

দিল্লির সাধারণ একটি পরিবার থেকে উঠে এসে বলিউড রাজত্ব করছেন শাহরুখ খান। খুব অল্প বয়সে বাবা-মাকে হারান কিং খান। কিন্তু সেই কষ্টকে শক্তিতে পরিণত করেন তিনি। কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস, দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে ভারতীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে অন্যতম সফল ক্যারিয়ার গড়েছেন।
তবে শাহরুখ খানের খ্যাতির শিখরে ওঠার যাত্রা শুরু হয়েছিল খুবই সামান্য পারিশ্রমিক দিয়ে। আর এখন কয়েক হাজার কোটি রুপির মালিক এই ‘বাজিগর’। কয়েক বছর আগে প্রথম পারিশ্রমিক নিয়ে মুম্বাই মিরর-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কথা বলেন শাহরুখ খান। এই অভিনেতা বলেন, “দিল্লিতে পঙ্কজ উদাসের একটি গজল অনুষ্ঠানে এক সন্ধ্যায় দর্শকদের আসন দেখানোর কাজ করেছিলাম, যার বিনিময়ে আমাকে ৫০ রুপি পারিশ্রমিক দেওয়া হয়েছিল। আমার প্রথম উপার্জিত সেই অর্থ দিয়ে ট্রেনে করে আগ্রা গিয়েছিলাম তাজমহল দেখতে। আমার মনে আছে, সেখানে আমরা তুলসীর বীজ মেশানো গোলাপি রঙের লাচ্চি খেয়েছিলাম। আমার সেই অভিজ্ঞতা আজ অবিস্মরণীয়।”
এরপর মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা শাহরুখ খান দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন। খ্যাতির পাশাপাশি কুড়িয়েছেন অর্থ। গত ৫ মার্চ, হুরুন গ্লোবাল রিচ লিস্ট প্রকাশিত হয়। এ তালিকায় জায়গা করে নেন শাহরুখ খান। এর মধ্য দিয়ে শুধু চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম বড় তারকা হিসেবেই নন, প্রভাবশালী একজন ব্যবসায়ী হিসেবেও নিজের অবস্থান আরো সুদৃঢ় করেন। প্রকাশিত এই তালিকা অনুযায়ী, শাহরুখ খানের মোট সম্পদের পরিমাণ ১.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় ১০ হাজার ৮০০ কোটি রুপি (বাংলাদেশি মুদ্রায়)। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের অন্যতম ধনী অভিনেতা হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন কিং খান।
১৯৬৫ সালে ২ নভেম্বর ভারতের নয়াদিল্লিতে এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শাহরুখ খান। তার শৈশবের প্রথম পাঁচ বছর কেটেছে ম্যাঙ্গালুরুতে। শাহরুখের দাদা ইফতিখার আহমেদ স্থানীয় পোর্টের প্রধান ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। যার কারণে সেখানে বসবাস করেন তারা। শাহরুখের বাবার নাম তাজ মোহাম্মদ খান, মা লতিফ ফাতিমা।
দিল্লির হংসরাজ কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন শাহরুখ খান। তারপর জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়াতে গণযোগাযোগ বিষয়ে মাস্টার্সে ভর্তি হন। কিন্তু অভিনয় জীবন শুরু করার কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দেন তিনি। তবে বলিউডে ক্যারিয়ার শুরুর দিকে দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা-তে ভর্তি হন এই শিল্পী।
১৯৯২ সালে ‘দিওয়ানা’ সিনেমার মাধ্যমে বলিউডে পা রাখেন শাহরুখ খান। রোমান্টিক ঘরানার এ সিনেমায় অভিনয় করে নজর কাড়েন তিনি। সিনেমাটিতে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণে সেরা নবাগত অভিনেতা হিসেবে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার লাভ করেন শাহরুখ।
