

মো: নাজমুল হোসেন ইমন, চট্টগ্রাম: টানা অতিভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও কর্ণফুলী নদীর জোয়ারে পানির নিচে তলিয়ে গেছে চট্টগ্রামের অধিকাংশ জায়গা। মঙ্গলবার চরম জলাবদ্ধতায় কার্যত অচল হয়ে পড়েছে শহরটি। গত ২৪ ঘণ্টায় পতেঙ্গায় ৩৮৬ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে, যা চলতি বর্ষা মৌসুমের মধ্যে সর্বোচ্চ।
নগরের পতেঙ্গা, আগ্রাবাদ, বাকলিয়া, চান্দগাঁও, মোহরা, কাতালগঞ্জ, হালিশহর, চকবাজার, বহদ্দারহাটসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় হাঁটুপানি থেকে কোথাও কোথাও কোমরসমান পানি জমে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। আগের দিন দুপুর ১২টা থেকে মঙ্গলবার বেলা ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার বৃষ্টিপাতের তথ্য প্রকাশ করে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস।
অফিসের কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম জানান, এ সময়ে পতেঙ্গায় ৩৮৬ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে নগরের আমবাগান আবহাওয়া কেন্দ্রে রেকর্ড হয়েছে ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত। আগামী শুক্রবার পর্যন্ত এ ধরনের বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে। অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস এবং নগরে জলাবদ্ধতার আশঙ্কাও রয়েছে। মঙ্গলবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে কর্ণফুলী নদীতে জোয়ার শুরু হওয়ায় নিচু এলাকাগুলোতে পানি আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ভারী বর্ষণে নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অফিসগামী মানুষ, দিনমজুর, রিকশাচালক, পথচারী, বিমানবন্দরগামী যাত্রীসহ জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। গণপরিবহনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় অনেককে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। অনেক ব্যক্তিগত গাড়িও সড়কে নামেনি।
জলাবদ্ধতার কারণে নগরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান ও অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। অনেক অভিভাবক সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাননি। বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ায় নিত্যদিনের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।
অবিরাম বর্ষণের প্রভাবে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত সংলগ্ন সড়কের একটি অংশ ধসে পড়েছে। সি-বিচ পুলিশ বক্সের বিপরীতে সড়কের প্রায় অর্ধেক অংশ ভেঙে যাওয়ায় ওই অংশ দিয়ে যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। বর্তমানে সড়কের অপর পাশ দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে সীমিত আকারে যান চলাচল করছে। স্থানীয়রা দ্রুত সড়কটি সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন।
জলাবদ্ধতার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে মঙ্গলবার সকালে নগরের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনে বের হন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুত পানি নিষ্কাশন, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামত এবং জরুরি সেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন।
নগরবাসীর অভিযোগ, প্রতিবছর বর্ষা এলেই একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রকল্প চললেও সামান্য কয়েক ঘণ্টার অতি বর্ষণেই চট্টগ্রামের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পানির নিচে চলে যাচ্ছে। ফলে নগরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টাও চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এমনকি শুক্রবার পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় ভূমিধস, নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা এবং জোয়ারের সময় পানি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়ার পাশাপাশি পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এদিকে, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত জারি থাকায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়েছে। ছয়জন সহকারী কমিশনারের (ভূমি) নেতৃত্বে একাধিক দল মাঠে কাজ করছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিতে প্রচার অব্যাহত রয়েছে।
