ঢাকা
৮ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
রাত ৯:৩৩
logo
প্রকাশিত : জুলাই ৮, ২০২৬

এফ-৩৫ বিক্রিতে ট্রাম্পের সমর্থনে শক্ত অবস্থানে তুরস্ক, প্রভাব কমছে ইসরাইলের

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন, ন্যাটো সম্মেলনে সক্রিয় ভূমিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক পরিবর্তনের ফলে তুরস্কের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

অন্যদিকে, গাজা যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংকট ঘিরে দখলদার ইসরাইলের অবস্থান আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়েছে বলেও মূল্যায়ন করা হচ্ছে। বিশেষ করে তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির সম্ভাবনা নিয়ে ওয়াশিংটনের ইতিবাচক অবস্থান দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

ন্যাটোর বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিতে ট্রাম্পের আঙ্কারা সফরের পরিকল্পনার মধ্যেই নতুন করে সামনে আসে তুরস্ককে এফ-৩৫ কর্মসূচিতে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ফোন করে তুরস্কের কাছে যুদ্ধবিমানের ইঞ্জিন বিক্রি না করা এবং দেশটিকে এফ-৩৫ কর্মসূচিতে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত না করার আহ্বান জানান।

সোমবার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু তুরস্ককে ‘মুসলিম ব্রাদারহুডের আদর্শে প্রভাবিত একটি শাসনব্যবস্থা’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, এটি এমন একটি চরমপন্থী আন্দোলন, ‘যা আমেরিকাকে ঘৃণা করে এবং ‘আমেরিকার মৃত্যু হোক’ স্লোগানও দেয়।

শুধু নেতানিয়াহুই নন, ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সারও তুরস্কের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক আক্রমণ জোরদার করেন। তিনি তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে গণহত্যায় উসকানির অভিযোগ তোলেন। এর আগে তুরস্কের পক্ষ থেকে ইসরাইলকে মানবজাতির জন্য একটি বোঝা এবং বিশ্বের জন্য একটি সমস্যা বলে মন্তব্য করা হয়েছিল। এসব বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির আরেকটি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।

তবে ইসরাইলের আপত্তি সত্ত্বেও ট্রাম্পের অবস্থান ভিন্ন। আঙ্কারায় প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে যৌথ উপস্থিতিতে তিনি বলেন, তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ বিক্রির বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অনেক দেশের তুলনায় বেশি বিশ্বস্ত ছিল। এই বক্তব্যকে তুরস্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজেও ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান আয়োজক না হলে তিনি ন্যাটো সম্মেলনে অংশ নিতেন না। ট্রাম্প বলেন, অন্য কারো জন্য আমি হয়তো আসতাম না। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের প্রতি সম্মান জানাতেই আমি আসছি।

আঞ্চলিক পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক ইসরায়েলি গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিতভিমের সভাপতি নিমরোদ গোরেন বলেন, ন্যাটো সম্মেলনের আয়োজন শুধু প্রতীকী নয় বরং এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুরস্কের বাড়তে থাকা গুরুত্বেরও প্রতিফলন। তার মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আঙ্কারা ধীরে ধীরে নিজেদের হারানো কূটনৈতিক অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।

আরব বসন্তের পর প্রায় এক দশক ধরে তুরস্ক এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেছিল, যা দেশটিকে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক মিত্রের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। মুসলিম ব্রাদারহুডকে সমর্থন, পূর্ব ভূমধ্যসাগরে গ্যাস অনুসন্ধান নিয়ে বিরোধ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে উত্তেজনা এবং মানবাধিকার ইস্যুতে সমালোচনার কারণে তুরস্ক কূটনৈতিকভাবে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

ইউরোপের সঙ্গেও আঙ্কারার সম্পর্ক ক্রমেই অবনতির দিকে যায়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর একটি কার্টুন প্রদর্শনকারী এক শিক্ষককে শিরশ্ছেদের ঘটনায় নিন্দা জানানোর পর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর ‘মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন’ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন এরদোয়ান। এতে ফ্রান্স এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

