

‘পাসপোর্ট একটি ট্রাভেল ডকুমেন্ট মাত্র, নাগরিকত্বের চূড়ান্ত আইনী প্রমাণ নয়’ বুধবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এমন ঘোষণায় রীতিমত তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের রাজনীতিবিদে থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সবারই প্রশ্ন, পাসপোর্ট যদি নাগরিকত্ব প্রতিষ্ঠা নাই করে, তাহলে কিসে করবে? ভারতের ১৬টি রাজ্যে ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যেই পাসপোর্ট নিয়ে নতুন বিতর্ক সামনে এলো।
শিবসেনা নেতা আদিত্য ঠাকরে সরকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলে জানতে চেয়েছেন, ‘পাসপোর্ট যদি নাগরিকত্বের নথি না-হয়, তবে এটি দেওয়ার আগে পুলিশ আবেদনকারীর ঠিকানা খতিয়ে দেখে কেন?’
তিনি বলেন, ‘এত কিছু যাচাইয়ের পর দেওয়া পাসপোর্টই যদি প্রশ্নের মুখে পড়ে, তাহলে আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতীয়দের অবস্থান ও পাসপোর্টের মর্যাদা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করবে।’
বিশিষ্ট চিত্রনাট্যকার ও গীতিকার জাভেদ আখতার ‘এক্স’(সাবেক টুটার)-এ লিখেছেন, ‘তাহলে কি ধরে নিতে হবে, সরকার এমন লোকদেরও পাসপোর্ট দিয়েছে বা দিচ্ছে, যারা নাগরিক নন? কিংবা যাদের নাগরিকত্ব নিয়ে সরকার নিশ্চিত নয়?’
বর্ষীয়ান আইনজীবী কপিল সিব্বল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, ‘তা হলে কোন নথি দেখালে নাগরিক হিসাবে নিজেকে প্রমাণ করতে পারব? এর পর আমার নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। আমি ভোটাধিকার হারাতে পারি। এর ফলে বিজেপি নির্বাচনে জিতে যাবে।
’ তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রের সমালোচনা আরো তীব্র,‘এটাই মনে হচ্ছে যে, নাগরিকত্ব প্রমাণের উপায় হচ্ছে হিন্দু এবং বিজেপির ভোটার হতে হবে।’
কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুর এক্স-এ এক পোস্টে লিখেছেন, ‘পাসপোর্ট নিয়ে সরকারের ঘোষণা জনসাধারণের মধ্যে একটি অনুমানযোগ্য বিভ্রান্তি এবং রাজনৈতিক বিতর্কের ঢেউ তুলেছে।’
বিতর্ক সৃষ্টির পর কেন্দ্রীয় সরকারের একটি সূত্র ভারতের ১৯৬৭ সালের পাসপোর্ট আইনের ২০ নম্বর অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, ‘পাসপোর্ট যে নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়, তা গতকাল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এমনকি নরেন্দ্র মোদি সরকারের গত ১২ বছরেও এটি ঠিক করা হয়নি।
পাসপোর্ট কখনই নাগরিকত্বের প্রমাণ ছিল না।’ পাসপোর্ট আইনের ২০ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জনস্বার্থে ভারতের নাগরিক নন, এমন ব্যক্তিকেও পাসপোর্ট বা ট্রাভেল ডকুমেন্ট দেওয়া হতে পারে। তবে সরকারের এ ব্যাখ্যায়ও সন্তুষ্ট নন শশী থারুর, ‘এটি একটি অর্থহীন পার্থক্য, যা সাধারণ নাগরিকের কাছে নিরর্থক।’
তিনি বলেন, ‘কয়েক দশক ধরে পাসপোর্টকে পরিচয়ের সেরা প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। আমরা একটি পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং নথিপত্র যাচাইকরণের কঠিন আমলাতান্ত্রিক গোলকধাঁধা পার করি, ঠিক এই কারণেই যে রাষ্ট্র এটি দেওয়ার আগে নাগরিকত্বের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দাবি করে।
এখন ঘুরে গিয়ে এটি ঘোষণা করা যে, এই কঠোর যাচাই-বাছাই থেকে তৈরি হওয়া নথিটি আসলে নাগরিকত্ব প্রমাণ করে না—একটি অদ্ভুত আইনি অমিল তৈরি করে।’
‘পাসপোর্ট যদি নাগরিকত্ব প্রতিষ্ঠা নাই করে, তবে কিসে করবে’ প্রশ্ন রাখেন থারুর। তিনি আইনি কাঠামো সংশোধন করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, যেন পাসপোর্ট এবং আধার কার্ড উভয়কেই ভারতীয় নাগরিকত্বের বৈধ ও চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা হয়, যতক্ষণ না সেগুলো রাষ্ট্র দ্বারা স্পষ্টভাবে বাতিল বা প্রত্যাহার করা হচ্ছে।
