

মুসলিম ইবনে রবি, ক্যাম্পাস করেসপন্ডেন্ট, জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়৷
রাঙামাটির মূল শহরের ভিতর দিকে একটা বাজার ছিল। সকল জাতি ধর্মের মানুষ সেখানে নির্দ্বিধায় বাজার করত। বাজারটির দক্ষিণে বেশ কয়েকটি দোকান ছিল যারা গরুর মাংস বিক্রি করতো৷ তারই ঠিক বিপরীতে উত্তর পাশে বিক্রি হতো শূকরের মাংস। যে-যার ধর্মীয় আচার ও ব্যক্তিগত চাহিদা অনুযায়ী মাংস কিনে নিত। সৌহার্য সম্প্রীতির অনন্য নজির এই বাজার সকাল-সন্ধ্যা শান্তিপূর্ণভাবে চলতো।
এরই মাঝে উদয় হল এক বিশিষ্ট চিন্তাশীল, মুক্ত চিন্তাধারার, প্রগতিশীল এক ব্যক্তিত্বের। তিনি বাজারটি পর্যবেক্ষণ করলেন। অতঃপর জনসম্মুখে বলে উঠলেন," শুকরের মাংস আর গরুর মাংসের দোকানের মধ্যকার দূরত্ব আমি দু'চোখে সহ্য করতে পারছি না। মানুষ মানুষে কেন ভেদাভেদ হবে। কেন দূরত্ব বাড়বে মাংসের দোকানের। দুই জাতীয় মাংসের দোকানে দূরত্ব মানেই মানুষে-মানুষে দূরত্ব। আমি চাই পরস্পর সহমর্মিতা। এই সহমর্মিতা বাড়ানোর জন্য আমাদের অভ্যন্তরীণ দূরত্ব কমাতে হবে৷ আর তারই প্রথম পদক্ষেপ হবে গরুর মাংস এবং শুকরের মাংসের দোকান পাশাপাশি নিয়ে এসো।"
সাধারণ মানুষ ভাবলে ভারি চমৎকার প্রস্তাব, ভিন্ন জাতিসত্তার মধ্যে মিলবন্ধন। ব্যাস যে ভাবনা সে কাজ। শুরু হলো গরুর মাংসের দোকান ও শুকরের মাংসের দোকান পাশাপাশি আনার প্রক্রিয়া। নতুন এ সম্প্রীতি দেখতে কৌতুহলী মানুষ জনে-জনে ভিড় করছিল, মাংস কিনছিল। বিপত্তি বাধলো একদিন৷ শূকরের মাংসের দোকান থেকে এক টুকরো মাংস এসে পড়ল গরুর মাংসের দোকানে। হালকা ঝগড়াঝাঁটি দিয়েই সমাপ্ত হলো সে পর্বের। কিন্তু অন্যে একদিন হঠাৎ করেই ভুলবশত গরুর হাড় পড়ল শুকরের মাংসের ভিতরে। হায়-রাম, হায়-রাম, একি অলক্ষুণে কান্ড, জাত গেল জাত গেল, বলে চিৎকার দিয়ে উঠল এক সনাতনী বাবু৷ জাত বাঁচাতে হলে এবার যে লাঠি ধরতে হয়। বেধে গেল তুমুল সংঘর্ষ। পরশ্রীকাতর এলাকাবাসী বিভক্ত হয়ে গেল। কেউ জাত বাঁচানোর লড়াইয়ে, কেউবা জিহাদ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে।
সংঘর্ষে গড়ালো হাসপাতাল ভ্রমণে৷ প্রাণহানি, ঘরবাড়ি ভাঙচুর, লুটপাট হওয়ার পর উভয়পক্ষ আসলো সমঝোতা করতে। সভা-মজলিস দফায় দফায় হলো। জ্ঞানী-গুণী, বৃদ্ধ-বনিতা, মোড়ল-মাতব্বর সকলের চেষ্টা বৃথা হল সমাধান মিলল না।
তারপর একদিন ধার্য করা হলো সমাধানের শেষ দিন হিসেবে, জনসম্মুখে উন্মুক্ত প্রান্তরে উদাত্ত আহ্বান করা হলো- একটি সমাধানের।
স্কুল শেষ করে হাই স্কুলে পা দিবে এমন এক কিশোর বলে উঠলো-আগে যেমন ছিল তেমনি করে দিন৷
তখনই সেই ধূর্ত বাজ প্রগতিশীল ব্যক্তি উদয় হলো, বলে উঠলে এই বাচ্চা ছেলে, তুমি সম্প্রীতির বোঝো কি? দোকানের দূরত্ব বাড়ালে কি সম্প্রীতি থাকবে?
ছেলেটা মুচকি হেসে বলল, এখন তো দোকান পাশাপাশি আছে, সম্প্রীতি আছে কি?
কাছাকাছি থাকা আর পাশাপাশি থাকার মধ্যে যে পার্থক্য সাধারণ মানুষ তা উপলব্ধি করতে পারল। বর্তমানে আমাদের সমাজেও কিছু ধূর্ত বাজ মানুষ রয়েছে। যারা সমাজকে অস্থিতিশীল করে, স্থিতিশীলতার বুলি ফোটায়। তাদের কূটনীতির ফলশ্রুতি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এ সকল মানুষের অন্তসারশূন্যতা সমাজের সম্প্রীতি নষ্ট করে।
আমি আমার জীবনের একটা বড় সময় কাটিয়েছি পাহাড়ে।পাহাড়ের এক অপরূপ মায়া আছে। যারা পাহাড়ে বড় হয়েছে তারা জানে। পাহাড়ি-বাঙালির মেলবন্ধন পাহাড়ের সৌন্দর্যকে বহুগুণী বৃদ্ধি করে দেয়। তবে পাহাড়ে সহিংসতা বড়ই নৃশংস। বর্তমান সময়ে সেনাবাহিনীর সাথে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু ঘটনা, পাহাড়ের এককালের কালো অধ্যায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। শান্তির পাহাড়ে অশান্তি আমরা কখনই চাই না।