কিন্তু অর্থনৈতিক চাপ, কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক বাস্তবতার কারণে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ধীরে ধীরে নীতি পরিবর্তনের পথে হাঁটেন। মিসরের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা, সৌদি আরবের সঙ্গে বিরোধ মিটিয়ে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে তুরস্ক আবারও কূটনৈতিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে।

ইসরাইলের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্কও একইভাবে ওঠানামার মধ্য দিয়ে গেছে। ২০১৮ সালে গাজা সীমান্তে ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার ঘটনায় তুরস্ক রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নেয়। পরে দুই দেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক করলেও ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর সেই সম্পর্ক আবারও ভেঙে পড়ে। তুরস্ক ইসরাইলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ তোলে, বাণিজ্য স্থগিত করে এবং ইসরাইলি উড়োজাহাজের জন্য নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়।

এ অবস্থার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক বরং আরও শক্তিশালী হয়েছে। ট্রাম্প প্রকাশ্যে এরদোয়ানকে একজন দক্ষ ও নির্ভরযোগ্য নেতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এমনকি সিরিয়ার পরিস্থিতি নিয়েও তার প্রশংসা করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে তুরস্ককে একটি কার্যকর অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে।

গাজা যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে তুরস্ক নিজেকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করেছে। হামাসের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে আঙ্কারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন। ট্রাম্প-সমর্থিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির আলোচনায় হামাসের নেতাদের রাজি করাতে তুরস্কের শীর্ষ নেতৃত্ব সরাসরি কাজ করেছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন কূটনীতিক টম ব্যারাক।

২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধও তুরস্কের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও আঙ্কারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। যুদ্ধবিরতির আলোচনায় পাকিস্তান, সৌদি আরব ও মিসরের পাশাপাশি তুরস্কও সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।

একই সময়ে ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপের কাছেও তুরস্কের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পর ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী তুরস্কের। রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছে তুরস্কের সামরিক সক্ষমতা এবং প্রতিরক্ষা শিল্প গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ন্যাটো সম্মেলনের পাশাপাশি বৃহৎ প্রতিরক্ষা প্রদর্শনী আয়োজনও আঙ্কারার আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে ইসরাইলের আঞ্চলিক অবস্থান তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়েছে। ইরান যুদ্ধ-পরবর্তী সমঝোতা এবং বিভিন্ন কূটনৈতিক আলোচনায় ইসরাইলকে অনেক ক্ষেত্রে বাইরে রাখা হয়েছে। প্রতিবেশী মিসর ও জর্ডানের সঙ্গে সম্পর্কও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। নতুন কোনো আরব রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনাও আপাতত সীমিত।

তবে সব ক্ষেত্রেই যে তুরস্ক এগিয়ে রয়েছে, তা নয়। গাজা যুদ্ধবিরতি তদারকির আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় তুরস্ককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ভবিষ্যতে সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা বাহিনীতেও দেশটির অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত রয়েছে। এছাড়া লেবানন-ইসরাইল শান্তি প্রক্রিয়াতেও তুরস্ক প্রত্যাশিত ভূমিকা পায়নি।

এর পরও দুই দেশের মধ্যে গোয়েন্দা সমন্বয় এবং সিরিয়াকে ঘিরে নিরাপত্তা যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে আনুষ্ঠানিক উত্তেজনার মধ্যেও যোগাযোগের বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক পথ খোলা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

সব মিলিয়ে বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় তুরস্ক নিজেকে মধ্যপ্রাচ্য ও ন্যাটো জোটের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে গাজা যুদ্ধ, আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার কারণে ইসরাইল আগের তুলনায় বেশি চাপের মুখে রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিতে তুরস্ক এখন স্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী অংশীদার, আর ইসরাইলকে অনেক ক্ষেত্রেই আঞ্চলিক উত্তেজনার একটি উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতা আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্যে নতুন প্রভাব ফেলতে পারে।

সূত্র: টাইমস অব ইসরাইল

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram