

প্রায় নয় বছর হতে চললেও ঢাকার সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) এখনো পুরোপুরি কার্যকর নয়। কঠিন ও তরল বর্জ্য পরিশোধনে বেশ কিছু সূচকে এই সিইটিপি পরিবেশের মানদণ্ড মানার সক্ষমতাই অর্জন করতে পারেনি। এছাড়া ছয়টি ট্যানারিকে নিজস্ব ইটিপি স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত করেছে মাত্র দুটি। ফলে ট্যানারিগুলোর বৈশ্বিক সংস্থা লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) আন্তর্জাতিক সনদ পেতে বেগ পেতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সনদ না পাওয়ার কারণে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। শিল্পনগরী ও খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
সিইটিপি কর্তৃপক্ষ ও ট্যানারি মালিকরা বলছেন, চামড়া শিল্পনগরীর সিইটিপি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত সক্ষমতা অর্জন করতে পেরেছে। তবে পরিবেশবিদরা বলছেন, এই সিইটিপি তেমন কাজেই আসছে না। কোরবানির সময় তরল বর্জ্যের লোড নিতে না পারায় ক্রোমযুক্ত পানি নদীতে যাচ্ছে। আর কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্মুক্ত হওয়ায় তা পানি, বায়ু ও নদী দূষণ করছে।
রাজধানীর হাজারীবাগের স্বাস্থ্যঝুঁকি, বুড়িগঙ্গার দূষণ রোধ ও চামড়া শিল্পের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০০৩ সালে ‘বিসিক চামড়া শিল্পনগরী, ঢাকা’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার। সাভারের হেমায়েতপুরের হরিণধরায় ধলেশ্বরী নদীর তীরে প্রায় ২০০ একর জমিতে এই ট্যানারি গড়ে তোলা হয়। ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিগুলো স্থানান্তর করে সাভারে নেওয়া হয়। ২০২১ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হলে ১৬২টি ট্যানারিকে সেখানে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চামড়া বিশ্বের অন্যতম প্রধান পরিবেশ দূষণকারী শিল্প। বিষয়টি মাথায় রেখে সাভারে চামড়া শিল্পনগরীতে ১৭ একর জমিতে সিইটিপি স্থাপন করা হয়। আর এটি করা হয় ধলেশ্বরী নদীর তীর ঘেঁষেই। তবে এই সিইটিপি নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক রয়েছে। প্রকল্পের কাজ পাওয়া চীনা প্রতিষ্ঠান নকশা অনুযায়ী কাজ করেনি এমন অভিযোগ বহু বছরের পুরোনো। পরিকল্পনা অনুযায়ী সিইটিপির যে সক্ষমতা থাকার কথা, আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থাই বাস্তবে সেই সক্ষমতা পায়নি। এমনকি এখন পর্যন্ত এই সিইটিপি তরল ও কঠিন বর্জ্য শোধনে পরিবেশের সব মানদণ্ড মানার সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। শতভাগ সক্ষমতা অর্জন করতে না পারা সিইটিপিকেই সাভার শিল্পনগরীর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবেও দেখা হয়। এর তরল ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্কও বহুদিনের।
সাভারে উৎপাদনে ১৪৭ ট্যানারি
সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে বর্তমানে সচল ট্যানারির সংখ্যা ১৪৭ থেকে ১৪৮টি। বিভিন্ন সময়ে নানা কারণে বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে ১০টি ট্যানারির। এই শিল্পনগরীতে বরাদ্দ পাওয়া চারটি ট্যানারি এখন রুগণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সচল কারখানাগুলোর মধ্যে মাত্র একটি ট্যানারি এলডব্লিউজি সনদ পেয়েছে। দেশে এই সনদ পাওয়া ট্যানারির সংখ্যা আটটি।
চামড়া শিল্পনগরীতে কঠিন ও তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নীত করতে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে কঠিন বর্জ্য থেকে উৎপাদন হচ্ছে জেলাটিন ও শিল্প প্রোটিন। চীনা একটি প্রতিষ্ঠান এ খাতে বিনিয়োগ করেছে। ধীরে ধীরে কঠিন বর্জ্য কমিয়ে আনার লক্ষ্য সরকারের। কঠিন বর্জ্য কমাতে কাঁচা চামড়ার কাটিং রপ্তানিতেও সাত প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে এই বর্জ্যের দাম বাড়ায় এখন আর তা ডাম্পিং স্টেশনে ফেলতে হচ্ছে না। তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বাড়াতেও নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সিইটিপি কর্তৃপক্ষ ও ট্যানারি মালিকরা বলছেন, চামড়া শিল্পনগরীর সিইটিপি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত সক্ষমতা অর্জন করতে পেরেছে। তবে পরিবেশবিদরা বলছেন, এই সিইটিপি তেমন কাজেই আসছে না। কোরবানির সময় তরল বর্জ্যের লোড নিতে না পারায় ক্রোমযুক্ত পানি নদীতে যাচ্ছে। আর কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্মুক্ত হওয়ায় তা পানি, বায়ু ও নদী দূষণ করছে।
নিজস্ব ইটিপি স্থাপন করেছে ২ ট্যানারি
চামড়া শিল্পনগরীর ছয়টি ট্যানারিকে নিজস্ব ইটিপি স্থাপনের অনুমতি দেয় সরকার। মূলত সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে (সিইটিপি) তরল বর্জ্যের লোড কমাতেই সরকার এ অনুমতি দেয়। অনুমতি পাওয়া দুই প্রতিষ্ঠান সদর ট্যানারি ও বে ট্যানারি নিজস্ব ইটিপি স্থাপন করেছে। অনুমতি পেলেও এখন নিজস্ব ইটিপি স্থাপন করেনি এপেক্স ট্যানারি, বেঙ্গল লেদার কমপ্লেক্স, সামিনা ট্যানারি ও আঞ্জুমান ট্রেডিং। তবে সম্প্রতি এপেক্স ও সামিনা ট্যানারি তাদের নিজস্ব ইটিপি স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা ট্যানারি এস্টেট ওয়েস্টেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. গোলাম শাহনেওয়াজ বলেন, ‘ট্যানারিগুলো নিজস্ব ইটিপি স্থাপন করলে সিইটিপির ওপর লোড কম হয়। শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিসিক অনুমতি দিয়েছে। যারা ইটিপি করেনি তারা হয়তো করবে।’
নিজস্ব ইটিপিতে ট্যানারিগুলোর অনীহার কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা নিয়মিত তাদের তাগিদ দিচ্ছি। কেউ আর্থিক সমস্যার কথা বলছে, কেউ সময় নিচ্ছে। হয়তো তাদের সামর্থ্য নেই। কারণ ইটিপি করতে বিশাল অর্থের প্রয়োজন হয়। আমরা আরও ১০-১২টি প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব ইটিপি স্থাপন করতে চিঠি দিয়েছি। আমরা তাদের বোঝানোর চেষ্টা করছি। ঋণের প্রয়োজন হলে সেটিও দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তারা তাদের যুক্তি দিচ্ছে। কিন্তু সবারই নিজস্ব ইটিপি করা উচিত।’
‘ট্যানারিগুলো নিজস্ব ইটিপি স্থাপন করলে সিইটিপির ওপর লোড কম হয়। শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিসিক অনুমতি দিয়েছে। যারা ইটিপি করেনি তারা হয়তো করবে।’—মো. গোলাম শাহনেওয়াজ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ঢাকা ট্যানারি এস্টেট ওয়েস্টেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট কোম্পানি লিমিটেড
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চেয়ারম্যান মো. শাহীন আহমেদ বলেন, ‘ফান্ডের কারণে এটি করা যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংককে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক সাড়া পাইনি। ট্যানারি মালিকরা সবাই পুঁজি সংকটে থাকায় নিজস্ব ইটিপি করা যায়নি।’
জানতে চাইলে বিটিএর সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও সালমা ট্যানারির মালিক মো. সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ‘ব্যক্তিগত ইটিপি ডিজাইনে ছিল না। সিইটিপি ডিজাইনে ছিল। পরে সিইটিপি পুরো কার্যকর না হওয়ার কারণে ছয়-সাতটি ফ্যাক্টরি আবেদন করে। ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো না থাকার কারণে অর্থ সংকটে ট্যানারিগুলো নিজস্ব ইটিপি করতে পারছে না। এজন্য সরকার তো কোনো ফান্ড দিচ্ছে না। অতিরিক্ত কোনো অর্থও বরাদ্দ নেই।’
পরিবেশের মানদণ্ড পূরণের সক্ষমতা নেই সিইটিপির
কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপি শিল্পনগরীর তরল ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করে। এরমধ্যে ট্যানারি থেকে নির্গত ক্রোমযুক্ত পানি ও সাধারণ পানি সিইটিপিতে এসে শোধন প্রক্রিয়া শেষে নদীতে নির্গত হয়। কঠিন বর্জ্যগুলো উন্মুক্ত স্থানে গড়ে তোলা ডাম্পিং ইয়ার্ড ও ডাম্পিং স্টেশনে রাখা হয়। যেখান থেকে কঠিন বর্জ্য সরাসরি নদীতে গিয়েও পড়ে। বিভিন্ন সময়ে এমন চিত্র দেখা গেছে।
‘হাজারীবাগে তো আমাদের কোনো ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টই ছিল না। সাভার শিল্পনগরীতে লিকুইড ট্রিটমেন্ট হচ্ছে, কিন্তু সেটি পরিবেশসম্মত হচ্ছে না। পরিবেশ অধিদপ্তরের মানদণ্ড ৮৫ শতাংশ পরিবেশসম্মত হচ্ছে। ১৫ শতাংশ এখনো মানদণ্ড ফুলফিল করতে পারেনি। সলিড ওয়েস্ট এখন একেবারে জিরো।’—মো. শাহীন আহমেদ, চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন
সর্বশেষ তথ্যমতে, গত আগস্টের পরিবেশের রিপোর্ট অনুযায়ী, ক্রোম, পিএইচ এবং ওয়েল অ্যান্ড গ্রিজ পরিবেশের মানদণ্ডের মধ্যে ছিল। তবে টিএসএস ও বিওডি পরিবেশের মানদণ্ড থেকে বেশি ছিল। গত আগস্টে ক্রোমিয়াম লেভেল ছিল ১ দশমিক ৪৫; মানদণ্ড অনুযায়ী সেটি থাকার কথা ২। বর্তমানে ক্রোমিয়াম লেভেল ভালো পর্যায়ে। ওয়েল অ্যান্ড গ্রিজের মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৬। স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী এটি ১০ এর ওপরে থাকলে ক্ষতিকর। অর্থাৎ এই সূচকটিতেও ট্যানারির সিইটিপির অবস্থান ভালো রয়েছে। গত আগস্টে পিএইচের মাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৪৫। এটি ৭ থেকে ৯ এর মধ্যে থাকার কথা। এই সূচকেও ভালো অবস্থানে রয়েছে ট্যানারির সিইটিপি।
তবে বিওডি, টিএসএস ও ক্লোরাইড—এই তিনটি সূচক পরিবেশের মানদণ্ডের মধ্যে নেই। গত আগস্টে বিওডির মাত্রা পাওয়া গেছে ৩০৮। এর আদর্শিক মানমাত্রা মাত্র ৩০। এই সূচকে খুবই খারাপ অবস্থানে রয়েছে সিইটিপি। একইভাবে যেখানে টিএসএসের আদর্শিক মান ১০০, সেখানে গত আগস্টে ছিল ১৬২। এই সূচকেও ভালো অবস্থানে নেই ট্যানারি। একইভাবে ক্লোরাইডের মাত্রা ২ হাজার থাকার কথা থাকলেও গত আগস্টে তা ছিল ৪ হাজার ১০০। এই সূচকেও বেশ খারাপ অবস্থানে রয়েছে সিইটিপি।
সিইটিপির সীমাবদ্ধতা
বিসিক সূত্রে জানা যায়, সিইটিপির ডিজাইন্ড ক্যাপাসিটি দৈনিক ২৫ হাজার ঘনমিটার হলেও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক এর প্রকৃত ক্ষমতা দৈনিক সর্বোচ্চ ১৪ হাজার থেকে ১৭ হাজার ঘনমিটার পাওয়া গেছে। এছাড়া সিইটিপির ডিজাইনে কারিগরি ত্রুটি ও প্রয়োজনীয় আরও কিছু মডিউলের অনুপস্থিতি রয়েছে। একইসঙ্গে সিইটিপি পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা অনুযায়ী তরল বর্জ্য পরিশোধনে সক্ষম নয়। ঈদুল আজহা পরবর্তী পিক সময়ে দৈনিক প্রায় ৪০ হাজার ঘনমিটার ইফ্লুয়েন্ট প্রবেশ করে, যা সিইটিপির ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি।
বিসিক জানায়, ট্যানারি থেকে ডিসচার্জ করা ইফ্লুয়েন্ট পরিশোধন বাবদ ব্যয় প্রতি ঘনমিটারে ৫৩ টাকা হলেও এ বাবদ ট্যানারি থেকে প্রতি ঘনমিটারে মাত্র ২৫ টাকা আদায় করা হয়। এছাড়া সিইটিপির অধিকাংশ ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল যন্ত্রপাতি যেমন ব্লোয়ার, পাম্প, মোটর ইত্যাদির আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ায় বারবার নষ্ট হচ্ছে। এছাড়া ট্যানারি শিল্প প্রতিষ্ঠানে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে প্রয়োজনের তুলনায় মাত্রাতিরিক্ত পানির ব্যবহার এবং কার্যকর প্রি-ট্রিটমেন্টের অভাব রয়েছে, যা যে কোনো উন্নত সিইটিপির জন্যও বড় সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
সাভারে বরাদ্দ পাওয়া কিছু ট্যানারির এখন আর উৎপাদনে যাওয়ার সক্ষমতা নেই। মূল উদ্যোক্তার জীবনাবসনে উত্তরাধিকার নিয়ে অনেক উত্তরসূরিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে। কিছু ট্যানারি নিয়ে মামলাও রয়েছে। বরাদ্দ না পাওয়া নতুন প্রজন্মের ট্যানারির কিছু মালিক সাভারে জায়গা বরাদ্দ নিতে আগ্রহী। কিন্তু স্থান নেই। আবার জায়গা বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে, সেখানে ট্যানারি সচল নেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিসিকের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সলিড ওয়েস্টে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে, এটি অস্বীকার করার কিছু নেই। শেড ও ডাম্পিং স্টেশনে এসপিজিএস করার কথা ছিল। কিন্তু বুয়েট সেটি অনুমোদন করেনি। ফলে বিসিক এখানে নতুন করে কিছু করতে পারেনি।’
এলডব্লিউজি সনদ পেতে বাঁধা কোথায় জানতে চাইলে বিসিকের ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এলডব্লিউজি সনদ পেতে ১৭১০ নম্বর প্রয়োজন। এর মধ্যে সিইটিপি ও সলিড ওয়েস্টে ১৫০ করে ৩০০ নম্বর। বাকি নম্বর পেতে ফ্যাক্টরিগুলোকেই কাজ করতে হয়। এর মধ্যে ট্যানারির কর্মীদের নিয়োগপত্র, শ্রম আইন, সোস্যাল কমপ্লায়েন্স, ফিডিং জোন, সেফটি, কেমিক্যাল হ্যাজার্ড ড্রেস, ইএমএস সার্টিফিকেট ও এনার্জি ম্যানেজম্যান্ট সিস্টেম থাকতে হয়। দেশের অধিকাংশ ট্যানারিতে এসব করা হয় না। আর সিইটিপি ও সলিড ওয়েস্টেজ ব্যবস্থাও দেশে এই সনদ পাওয়ার মতো গড়ে ওঠেনি।’
যা বলছে সিইটিপি কর্তৃপক্ষ
সিইটিপি কর্তৃপক্ষ বলছে, বর্তমানে তরল ও কঠিন উভয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আগের চেয়ে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। কঠিন বর্জ্যের মধ্যে বেশ কিছু বর্জ্য ব্যবহার উপযোগী করা হয়েছে। বাংলাদেশ জেডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন কোং নামের চীনা একটি প্রতিষ্ঠান উচ্ছিষ্ট কঠিন বর্জ্য রি-সাইকেল করে শতভাগ রপ্তানিমুখী পণ্য জেলাটিন ও প্রোটিন পাউডার উৎপাদন করবে। প্রতিষ্ঠানটি এরইমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদন শুরু করেছে। ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানটির পুরোদমে উৎপাদনে যাওয়ার কথা রয়েছে। এ শিল্পনগরী থেকে প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত তিন হাজার টন ক্রম সেভিং ডাস্ট নিয়েও গেছে। এছাড়া বর্তমানে কাঁচা চামড়ার টুকরো থেকে গ্লু জেলাটিন উৎপাদন ও এর ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় দামও বেড়েছে। এভাবে কঠিন বর্জ্য কমে আসছে।
এক প্রশ্নের উত্তরে ঢাকা ট্যানারি এস্টেট ওয়েস্টেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. গোলাম শাহনেওয়াজ বলেন, ‘ধলেশ্বরীতে শতভাগ কালোপানি বা দূষিত পানি যাচ্ছে, এই কথাটি আমি মানতে পারবো না। এখানে ওয়েল অ্যান্ড গ্রিস পরিবেশের মানদণ্ড অনুযায়ী আছে। আগস্টে আমরা ক্রোমিয়াম লেভেল ১ দশমিক ৪৫ পেয়েছি। পিএইচ লেভেল ঠিক আছে। দু-তিনটি লেভেল ঠিক নেই। সেটি ঠিক করার জন্য আপগ্রেডেশনের প্রয়োজন রয়েছে।’
সিইটিপি নিয়ে যা বলছেন ট্যানারির মালিক ও নেতারা
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চেয়ারম্যান মো. শাহীন আহমেদ বলেন, ‘হাজারীবাগে তো আমাদের কোনো ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টই ছিল না। সাভার শিল্পনগরীতে লিকুইড ট্রিটমেন্ট হচ্ছে, কিন্তু সেটি পরিবেশসম্মত হচ্ছে না। পরিবেশ অধিদপ্তরের মানদণ্ড ৮৫ শতাংশ পরিবেশসম্মত হচ্ছে। ১৫ শতাংশ এখনো মানদণ্ড ফুলফিল করতে পারেনি। সলিড ওয়েস্ট এখন একেবারে জিরো।’
সিইটিপি কতটা কার্যকর জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সিইটিপির ক্ষেত্রে আমাদের কোনো দায় নেই। এটি বিসিক করেছে। আমরা ট্রিটমেন্টের খরচ দিচ্ছি। এটিকে প্রপার ট্রিটমেন্ট করা না করা বিসিকের দায়িত্ব। সিইটিপিতে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত ট্রিটমেন্ট হচ্ছে।’
বিটিএর সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও সালমা ট্যানারির মালিক মো. সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ‘সিইটিপি কার্যকর। কিন্তু সিইটিপির প্যারামিটারগুলোর মধ্যে দু-একটি পরিবেশ অধিদপ্তরের মানদণ্ড অনুযায়ী সঠিক মাত্রায় নেই। ক্লোরাইড, বিওডি ও ক্রোমের প্যারামিটার ঠিক নেই। অন্য প্যারামিটারগুলো পরিবেশের মানদণ্ড অনুযায়ী রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখানে ট্যানারিগুলোর কোনো দোষ নেই। ট্যানারির পানি ট্রিটমেন্ট হয়েই নদীতে যাচ্ছে। ট্রিটমেন্ট ছাড়া কোনো পানি নদীতে যায় না। ফ্লেশিংয়ের স্ল্যাসগুলোও নদীর পাড়ে এখন আর রাখা হয় না। এগুলো এখন ডাম্পিংয়ে রাখা হয়। যেগুলো মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর, সেগুলো নদীর পাড়ে রাখা হয় না। আগের মতো খোলামেলা স্থানে রাখা হয় না।’
এমডির ভাষ্যে সিইটিপির পুরো কার্যক্রম
সিইটিপির পুরো কার্যক্রমের ব্যাখ্যা দিয়ে ঢাকা ট্যানারি এস্টেট ওয়েস্টেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট কোম্পানি লিমিটেডের এমডি মো. গোলাম শাহনেওয়াজ বলেন, ‘সিইটিপিতে ১০০ এর বেশি টক্সিক কেমিক্যাল ইউজ করা হয়। এই কেমিক্যালগুলো যদি পরিপূর্ণভাবে চামড়ার মধ্যে পেনিটেড হয় এবং হাইকোর্টের চারটি রুলসের একটি হচ্ছে দুটি লাইন দিয়ে কেমিক্যালগুলো ডিসচার্জ করতে হবে। আরেকটি হচ্ছে ক্রমের লাইন, অপরটি হচ্ছে জেনারেল পানির লাইন। তারপরে স্ক্রিনিং রয়েছে, সেনিমেনটেশন ও রিসলডিং। কেমিক্যাল যদি পরিপূর্ণভাবে পেনিটেশন হয় এবং হাইকোর্টের চারটি রুলস মানা হয়, তাহলে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পিউরিফাই হয়ে যায়। আমি বলবো না, মালিকরা তা করছেন না।’
ব্যাখ্যা দিয়ে এমডি আরও বলেন, ‘আসলে চীনারা যখন কাজ করেছে, তখন ক্যাপাসিটি ২৫ হাজার ঘনমিটার তারা বলেছে, কিন্তু বাস্তবতায় ১৪ থেকে ১৮ হাজার ঘনমিটারের মধ্যে আপডাউন করে। ২০ হাজারের নিচে অফ পিক টাইমে কাভার করা যায়। কিন্তু কোরবানির সময় পিক আওয়ারে ৪০ হাজারের ওপরে উঠে যায়। সেজন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে কথা বলে এক্সেক্ট ক্যাপাসিটি কত দরকার সেটি বের করে দেওয়ার জন্য ফুল ড্রয়িং অ্যাসেসমেন্ট করে দিতে অনুরোধ করেছি। ইতালির কোম্পানি ইটাল প্রগতি এই কাজটি পেয়েছে। গত মার্চ থেকে তারা কাজ শুরু করেছে। তাদের অ্যাসেসমেন্ট হয়ে গেলে এর ক্যাপাসিটি বাড়াতে কী করতে হবে তার দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে। পরবর্তী কাজগুলো তাদের সাজেশন অনুযায়ী ইউরোপীয় স্ট্যান্ডার্ডে উন্নীত করতে পারবো।’
কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থা নিয়ে সিইটিপির এমডি বলেন, ‘বছরে আমাদের ৮০ থেকে ৯০ হাজার সলিড ওয়েস্ট জেনারেট হয়। সেটি ছয় একরের ওপেন ডাম্পিং ইয়ার্ডে ফেলা হয়। দুবছর ধরে কিছু সলিড ওয়েস্ট ব্যবহারের জন্য খুবই বাস্তবমুখী উদ্যোগ নিয়েছি। ক্রম সেভিং ডাস্ট সাত হাজার মেট্রিক টনের মতো জেনারেট হয়, আমরা নবীনগরে নয় একর জায়গার ওপরে চীনা কোম্পানির সঙ্গে কথা বলে প্রকল্প তৈরি করতে উদ্বুদ্ধ করেছি। তারা ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে প্রকল্প করেছে। ক্রম সেভিং ডাস্ট থেকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোটিন পাউডার ট্রায়াল বেসিসে তারা প্রোডাকশন শুরু করেছে। ফেব্রুয়ারি থেকে তারা ফুল প্রোডাকশনে যাবে। এ পর্যন্ত তারা তিন হাজার টন ক্রম সেভিং ডাস্ট নিয়েও গেছে। চীন, ইন্দোনেশিয়া ও রাশিয়ায় তারা রপ্তানি করবে।’
‘প্রতি বছর ১৬ হাজার মেট্রিক টন কাঁচা চামড়ার টুকরো উৎপাদন হয়। এক সময় দু-তিন টাকা কেজিতে বিক্রি হতো। ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দেওয়ায় এখন দাম ১২ থেকে ১৩ টাকা। এটি থেকে তারা গ্লু জেলাটিন তৈরি করছে। জেলাটিন থেকে ক্যাপসুলের কাভার তৈরি হয়। জেডব্লিউ প্রোটিন কোম্পানি একই জায়গায় এই কাজটিও করেছে। সবমিলিয়ে ২৪ হাজার টন কঠিন বর্জ্য ব্যবহার উপযোগী করা গেছে। এরপরে যে ফ্লেশিং থাকবে, দুটি ওপেন ডাম্পিং স্টেশনে পুকুরে তা ফেলা হচ্ছে। কিন্তু এখান থেকেও রিসাইকেল প্রজেক্ট করা সম্ভব। চীনের বিভিন্ন বিনিয়োগকারীর সঙ্গে কথা চলছে। যদি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কঠিন বর্জ্য ব্যবহার উপযোগী হয়ে যাবে।’—বলছিলেন সিইটিপির এমডি।
সুত্র: জাগো নিউজ
