

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। এডিপি বাস্তবায়নে বেহাল দশা কাটেনি স্বাস্থ্য খাতেও। গত অর্থবছরে স্বাস্থ্যের দুই বিভাগে এডিপি বাস্তবায়ন ছিল মূল এডিপির ১০ শতাংশেরও কম। চলতি অর্থবছরেও একই অবস্থা বিরাজ করছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে।
একই অবস্থা অন্যান্য বিভাগেও। যার ফলে চলতি অর্থবছরের এডিপি থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা কাটছাঁট করা হচ্ছে।
গতকাল সোমবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে ১১.৭৫ শতাংশ।
গত অর্থবছরের একই সময় এই হার ছিল ১২.২৯ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, স্বাস্থ্যের দুই বিভাগে গত অর্থবছরের মতোই এডিপি বাস্তবায়ন তলানিতে। পাঁচ মাসে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ মাত্র ১.৮১ শতাংশ, আর স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ বাস্তবায়ন করেছে ৩.৯২ শতাংশ।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে ১১.৭৫ শতাংশ।
এটি গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম। সরকারের নানা উদ্যোগ নেওয়ার পরও এডিপি বাস্তবায়নের হার বাড়ছে না। যার প্রভাব পড়েছে সার্বিক অর্থনীতিতে। চলতি অর্থবছর (২০২৫-২৬) সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বরাদ্দ দুই লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। প্রথম পাঁচ মাসে খরচ হয়েছে ২৮ হাজার ৪৩ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ মাসিক ইকোনমিক আপডেটে জানিয়েছে, এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতি স্পষ্ট। এই প্রবৃদ্ধিকে প্রকৃত উন্নতি বলা যাচ্ছে না। বরং প্রকল্প শুরুর বিলম্ব, তহবিল ছাড়ে জটিলতা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার দুর্বলতা আগের মতোই বহাল রয়েছে। এর ফলে অর্থনীতির বিনিয়োগ চক্রে গভীর প্রভাব পড়ছে : নতুন প্রকল্প কমে যাচ্ছে, কর্মসংস্থান কমছে এবং উৎপাদন সম্প্রসারণ থমকে আছে।
আইএমইডির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, একক মাস হিসেবে নভেম্বরে খরচ হয়েছে আট হাজার ১৬৫ কোটি টাকা বা ৩.৪২ শতাংশ। এটিও গত অর্থবছরের ৪.৪০ শতাংশের তুলনায় অনেক কম। এই অর্থবছরে এক হাজার ১৯৮টি প্রকল্প চলমান রয়েছে। এর মধ্যে এক হাজার ১৫টি বিনিয়োগ প্রকল্প। এসব প্রকল্পের মধ্যে সরকারি অর্থায়ন থেকে গত পাঁচ মাসে খরচ হয়েছে ১৫ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা, বিদেশি ঋণ থেকে খরচ হয়েছে ১০ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা, মন্ত্রণালয়গুলোর নিজস্ব অর্থায়ন হয়েছে এক হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে সবচেয়ে বেশি সাত হাজার ২০২ কোটি টাকা খরচ করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এরপর সর্বোচ্চ তিন হাজার ২২৮ কোটি টাকা খরচ করেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। দুই হাজার ৪৯৬ কোটি টাকা খরচ করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। দুই হাজার ৩৮০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে সড়ক-মহাসড়ক বিভাগ। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় খরচ করেছে এক হাজার ৬৫১ কোটি টাকা। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় খরচ করেছে ৮০৭ কোটি টাকা। মাত্র ৮৬ কোটি টাকা খরচ করেছে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ, আর ২৯৩ কোটি টাকা খরচ করেছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ।
গত অর্থবছরের শেষে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছিল মাত্র ৬৮ শতাংশ। এডিপি বাস্তবায়নের বেহাল দশা নিয়ে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘গত অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল সবচেয়ে কম। চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের হার বাড়ানোর জন্য বিশেষ নজরদারি চলছে।’
এদিকে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে এবার কাটছাঁট হচ্ছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত উন্নয়ন বাজেট বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) দুই লাখ কোটি টাকা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, যে সময় স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ার কথা ছিল, ঠিক সেই সময়ই বরাদ্দ কমানো ‘নিরাশাজনক’। তাঁর মতে, এসব খাতে ব্যয় বাড়ালে মানবসম্পদ উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়, পরিবারগুলোর আয় বাড়ে এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছেও অতিরিক্ত সম্পদ পৌঁছায়। উন্নয়ন ব্যয় কমে গেলে নির্মাণসামগ্রীর বাজার সংকুচিত হতে পারে এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণও কমে যেতে পারে।
