

রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে হতাহতের ঘটনায় ট্রমার মধ্যে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে রাজধানীর স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীরা। নিরাপত্তার কথা ভেবে অনেক অভিভাবক সন্তানদের স্কুলে পাঠানো নিয়ে উদ্বিগ্ন। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আশ্বস্ত করার মতো কোনো পদক্ষেপ এখনো নিতে পারেনি শিক্ষা প্রশাসন।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন স্কুলে খোঁজ নিয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম পাওয়া যায়। বেশির ভাগ স্কুলে ষাণ্মাসিক পরীক্ষা চলছে। এ জন্য অভিভাবকরা উদ্বেগের মধ্যে থেকেও সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়েছেন।
অনেক অভিভাবক স্কুলভ্যান বা গাড়িতে শিক্ষার্থীদের পাঠালেও গতকাল ব্যতিক্রম ছিল। অনেক অভিভাবক নিজেরাই সন্তানদের স্কুলে নিয়ে গেছেন, আবার নিয়ে এসেছেন।
অভিভাবকরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন অনলাইন ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় চোখ এখন শিক্ষার্থীদেরও। তারা মাইলস্টোন স্কুলের বিভিন্ন মর্মান্তিক ছবি দেখে ট্রমার মধ্যে চলে যাচ্ছে।
এ ঘটনা নিয়ে তারা মা-বাবাকে বারবার নানা প্রশ্ন করছে। অভিভাবকরা এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলছেন। অনেকে বাকরুদ্ধ হয়ে নীরবে অশ্রু ফেলছেন।
রাজধানীর শহীদ পুলিশ স্মৃতি স্কুল অ্যান্ড কলেজের অভিভাবক আলতাফ হোসেন বলেন, ‘আমরা খুবই আতঙ্কিত! মাইলস্টোনের ঘটনায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছি। আমার সন্তানের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটতে পারত।
স্কুল বাচ্চার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হওয়ার কথা। কিন্তু এখন আমার সন্তান যে পাঁচ ঘণ্টা স্কুলে থাকবে, সেই পুরোটা সময়ই দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকব। সরকারের আগে উচিত হবে স্কুলকে নিরাপদের জন্য যা যা করা দরকার তা করা। এখন চিন্তা করছি, আপাতত চলতি সপ্তাহ ছেলেকে স্কুলে পাঠাব না।’
সূত্র মতে, বাংলাদেশের ইতিহাসে স্কুল চলাকালে এ ধরনের দুর্ঘটনা এটাই প্রথম। একই সঙ্গে স্কুলে এমন বিপুলসংখ্যক হতাহত আগে কখনো ঘটেনি। এমন পরিস্থিতিতে গত সোমবার সারা দেশ যখন শোকে স্তব্ধ, তখন অনেকটাই ঘুমিয়ে ছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর। অথচ এ সময় সারা দেশের শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের জন্য তাদের সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখার কথা ছিল।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশি অধিদপ্তরে অদক্ষ কর্মকর্তারা ঘাঁটি গেড়ে বসেছেন। তাঁরা শুধু ব্যক্তিগত সুবিধা নিতেই ব্যস্ত। এরই মধ্যে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব সিদ্দিক জুবাইরকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। শিক্ষা উপদেষ্টা ড. সি আর আবরারের পদত্যাগের দাবিতেও বিক্ষোভ করছে শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে মাউশি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আজাদ খানের নেতৃত্ব নিয়েও বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করে রাজধানীর একটি স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ বলেন, ‘আমরা নিজেরাও কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। আমরা ইচ্ছা করলেই স্কুল বন্ধ করতে পারি না। এ অবস্থায় উদ্যোগ নেওয়ার কথা ছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশি অধিদপ্তরের। মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় শোক। শিক্ষার্থীরা ট্রমার মধ্যে। এ অবস্থায় মাউশি নির্দেশনার মাধ্যমে স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখতে পারত। পরীক্ষা থাকলেও তা পরে নিলে তেমন সমস্যা হতো না। শিক্ষার্থীরা কিছুটা হলেও ট্রমা কাটাতে পারত।’
জানা যায়, বিমান দুর্ঘটনার পরদিন গতকাল মঙ্গলবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ছিল। কিন্তু এ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার হলে বসার মতো মানসিক অবস্থা ছিল না। এমনকি মাইলস্টোন কলেজেও পরীক্ষাকেন্দ্র ছিল। এ ছাড়া উত্তরার বিভিন্ন কলেজে একাধিক পরীক্ষকেন্দ্র রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা দাবি তুললেও পুরোপুরি নিশ্চুপ ছিল শিক্ষা প্রশাসন। তবে গত সোমবার গভীর রাতে পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দেয় তথ্য মন্ত্রণালয়। অথচ এ দায়িত্ব ছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। পরে গতকাল ভোরে পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা আসে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে। তথ্য জানতে না পারায় অনেক শিক্ষার্থী ঠিকই পরীক্ষাকেন্দ্রে উপস্থিত হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে গতকাল আইন উপদেষ্টা, শিক্ষা উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব মাইলস্টোন স্কুলে গেলে তাঁদের দীর্ঘসময় অবরুদ্ধ করে রাখে শিক্ষার্থীরা। পরে সেখান থেকে কাল বৃহস্পতিবারের এইচএসসি পরীক্ষাও স্থগিতের ঘোষণা দেন শিক্ষা উপদেষ্টা।
সূত্র জানায়, রাজধানীর বড় স্কুলগুলোতে সমস্যার কোনো শেষ নেই। বিমান দুর্ঘটনা আকস্মিক হলেও যেকোনো সময় আরো বড় ধরনের বিপদ আসতে পারে। সে ব্যাপারে স্কুল কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষা প্রশাসনের তেমন কোনো খেয়ালই নেই। ইচ্ছামতো শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে। প্রতিটি স্কুলেই ডাবল শিফট করা হয়েছে। ফলে সব সময় স্কুলে শিক্ষার্থীদের ভিড় লেগেই থাকে। কিন্তু সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নেই। অনেক স্কুলেই লিফট আছে। সেটা এখন মারণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনা ঘটলেও তা ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। স্কুলের বারান্দাগুলো অরক্ষিত। স্কুলের পাশে যানবাহন চলাচলে নিয়ন্ত্রণ নেই। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে।
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু বলেন, ‘সন্তান যক্ষের ধন। ছেলে-মেয়ে বাবা-মায়ের কাছে যতখানি নিরাপদ, সেটা মনে করেই সন্তানকে আমরা স্কুলে পাঠাই। কিন্তু মাইলস্টোনের ঘটনায় আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছি। তবে হাইকোর্ট শিক্ষার্থীদের আইডি কার্ডে অভিভাবকের ফোন নম্বর ও রক্তের গ্রুপ উল্লেখ করতে বলেছেন। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা যথাযথ করতে বলেছেন। নিহত শিক্ষার্থীর পরিবারকে পাঁচ কোটি ও আহতদের প্রত্যেককে এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে বলেছেন। আদালতের এ নির্দেশকে আমরা সাধুবাদ জানাই। অতি দ্রুত তা বাস্তবায়নের দাবি জানাই। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারেরও দাবি জানাচ্ছি।’
