

মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, অষ্টগ্রাম (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি: বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জলমগ্ন জনপদ কিশোরগঞ্জ জেলার হাওরবেষ্টিত উপজেলা অষ্টগ্রাম। বর্ষায় জলরাশি আর শুষ্ক মৌসুমে সবুজ ধানি জমির চাদরে মোড়ানো এই জনপদ প্রকৃতির এক অপার বিস্ময়। তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি অষ্টগ্রামের বুকে শত শত বছর ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক বর্ণাঢ্য ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের অমূল্য নিদর্শন—ঐতিহাসিক কুতুব শাহী মসজিদ (যা স্থানীয়ভাবে কুতুব মসজিদ নামেও পরিচিত)।
নির্মাণকাল ও ইতিহাস
মসজিদটিতে কোনো খোদাই করা শিলালিপি না থাকায় এর সুনির্দিষ্ট নির্মাণ সন নিয়ে নিখুঁত কোনো তারিখ নথিভুক্ত পাওয়া যায় না। তবে প্রত্নতত্ত্ববিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ষোড়শ শতাব্দীতে (১৫০০ থেকে ১৫৯৯ খ্রিষ্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে) বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমলে নির্মিত হয়েছিল। সে হিসাবে ঐতিহাসিক এই মসজিদটির বয়স প্রায় সাড়েশে চারশত (৪৫০) বছরেরও বেশি।
নির্মাণশৈলী ও স্থাপত্যকলার নিদর্শন
সুলতানি আমলের স্থাপত্যরীতির এক অনন্য প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো এই কুতুব শাহী মসজিদ। এই প্রাচীন মসজিদটির গঠনশৈলীতে মুঘল আমলের আগের বাংলার স্বাধীন সুলতানি স্থাপত্যের স্পষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। মসজিদটির ওপর মোট পাঁচটি গম্বুজ সুন্দরভাবে বিন্যস্ত রয়েছে, যা দূর থেকে দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে।
এর চার কোণায় রয়েছে চারটি সুদৃশ্য অষ্টভুজাকৃতি বুরুজ বা মিনার, যা এর কাঠামোগত সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।মসজিদটির দেওয়াল বেশ চওড়া এবং এর বাইরের দিকে বিভিন্ন পোড়ামাটির ফলক বা টেরাকোটার নান্দনিক কাজের অবশিষ্টাংশ দেখতে পাওয়া যায়।
নামকরণের ইতিহাস ও পীর-আউলিয়াদের স্মৃতি
এই মসজিদের নামকরণের পেছনে রয়েছে আধ্যাত্মিক ইতিহাস। মসজিদের ঠিক পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন হযরত কুতুব শাহ নামক একজন প্রখ্যাত সাধক পুরুষ। তিনি হযরত শাহ জালাল (রহ.)-এর সঙ্গী ৩৬০ জন আউলিয়ার অন্যতম একজন হিসেবে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এই অঞ্চলে এসেছিলেন। তাঁর পবিত্র মাজারকে কেন্দ্র করেই এই মসজিদটি ‘কুতুব শাহী মসজিদ’ নামে পরিচিতি লাভ করে। যুগ যুগ ধরে দূর-দূরান্ত থেকে ধর্মপ্রাণ মানুষ ও পর্যটকরা এখানে আসেন এই সাধকের মাজার জিয়ারত করতে এবং ঐতিহাসিক মসজিদটি একনজর দেখতে।
সংরক্ষণ ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব
বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের সুলতানি আমলের টিকে থাকা প্রাচীন মসজিদগুলোর মধ্যে কুতুব শাহী মসজিদ অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবন করে ১৯০৯ সালে তৎকালীন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে নথিভুক্ত করে। পরবর্তী সময়ে এর প্রাচীন রূপ ও কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বেশ কয়েকবার সংস্কার কাজ পরিচালনা করে, যাতে শতবর্ষী এই ঐতিহ্যটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়।
বর্তমান পরিস্থিতি ও পর্যটন সম্ভাবনা
হাওরের বুক চিরে গড়ে ওঠা অলওয়েদার সড়কসহ আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ফলে বর্তমানে অষ্টগ্রামে যাতায়াত আগের চেয়ে অনেকটাই সহজ হয়েছে। ফলে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ইতিহাসপ্রেমী, গবেষক ও পর্যটকরা কুতুব শাহী মসজিদ দেখতে ছুটে আসেন। বর্ষায় যখন চতুর্দিকে পানি থৈ থৈ করে, তখন জলের মাঝে মাথা উঁচু করে থাকা এই মসজিদটিকে ভাসমান কোনো ঐতিহাসিক কেল্লার মতো দেখায়।
অষ্টগ্রামের এই ঐতিহাসিক কুতুব শাহী মসজিদ কেবল একটি ইবাদতখানাই নয়, এটি আমাদের গৌরবময় অতীত, স্থাপত্যশিল্প এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক জীবন্ত দলিল। এই অমূল্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটি যথাযথ সংরক্ষণ ও এর আশপাশের পরিবেশ উন্নত করা গেলে এটি দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে আরও পরিচিত লাভ করবে
