নির্ধারণেও বাড়তি সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। যেখানে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় ট্যারিফ ধরা হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। সর্বনিম্ন প্রতি ইউনিটের দাম ৯ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছিল। এসব সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রেগুলো থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার ফলে মানুষকেও বাড়তি দামে বিদ্যুৎ কিনতে হতো।