একই বছর ‘চমৎকার’, ‘দিল আসনা হে’ ও ‘রাজু বান গেয়া জেন্টলম্যান’ সিনেমায় অভিনয় করেন শাহরুখ। তার পরের বছর ‘ডর’ ও ‘বাজিগর’ সিনেমায় অভিনয় করে নিজের জাত চেনান শাহরুখ। তার অভিনয়ের জাদুতে মুগ্ধ হন কোটি ভক্ত; পৌঁছে যান সাফল্যের চূড়ায়। তার অভিনয়ের খ্যাতি আরো বাড়তে থাকে যশরাজ ফিল্মসের সিনেমায় ধারাবাহিকভাবে অভিনয় করে। একের পর এক হিট সিনেমা উপহার দিয়ে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে অবস্থান করেন শাহরুখ। যদিও তার এই সফলতার জার্নির গল্প মোটেও সহজ ছিল। আর সে গল্প সবারই জানা।
২০২৪ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত হয় ‘গ্লোবাল ফ্রেইট সামিট’। এতে যোগ দিয়ে নিজের ক্যারিয়ার, জীবন নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন শাহরুখ। জীবনের কোনো অংশকেই অস্বীকার করতে চান না তিনি। শাহরুখ বলেন, “আমি ভারতের খুবই দরিদ্র, নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছি। সুতরাং আমার ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো ইচ্ছাই ছিল না। আমি যা পেয়েছি… এটা ভুল না। আমি যা পেয়েছি, সেটাকে সম্মান করি। আমি হৃদয় থেকে সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমি উপলদ্ধি করেছি, কেবল আমার কারণে আমি সফল হইনি; আমি যেভাবে জীবন পরিচালনা করেছি, সেখানে অসংখ্য মানুষের অংশগ্রহণ রয়েছে। সেটা সিনেমা এবং আমার ব্যক্তিগত জীবনেও।”
শাহরুখ তার জীবনের সাফল্যকে নিজের বলতে নারাজ। তার ভাষায়—“সম্ভবত মানুষ আমাকে অত্যন্ত ‘নম্র’ বলে সম্বোধন করেন। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, আমার সাফল্যের পেছনে রয়েছে অসংখ্য মানুষের সহযোগিতা। সেটা ব্যক্তিগত ও পেশাগত দুই জায়গাতেই। যদি আমার সাফল্যকে নিজের বলি, তবে এটি মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই না।”
খানিকটা ব্যাখ্যা করে শাহরুখ খান বলেন, “আমি যা কিছু পেয়েছি। যেমন: খ্যাতি, ধনসম্পদ। কিন্তু এসব আমার নয়। আমি অত্যন্ত নম্র নই; আমি সৎ, এসব আমার নয়। আমি যে বাড়ির রেলিংয়ে দাঁড়াই, এটা কেবল আমার জন্য নয়, যা কিছু হয়েছে, তার সবই আমার জন্যই—এটা ভাবা কেবলই মূর্খতা। কারণ একমুখী রাস্তা হতে পারে না।”
শাহরুখ যেমন অন্যদের সাহায্য পেয়েছেন, তেমনই অন্যদেরও সহযোগিতা করতে চান তিনি। এ বিষয়ে ‘পাঠান’ তারকা বলেন, “যখন আমি দিল্লিতে আসি তখন আমার পকেটে কোনো টাকা ছিল না। আমি চাই সবাই সুযোগ পাক, যেমনটা আমি পেয়েছিলাম। আমি সহযোগিতার অংশীদার হতে চাই। অসংখ্য মানুষ আমাকে সুযোগ দিয়েছেন। আমিও এ ধরনের সুযোগ দিতে চাই, যেমনটা আমি পেয়েছি। আমার সহযোগিতা কারো জীবন বদলে যেতে পারে।”
অভিনয় ক্যারিয়ারে অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন শাহরুখ খান। তার মধ্যে মোট পনেরোবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার লাভ করেছেন তিনি। এর মধ্যে আটবার সেরা অভিনেতা হিসেবে পুরস্কার পেয়েছেন। হিন্দি সিনেমায় বিশেষ অবদানের জন্য ২০০২ সালে তাকে পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত করে ভারত সরকার। এ ছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি গ্রহণ করেন মোট পাঁচবার। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য সম্মাননা পেলেও ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ছিল অধরা। গত বছর এ পুরস্কার তার প্রাপ্তির ঝুলিতে জমা পড়েছে।
*ইন্ডিয়া টুডে, ডেকান ক্রনিকল, মুম্বাই মিরর, ইন্ডিয়া টুডে অবলম্বনে
