

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (২০১৯-২০২১) রবার্ট সি. ও’ব্রায়েন বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদের পররাষ্ট্রনীতি ‘শক্তির মাধ্যমে শান্তি’ কৌশলে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্ব পুনরুদ্ধার করছেন। চলতি সংখ্যা ফরেন অ্যাফেয়ার্স-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে তিনি লিখেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি, কূটনৈতিক দৃঢ়তা এবং অর্থনৈতিক চাপের নীতি বিশ্বের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনছে ও প্রতিপক্ষদের নিরুৎসাহিত করছে।
ও’ব্রায়েনের মতে, ডেমোক্র্যাট প্রশাসনের ১২ বছরের “নিয়ন্ত্রিত পতন (মেনেইজড ডিক্লাইন)” নীতির পর ২০২৪ সালের নির্বাচনে আমেরিকান জনগণ ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতিকে বেছে নিয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বার দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তিকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন, যেখানে অতিরিক্ত ১৫০ বিলিয়ন ডলার প্রতিরক্ষা বাজেটে যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি তিনি মিত্র দেশগুলোকে জিডিপির ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করতে উৎসাহিত করেছেন, যা ও’ব্রায়েনের ভাষায় “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে বড় ইউরোপীয় পুনরায় সশস্ত্রীকরণ প্রচেষ্টা।” জার্মানি আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে প্রতিরক্ষা বাজেট দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা নিয়েছে।
ট্রাম্পের নেতৃত্বে ন্যাটো থেকে সরে যাওয়ার আশঙ্কা বাস্তবায়িত না হয়ে বরং জোটটি আরও শক্তিশালী হয়েছে। তার কঠোর অবস্থানের ফলে ইউরোপীয় দেশগুলো প্রতিরক্ষা খাতে বাস্তব বিনিয়োগে বাধ্য হয়েছে। ইউক্রেনকে সহায়তায় ইউরোপের ব্যয় বাইডেন প্রশাসনের সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে—২০২২-২৫ সময়ে গড়ে প্রতি ত্রৈমাসিকে ১২.২ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ট্রাম্পের আমলে ১৮.৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের মার্চ-এপ্রিলে এই সহায়তা ২৩.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ।
২০২৬ অর্থবছরের জন্য ট্রাম্প প্রশাসন ও কংগ্রেস প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেটের পরিকল্পনা করছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন প্রযুক্তি, নৌবাহিনী সম্প্রসারণ ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় জোর দেওয়া হবে। একইসঙ্গে ট্রাম্প এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় মিত্রদের, বিশেষত তাইওয়ান, জাপান ও ভিয়েতনামকে ন্যাটোর মতোই জিডিপির ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাইওয়ান ২০৩০ সালের মধ্যে এই লক্ষ্য পূরণের ঘোষণা দিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও উন্নত অস্ত্র কিনছে।
কৌশলগতভাবে, ট্রাম্প “গোল্ডেন ডোম” ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা উদ্যোগ চালু করেছেন, যা রোনাল্ড রেগানের ১৯৮০ সালের স্ট্র্যাটেজিক ডিফেন্স ইনিশিয়েটিভ এর মতো ভূমিভিত্তিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও মহাকাশ ভিত্তিক সেন্সরকে একীভূত করবে। তাছাড়া রাশিয়া ও চীনের পারমাণবিক শক্তি প্রদর্শনের জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯২ সালের পর প্রথমবারের মতো পারমাণবিক পরীক্ষা পুনরায় শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। ও’ব্রায়েনের মতে, এই পদক্ষেপ মার্কিন প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও বাস্তবসম্মত ও বিশ্বাসযোগ্য করছে।
ইসরায়েলের প্রতি দৃঢ় সমর্থন এবং ইরানের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ চাপ পুনঃপ্রবর্তনের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের নীতি সবচেয়ে সফল হয়েছে । নাতাঞ্জ ও ফোর্ডোর পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলা ইরানের সক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে পরিস্থিতি গড়ায়নি। এর ফলে হিজবুল্লাহ ও হামাস দুর্বল হয়েছে এবং অঞ্চলটি স্থিতিশীলতার পথে ফিরছে, বলে মত দিয়েছেন ও ব্রায়ান।
তিনি উল্লেখ করেন, ট্রাম্প শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলেও মধ্যস্থতা করছেন। তার প্রশাসন ভারত-পাকিস্তানের কাশ্মীর সংঘাতে যুদ্ধবিরতি, রুয়ান্ডা ও কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের মধ্যে শান্তি চুক্তি, আর্মেনিয়া-আজারবাইজানের ঐতিহাসিক সমঝোতা, এবং ইসরায়েল-হামাসের যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করেছে। ট্রাম্প প্রয়োজনে শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞাকে কূটনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন, যা ও’ব্রায়েনের মতে, তাকে “অপরিহার্য বৈশ্বিক কূটনীতিক” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
পাশাপাশি ট্রাম্প পশ্চিম গোলার্ধেও সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে কঠোর নজরদারি, ক্যারিবিয়ানে মাদক বিরোধী অভিযান, কানাডা ও মেক্সিকোর উপর বাণিজ্যিক চাপ এবং গ্রিনল্যান্ড ও পানামা অঞ্চলে চীনের প্রভাব কমানোর পদক্ষেপের মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা জোরদার করেছেন।
ও’ব্রায়েনের বিশ্লেষণে উপসংহার টানা হয়েছে এভাবে — স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নেওয়া অংশীদারদের সমর্থনপুষ্ট একটি শক্তিশালী যুক্তরাষ্ট্র, স্বৈরশাসক ও সন্ত্রাসীদের উভয়ের বিরুদ্ধে জয়ী হবে। তার মতে, ট্রাম্পের “শক্তির মাধ্যমে শান্তি” নীতি বিশ্বকে আরও নিরাপদ ও স্থিতিশীল করে তুলছে।
