

শেষটা হয়তো আইফোনের কিস্তি দিতে না পারা থেকে হয়েছে। তবে ভারতের মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি সম্ভাজিনগরে পাহাড়ের চূড়া থেকে পড়ে পুরো একটি পরিবারের হারিয়ে যাওয়ার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ পারিবারিক বিবাদ ও বেদনার ইতিহাস।
আইফোনের কিস্তির টাকা নিয়ে নিয়ে বাবার সাথে বিবাদের জের ধরে শুক্রবার সকালে একটি পাহাড়ের খাদের কিনারে দাড়িয়ে আত্মহত্যার হুমকি দেয় ১৮ বছর বয়সী কুনাল চন্দগুড়ে। তিন ঘণ্টা বোঝানোর পর বাবা মুরলীধর চন্দগুড়ে ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করেন। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে বাবা-ছেলে দুজনই ভারসাম্য হারিয়ে ২৫০ ফুট গভীর খাদে পড়ে যান। মুহূর্তের মধ্যে তার কুনালের মা সঙ্গীতা চন্দগুড়েও পাহাড় থেকে লাফ দেন।
সঙ্গীতা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় ছিলেন। ২৯ হাজার ফলোয়ারের নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে তিনি নিয়মিত নানা মটিভেশনাল পোস্ট শেয়ার করতেন। ছেলেকে নিয়ে ব্লগ করতে করতেন। প্রায়ই তিনি সেখানে নানা পারিবারিক সঙ্কটের কথাও তুলে ধরতেন।
সেইসব পোস্ট থেকে এখন বেড়িয়ে আসছে এই পরিবারটির নানা সঙ্কট আর বেদনার কথা। পরিবারটি সুখেই ছিলেন। ছয় বছর আগে অসুস্থতায় এই দম্পতির বড় ছেলের মৃত্যুর পর সব এলোমেলো হয়ে যায়। পরিবারের কর্তা মুরলীধর চন্দগুড়ে সংসারে মনোযোগ হারিয়ে আরো বেশি কাজে ডুবে যান। পেশায় গাড়িচালক মুরলীধর মাসের পর মাস বাড়ির বাইরে থাকতেন।
মর্মান্তিক এই ঘটনার দুদিন আগে তিনমাস পর মুরলীধর বাড়ি ফেরে। কিন্তু তিনি বাড়ি ফেরার পর নতুন করে পারিবারিক বিবাদ শুরু হয়। এই কলহ চূড়ান্ত রূপ নেয় শুক্রবার সকালে। যা শেষ পর্যন্ত দেশ কাঁপিয়ে দেয়া এক মর্মান্তিক ঘটনায় শেষ হয়। তবে কুনালের এবারই প্রথম আত্মহত্যার চেষ্টা নয়। গতবছরও সে একই জায়গা থেকে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল। সেবার পুলিশ বুঝিয়ে শুনিয়ে তাকে নিবৃত করতে পেরেছিল, বিন্তু এবার আর কেউ তাকে ঠেকাতে পারেনি।
ঘটনার আগের দিন সঙ্গীতা তার ইউটিউব চ্যানেলে একটি সেলফি ভিডিও শেয়ার করেন। যাতে সম্পর্কের মূল্য নিয়ে কথা বলেন তিনি। কারো নাম উল্লেখ না করলেও সঙ্গীতা বলেন, ‘যে ব্যক্তি ভালোবাসার মূল্যায়ন করে না, তার জন্য কোনো কিছু করার কোনো মানে নেই। নিজের ভাগ্য তাকেই সঁপে দিতে প্রস্তুত থাকুন, যে আপনার মূল্য বোঝে, যে আপনার ভালোবাসার দাম দেয়। কোনো ব্যক্তি যদি আপনার মূল্যায়ন না করে, আপনার ভালোবাসার কদর না করে, কিংবা আপনি তার জন্য যা করছেন তার গুরুত্ব না বোঝে, তবে তেমন মানুষের জন্য কিছু করার কোনো অর্থ হয় না।’ সঙ্গীতা বলেন, ‘একটি রুটি তখনই খেতে ভালো লাগে যখন সেটি দুই পিঠ থেকেই ভালোভাবে সেঁকা হয়। সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই রকম। যদি এটি দুই পক্ষ থেকেই বজায় রাখা হয়, যদি উভয় পক্ষই এর মূল্যায়ন করে, তবেই এমন সম্পর্কে থাকা উচিত। অন্যথায়, যদি একজন মানুষ মূল্যায়ন করে আর অন্যজন না করে, তবে সেই সম্পর্কের কোনো অর্থ থাকে না। এমন সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসাই সবসময় শ্রেয়।’
অপর এক ভিডিওতে সঙ্গীতা পারিবারিক সম্পত্তি এবং অধিকার নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। তাতে উঠে এসেছিল ছয় বছর আগে তার আরেক ছেলে হারানোর প্রসঙ্গও। সেই ভিডিওতে তিনি বলেছিলেন, ‘আজকাল একজন পুরুষের বোনেরা (ননদরা) কখনোই তাদের ভাইয়ের স্ত্রীকে (ভাবিকে) বোঝার চেষ্টা করেন না। তারা কখনোই ভাইয়ের স্ত্রী-সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা দেখান না, প্রতিনিয়ত তাকে গালিগালাজ করেন, ভাইয়ের সংসারে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করেন এবং ঝগড়া বাঁধিয়ে দেন। তারা তাকে হেনস্থা করেন; এক অর্থে, ভাইয়ের সংসার ভাঙার জন্য তারা আপ্রাণ চেষ্টা করেন। আর যদি তারা সেটি ভাঙতে না পারেন, তবে সম্পত্তিতে নিজেদের অংশ দাবি করেন এবং সম্পত্তি কেড়ে নেন।’ সঙ্গীতা আরো বলেছিলেন, ‘তারা ভাইয়ের দুঃখে তার পাশে দাঁড়ান না। ভাইয়ের স্ত্রীকে বোঝার চেষ্টাও করেন না। বরং, যখন ভাইয়ের ছেলে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়, সেই কঠিন সময়েও তারা ভাইয়ের স্ত্রীকে এবং ভাইকে গালিগালাজ করেন।’ পুলিশ এখন সঙ্গীতার ভিডিও বিশ্লেষণ করে ঘটনার পেছনের পারিবারিক সঙ্কট, সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ তদন্ত করে দেখছে।
শুক্রবার বেঁচে থাকা একমাত্র ছেলেকে বাঁচাতে সঙ্গীতা ছেলের কাছে কাকুতি-মিনতি করেছিলেন। সব আবদার পূরণের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু কুনাল কারো কথা শোনেনি। কুনাল তার মাকে বলেছিল, ‘মা, আমার কথা কেউ শোনে না। আমার বেঁচে থাকার কোনো ইচ্ছা নেই। আমার জীবনের কোনো সমাধান নেই। কোনো কিছুই ভালো হতে যাচ্ছে না।’
