ঢাকা
logo
প্রকাশিত : January 24, 2026

চাপ বাড়বে বেসরকারি খাতে নতুন বেতন স্কেলের সুপারিশ

দেশের বেসরকারি খাত বর্তমানে সংকটকাল অতিক্রম করছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকাকেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। এ কারণে নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়াই অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য দ্বিগুণের বেশি হারে প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হলে সমাজে আয় বৈষম্য আরও বাড়তে পারে। বাজারে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে, যাতে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির ধকল সইতে না পারা সাধারণ মানুষের কষ্ট আরও বাড়বে। এর ফলে বেসরকারি খাতের কর্মীদের একটি বড় অংশ নতুন করে চাপে পড়বে।

দুই-তিন বছর ধরে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের মানুষের ধারদেনা করে সংসার চালাতে হচ্ছে কিংবা খাবার, কাপড়চোপড়, যাতায়াতসহ বিভিন্ন খাতে কাটছাঁট করতে হচ্ছে। কারণ, মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধি বা আয় বৃদ্ধি কম হলে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ে। প্রকৃত আয় কমে যায়। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই সরকারি চাকুরেদের এক লাফে দ্বিগুণের বেশি বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব এসেছে জাতীয় বেতন কমিশন থেকে। এতে রাজস্ব আহরণে ধুকতে থাকা সরকারকে এক অর্থবছরে ব্যয় করতে হবে অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা।

জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। এনবিআরও তেল, আলু, পেঁয়াজ, ডিমসহ বেশ কিছু নিত্যপণ্যে শুল্ক-কর কমিয়ে দেয়। বাজারে নিত্যপণ্যের আমদানিপ্রবাহ ঠিক রাখার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তার প্রভাব মিলছে না। মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বগতিতেই চলছে। গত ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অক্টোবর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ। নভেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে। ডিসেম্বরে আরও শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ বেড়ে মূল্যস্ফীতি উঠে যায় ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে। খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি এখনও ৯ দশমিক ১০ শতাংশের ঘরে।

বর্তমানে সরকারের নিজস্ব আয়ের বড় অংশই পরিচালনে ব্যয় হচ্ছে। অন্যদিকে, উন্নয়ন কার্যক্রমের উল্লেখযোগ্য অংশ বাস্তবায়িত হচ্ছে ঋণনির্ভর অর্থায়নের মাধ্যমে। এ অবস্থায় পরিচালন ব্যয়ের আওতায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও পেনশন খাতে প্রস্তাবিত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় বাড়লে অর্থের জোগান কোথা থেকে আসবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। চলতি বাজেটে এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। ফলে সরকার নতুন করে ঋণ নিয়ে বেতন-ভাতার ব্যয় নির্বাহ করবে- এ প্রশ্নও উঠছে।

বেসরকারি খাত-সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদন কমানো বা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ফলে শিল্প সম্প্রসারণ স্থবির হয়ে পড়ছে। বিনিয়োগ না বাড়ায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হচ্ছে না। পাশাপাশি উচ্চ সুদহার, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও আমদানি ব্যয়ের চাপ বেসরকারি খাতের সংকটকে আরও গভীর করছে। সার্বিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত এখন স্পষ্ট চাপের মুখে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে মানুষ। অন্যদিকে রাজস্ব বাড়াতে গিয়ে যদি অযৌক্তিকভাবে ভ্যাটের মতো পরোক্ষ কর বাড়ানো হয়, তাহলে তার প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে। এ ছাড়া ঋণ করে নিয়মিত বেতন-ভাতা ও পেনশনের মতো ব্যয় মেটানো কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত হবে না। এতে রাজস্ব ও ঋণের চাপ আরও বাড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ কার্যকর হলে বেসরকারি খাতেও বেতন বাড়ানোর চাপ সৃষ্টি হবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতে বেতন বাড়ানো অত্যন্ত কঠিন। তবুও সরকারি বেতন বাড়লে বাজারে এর প্রভাব পড়বে, যা সমাজে বৈষম্য বাড়িয়ে বিশৃঙ্খলার পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন জানান, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই বেসরকারি খাতে বেতন বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাত সেই চাপ নিতে পারবে কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এদিকে অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বেতন কমিশনের প্রস্তাবিত সুপারিশ নিয়ে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যয় ব্যবস্থাপনা বিভাগ এই সুপারিশের বিস্তারিত মূল্যায়নের দায়িত্ব পালন করবে। এর আগে অর্থ বিভাগ থেকে প্রস্তাবিত সুপারিশগুলো মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে গঠিত বিশেষ সচিব কমিটির কাছে পাঠানো হবে। এই বিশেষ কমিটি প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করে মতামত ও অনুমোদন প্রদান করবে। অনুমোদনের পর সুপারিশগুলো আবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠানো হবে।

সূত্র জানায়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যয় ব্যবস্থাপনা বিভাগ এই পর্যায়ে প্রস্তাবিত সুপারিশের ওপর ‘কাঁচি চালানোর’ সুযোগ পাবে। অর্থাৎ, পে ফিক্সেশন, ভাতা, আনুতোষিক, টিএ-ডিএসহ যাবতীয় আর্থিক বিষয় এখানে পুনর্নির্ধারণ ও সমন্বয় করা হবে। এই পর্যায়ে বাস্তবায়নের আর্থিক চাপ,

সরকারি ব্যয়ের সামর্থ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সবকিছু চূড়ান্ত হলে অর্থ সচিবের অনুমোদন সাপেক্ষে প্রস্তাবগুলো পাঠানো হবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো উপদেষ্টা পরিষদের সভায় উপস্থাপন করবে। উপদেষ্টা পরিষদ চাইলে প্রস্তাবিত বেতন কমাতে বা বাড়াতে পারবে। অর্থাৎ, এই পর্যায়ে বেতন কমিশনের সুপারিশ চূড়ান্ত রূপ পাবে না, বরং এখানেও সংশোধনের সুযোগ থাকবে।

উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদন পাওয়ার পর সরকার আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করবে। প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমেই নতুন পে-কমিশন কার্যকর হবে এবং সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়িত হবে।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. মো: জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram