

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলা সৌদি আরব পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়লে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় মক্কা প্রতিরক্ষা জোট কার্যকর হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ।
মঙ্গলবার সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি শহর ও তেল স্থাপনায় হুতিদের হামলায় ৭০ জনের বেশি মানুষ আহত হওয়ার পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এ মন্তব্য এলো। হামলায় কয়েকটি তেল স্থাপনায় আগুন ধরে যায় বলেও জানা গেছে।
মঙ্গলবার রাতে জিও নিউজের ‘আজ শাহজেব খনজাদা কে সাথ’ অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে খাজা আসিফ বলেন, ইয়েমেনে চলমান সংঘাতের ‘ছড়িয়ে পড়া প্রভাব’ সৌদি আরবে পৌঁছালে প্রতিরক্ষা জোটের শর্ত অনুযায়ী সদস্য দেশগুলোকে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে।
তিনি বলেন, “এটি একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। কোনও সদস্য দেশের বিরুদ্ধে বিনা উসকানিতে আগ্রাসন হলে কিংবা ইয়েমেনে যা ঘটছে তার প্রভাব সৌদি আরবে ছড়িয়ে পড়লে এই চুক্তি অবশ্যই কার্যকর হবে। এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ থাকা উচিত নয়।”
খাজা আসিফ আরও বলেন, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক একে অপরের নিরাপত্তার বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ। প্রয়োজন হলে পাকিস্তান সেই অঙ্গীকার পূরণ করবে।
তিনি বলেন, “আমরা এই চুক্তির শর্ত ও বিধানের দ্বারা আবদ্ধ। প্রয়োজন দেখা দিলে আমরা তা মেনে চলব।”
এক সদস্যের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা
গত ৭ আগস্ট পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিটির মূল লক্ষ্য হলো তিন দেশের যৌথ প্রতিরোধক্ষমতা শক্তিশালী করা এবং যেকোনও সদস্য দেশের ওপর হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা।
সাক্ষাৎকারে হুতি হামলার পর সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনও যোগাযোগ হয়েছে কি না জানতে চাইলে খাজা আসিফ বলেন, এ বিষয়ে তিনি কোনও যোগাযোগের কথা জানেন না। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে আগ্রাসনের ঘটনা ঘটলে পাকিস্তান প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য।
তার ভাষায়, “পাকিস্তান এই চুক্তির অধীনে প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য, কারণ এটি যৌথ প্রতিরক্ষা ও আগ্রাসনের ক্ষেত্রে সম্মিলিত সহায়তার জন্য করা হয়েছে।”
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, জোটটি কোনওভাবেই আগ্রাসী উদ্দেশ্যে গঠিত হয়নি। কোনও সদস্য দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন হলে তিন দেশ সম্মিলিতভাবে তার জবাব দেবে।
আসিফ বলেন, “এটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি। তবে এটি দ্বিপক্ষীয় হলেও আমরা প্রতিক্রিয়া জানাতাম।”
হুতিদের সতর্ক করলেন আসিফ
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, ইয়েমেনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং উত্তেজনা ধীরে ধীরে কমে যাবে। একই সঙ্গে তিনি হুতিদের সতর্ক করে বলেন, নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে অন্য দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের আগ্রাসন মোকাবিলার ধারা কার্যকর হতে পারে।
তিনি বলেন, হুতিদের বিষয়টি মাথায় রাখা উচিত। আসিফ আরও বলেন, হুতিরা একটি অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী, আর ইয়েমেন সরকার তাদের হামলার জবাব দিয়েছে।
ইরানের প্রতি মুসলিম বিশ্বের সহানুভূতি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তবে কোনও দ্বিপক্ষীয় বিরোধকে অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে কাজে লাগানোর চেষ্টা তাদের জন্যই বিপজ্জনক হতে পারে।
২০১৪ সাল থেকেই ইয়েমেনে সংঘাত
খাজা আসিফ বলেন, ইয়েমেনে সংঘাত ২০১৪ সাল থেকে চলে আসছে। ওই সময় প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে তিনি নিজে ইয়েমেন সফর করেছিলেন বলেও উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, সে সময়ও পাকিস্তান সৌদি আরবকে সহায়তা করেছিল। সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং দেশটির ভূখণ্ডের ‘পবিত্রতা’ ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সংকটের সময়ে পাকিস্তান সৌদির পাশে থাকবে।
আসিফ বলেন, “যখনই কঠিন সময় আসে, আমাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কারণে আমরা তাদের সহায়তা করি।”
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় এখনও আশা দেখছেন আসিফ
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা অচলাবস্থায় পৌঁছালেও সব পথ এখনও বন্ধ হয়ে যায়নি বলে মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী।
তিনি বলেন, আলোচনা স্থবির হয়ে আছে, তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। দুই পক্ষের মধ্যে পরোক্ষ যোগাযোগ এখনও রয়েছে বলেও জানান তিনি।
আসিফ বলেন, “আমি আশা ছাড়তে চাই না যে প্রক্রিয়াটি শেষ হয়ে গেছে কিংবা সব দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। অচলাবস্থা রয়েছে, তবে পরিস্থিতি তার চেয়ে ভালো।”
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের বিষয়ে পাকিস্তান অত্যন্ত কঠিন ভারসাম্যের মধ্যে রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। দুই পক্ষের সঙ্গেই পাকিস্তানের ‘ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক’ থাকায় ইসলামাবাদকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ইসরায়েল সংঘাত দীর্ঘায়িত করতে চাইছে
খাজা আসিফ অভিযোগ করেন, ইসরায়েল চায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হোক এবং উপসাগরীয় দেশগুলো অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ুক।
তিনি বলেন, যুদ্ধের জন্য ইসরায়েলকে সরাসরি বড় ধরনের অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হচ্ছে না; বরং বিদেশ থেকে এর অর্থায়ন করা হচ্ছে। এমনকি ইসরায়েল চলমান সংঘাত থেকে লাভবান হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গাজা, পশ্চিম তীর ও লেবাননের মানুষ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষার মূল্য দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী।
তবে তিনি আন্তর্জাতিক জনমতে পরিবর্তনের একটি ইতিবাচক দিকও দেখতে পাচ্ছেন বলে জানান। তার দাবি, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, নিউজিল্যান্ড ও লাতিন আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষের মতামতে বড় পরিবর্তন এসেছে এবং অনেকেই ইসরায়েলপন্থী রাজনৈতিক প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছেন।
সৌদিতে হুতিদের বড় হামলা
মঙ্গলবার হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের আভা, খামিস মুশাইত, জাজান ও নাজরান শহরে হামলার দাবি করে। তাদের দাবি, কয়েক ডজন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল আভা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, কিং খালিদ বিমানঘাঁটি এবং সৌদি রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর কয়েকটি স্থাপনা।
হামলায় ৭০ জনের বেশি মানুষ আহত হন এবং কয়েকটি তেল স্থাপনায় আগুন ধরে যায় বলে জানা গেছে।
এর জবাবে সৌদি আরব ইয়েমেনের তাইজ ও মারিব প্রদেশ এবং রাজধানী সানার পূর্বে অবস্থিত জুবাহ এলাকায় হামলা চালায়। হামলার পর সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ হুতিদের হামলার নিন্দা জানিয়ে সৌদি আরবের প্রতি পাকিস্তানের ‘অটল সংহতি’র কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, এ ধরনের কাপুরুষোচিত হামলা নিরীহ মানুষের জীবন এবং আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও হামলাকে ‘নিন্দনীয়’ আখ্যা দিয়ে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
হুতি হামলার পর খাজা আসিফের এই বক্তব্যে মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের সামরিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হতে পারে, তা নিয়ে আঞ্চলিক পর্যায়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী একই সঙ্গে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার পরিবর্তে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। সূত্র: ডন নিউজ
