ঢাকা
logo
প্রকাশিত : November 2, 2026

ইরান যুদ্ধের আগে-পরে তেলের বাজার : ৫৪% মূল্যবৃদ্ধির চাপে বিশ্ব

ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের আট মাস পেরিয়ে গেলেও স্বাভাবিক হয়নি বিশ্ব জ্বালানি বাজার। যুদ্ধ শুরুর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ছিল ৭২ থেকে ৭৩ ডলারের মধ্যে।

আর ২ নভেম্বর ২০২৬-এ তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১২ ডলারে। অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৫৪ শতাংশ।

শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, যুদ্ধের প্রভাবে ডিজেল, পেট্রোল ও জেট ফুয়েলের মতো পরিশোধিত জ্বালানির বাজারেও তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অস্থিরতা। বিশেষ করে ডিজেলের সরবরাহ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি বিশ্ব অর্থনীতি, পরিবহন ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা ও সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কার মধ্যে সেদিন ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম ২ দশমিক ৪৫ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৭২ দশমিক ৪৮ ডলারে স্থির হয়েছিল। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ছিল ৬৭ দশমিক ০২ ডলার।

অন্যদিকে, ২ নভেম্বরের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে রয়টার্সের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল ১১১ দশমিক ৮৪ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে ডব্লিউটিআইয়ের দাম ছিল ১০২ দশমিক ৫৬ ডলার।

এই হিসাবে যুদ্ধ শুরুর আগের শেষ কার্যদিবসের তুলনায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়েছে ব্যারেলপ্রতি ৩৯ দশমিক ৩৬ ডলার বা প্রায় ৫৪ দশমিক ৩ শতাংশ। ডব্লিউটিআইয়ের ক্ষেত্রেও মূল্যবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য।

অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি পরিশোধিত জ্বালানির বাজারেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত অক্টোবর মাসের ‘অয়েল মার্কেট রিপোর্ট’ অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সিঙ্গাপুরে পাইকারি ডিজেলের দাম প্রতি ব্যারেল ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে তা সর্বোচ্চ প্রায় ২২০ ডলারে পৌঁছায়।

আইইএ বলছে, সেপ্টেম্বরের ওই রেকর্ড মূল্য থেকে কিছুটা কমলেও ডিজেলের আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক মূল্য এখনো অপরিশোধিত তেলের দামের প্রায় দ্বিগুণ এবং যুদ্ধপূর্ব পর্যায়ের তুলনায় অনেক বেশি।

পরিশোধিত জ্বালানির সাম্প্রতিক বাজারদরের চিত্রেও এর প্রতিফলন রয়েছে। ৩০ অক্টোবরের সিঙ্গাপুর বাজারের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ১০ পিপিএম গ্যাসঅয়েল বা ডিজেলের দাম ছিল প্রতি ব্যারেল ১৭০ দশমিক ০২ ডলার। একই দিনে গ্যাসোলিনের দাম ছিল ১২৭ দশমিক ৬৪ ডলার এবং জেট কেরোসিনের দাম ছিল ১৬৮ দশমিক ৪২ ডলার।

এখানে উল্লেখ্য, অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির দাম সরাসরি এক ধরনের পণ্য হিসেবে তুলনীয় নয়। অপরিশোধিত তেল শোধন করে ডিজেল, গ্যাসোলিন ও জেট ফুয়েল উৎপাদন করা হয়। তাই শোধনাগারের সক্ষমতা, সরবরাহ সংকট, পরিবহন ব্যয় ও পরিশোধন মুনাফার কারণে পরিশোধিত পণ্যের দাম অপরিশোধিত তেলের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে।

বিশ্ব জ্বালানি বাজারে এই অস্থিরতার অন্যতম কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনে বিঘ্ন। মধ্যপ্রাচ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্ব সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ চলাচল করত।

আইইএ-এর জুলাই মাসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহে বিঘ্ন এবং আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার কারণে বিশ্ববাজারে নজিরবিহীন সরবরাহ সংকট তৈরি হয়। একপর্যায়ে বাস্তব বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১৫০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছিল।

আইইএ আরো জানিয়েছে, অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হলেও পরিশোধিত জ্বালানির রপ্তানি পুনরুদ্ধার হয়েছে অনেক ধীরগতিতে। সেপ্টেম্বর মাসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পরিশোধিত জ্বালানি ও এলপিজি রপ্তানি যুদ্ধপূর্ব পর্যায়ের অর্ধেকেরও নিচে ছিল। একই সময়ে বৈশ্বিক ডিজেল ও গ্যাসঅয়েলের সরবরাহও চাপের মধ্যে ছিল।

২ নভেম্বর রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের অবসান নিয়ে ইরান ও কাতারের কর্মকর্তাদের টানা তৃতীয় দিনের আলোচনার খবরের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কিছুটা কমেছে। তবে এই পতনকে বাজারের স্থায়ী স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার লক্ষণ হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকারে হামলা ও রপ্তানি বিঘ্নের আশঙ্কা এখনো বাজারে ঝুঁকি তৈরি করছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। অন্যদিকে, আইইএ-এর অক্টোবর প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, সরবরাহ সংকট ও কমে আসা বৈশ্বিক মজুতের কারণে ২০২৭ সালেও ডিজেল বাজারে চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্ব তেলের চাহিদাও আগের বছরের তুলনায় কমতে পারে।

সব মিলিয়ে, যুদ্ধের আগে যেখানে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭২ ডলার, সেখানে এখন তা ১১২ ডলারের কাছাকাছি। আর ডিজেলের মতো পরিশোধিত জ্বালানির বাজারে সংকট আরো প্রকট। যুদ্ধের অবসান, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাভাবিকতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ পুনরুদ্ধারের ওপর নির্ভর করছে আগামী দিনে বিশ্ব জ্বালানি বাজারের গতিপথ।

logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram