ঢাকা
৯ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
সকাল ১০:৩৫
logo
প্রকাশিত : মে ৯, ২০২৬

গ্যাস সংকট কাটাতে রেকর্ড গভীরতায় কূপ খনন হচ্ছে

দেড় দশক ধরে দেশ প্রচণ্ড গ্যাস সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। ২০১৫ সালের পর থেকে প্রতিনিয়ত দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের জোগান কমে যাচ্ছে। দেশে যে গ্যাসের চাহিদা তার অর্ধেক সরবরাহ করতে পারছে জ¦ালানি বিভাগ। চাহিদার প্রায় অর্ধেক গ্যাস আবার বিদেশ থেকে অনেক বেশি দামে আমদানি করতে হচ্ছে। ফলে গ্যাসের জন্য প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত বাংলাদেশ এতদিন বিভিন্ন কূপ থেকে যে গভীরতায় গ্যাসের উত্তোলন করেছে এখন সেখান থেকে আরও গভীরতায় কূপ খনন করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে একটি কূপের গভীরতা হবে সাড়ে পাঁচ কিলোমিটারের বেশি, যা হবে দেশের গ্যাসফিল্ডের ইতিহাসে রেকর্ড। ইতোমধ্যে চারটি গভীর কূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড দুটি এবং বাপেক্স দুটির কাজ করছে।

সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এ চারটি কূপ খনন করে সফল হলে সরকার ভবিষ্যতে আরও গভীর গ্যাস কূপ খননের উদ্যোগ গ্রহণ করবে। সরেজমিন দেখা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডের অধীনে তিতাসের ৩১ নম্বর কূপ খনন এলাকায় মহাকর্মযজ্ঞ চলছে। গ্যাসের সন্ধান বাড়াতে নতুন উৎস আবিষ্কার করতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গ্যাসের সংকট মোকাবিলায় মাটির আরও গভীরে খনন এবং আরও সম্ভাবনা খোঁজার প্রচেষ্টা করছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)। তিতাস ৩১ নম্বর গ্যাস কূপটি একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের

সহযোগিতায় মাটির ৫.৬ কিলোমিটার বা ১৮ হাজার ৩৭২ ফুট গভীরে কূপ খননের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বিসিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাংবাদিকদের বলেছেন এখানে সফল হলে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।

দেশে প্রথমবারের মতো শুরু হওয়া এই ডিপ ড্রিলিং বা গভীর কূপ খনন চলছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিজিএফসিএলের তিতাস-৩১ গ্যাসফিল্ডে। গত সোমবার দুপুরে তিতাসের গ্যাসফিল্ডটিতে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, একটি নতুন রিগ ব্যবহার করে চায়না এবং বাংলাদেশের কর্মীরা অব্যাহতভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তিতাস গ্যাস ফিল্ডে এতদিন ৩ হাজার ৭০০ মিটার গভীর থেকে গ্যাস উত্তোলন করা হয়।

বিজিএফসিএল সূত্রে জানা যায়, ইতোমধ্যে ত্রিমাত্রিক জপি বা থ্রিডি সিসমিক সার্ভে করা হয়েছে। সেখানে তিতাস-৩১ নম্বর কূপের ৪টি স্তরে কমপক্ষে ২ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন ঘনফুট) গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। ২০১১ সালে প্রথমে বাপেক্স সিসমিক সার্ভে পরিচালনা করে। সেই তথ্য তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নিরীক্ষাতেও সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল জলিল প্রামানিক। তিনি বলেন, এই কূপ খনন শেষে একই রিগ ব্যবহার করে বাখরাবাদেও আরেকটি কূপ খনন করা হবে। যার গভীরতা ৪ হাজার ৩০০ মিটার। এতে মোট ব্যয় হবে ৫৯৪ কোটি টাকা। সবকিছু ঠিক থাকলে কূপ দুটিতে দুই টিসিএফ (ট্রিলিয়ন ঘনফুট) গ্যাস পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে, খনন শেষে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই জানা যাবে সেখানে প্রকৃতপক্ষে কতটুকু গ্যাস পাওয়া যাবে আর কতটুকুই বা উত্তোলন করা যাবে।

পেট্রোবাংলার অফিসিয়াল হিসাবে, এখন দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। তবে যে পরিমাণ শিল্প কারখানা, বিদ্যুৎ কেন্দ্র গ্যাসের জন্য অপেক্ষামান সেগুলোর হিসাব করলেও আরও অনেক বেশি হবে মনে করছেন কর্মকর্তারা। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয় মাত্র ২৬শ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে এমন তীব্র সংকটে যদি দুই টিসিএফ গ্যাস পাওয়া যায় সেটা হবে দেশের জন্য সুখবর।

তিতাস-৩১ গভীর কূপ খনন প্রকল্পের পরিচালক মো. মাহমুদুল নবাব তার এক উপস্থাপনায় বলেন, এ অঞ্চলে গভীর কূপ খননের কথা আরও অনেক আগেই বিশেজ্ঞরা বলে গেছেন। তবে আমরা অনেক বছর পরে এসে সেটা শুরু করলাম। তিনি বলেন, তিতাস গ্যাস ফিল্ডে সোর্স বা উৎস রকের অবস্থান প্রায় পাঁচ হাজার মিটারের নিচে। সেই উৎস থেকে আসা গ্যাস আমরা ২ হাজার ৭০০ মিটারে অবস্থিত স্তর থেকে উত্তোলন করছি। স্বাভাবিকভাবে সোর্স রকের যত কাছাকাছি যাওয়া যাবে গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভবনা তত বেশি থাকার কথা। আমরা সেটাই অনুসন্ধান করছি।

মাহমুদুল আশা প্রকাশ করে বলেন, খনন কাজ সফল হলে বাংলাদেশের জন্য নতুন পথ খুলে যাবে। তিতাস গ্যাস ফিল্ডে উচ্চচাপের কারণে অতীতে তিন হাজার ৬৮০ মিটারের নিচে খনন করা হয়নি। এবারই প্রথম গভীর কূপ খনন করা হচ্ছে। প্রকল্প কর্মকর্তা আরও যোগ করেন, আগরতলায় (এডি-৬০) ৪৬শ মিটার কূপ খনন করা হয়েছে। বিশ্বে প্রায় ১২ হাজার মিটার কূপ খননের নজির রয়েছে। মজুদের দিক থেকে তিতাস গ্যাস ফিল্ড এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বলা যায়। ফিল্ডটি থেকে এ যাবত ৫ দমমিক ৬৮ টিসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। অবশিষ্ট মজুদ বিবেচনা করা হয় এক দশমিক ৬৫ টিসিএফ। সেখানে গভীরে আরও ২টিসিএফ গ্যাস প্রাপ্তির আশা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান যে রিগটি দিয়ে কাজ করা হচ্ছে সেটা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন। দুই হাজার ৬৮২ হর্সপাওয়ারের উচ্চক্ষমতার আধুনিক রিগ মেশিন বা খনন যন্ত্র। দেশে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৯০০ মিটার পর্যন্ত কূপ খননের ইতিহাস রয়েছে। এবার সেই রের্কড ভেঙে নতুন সম্ভাবনার পথ উন্মোচন করতে চায় সরকার।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই কূপ খনন শুরু হয় গত এপ্রিল মাসের ১৯ তারিখ। শেষ হতে সময় লাগবে অন্তত আরও ৬ থেকে ৭ মাস। আর বাখরাবাদ-১১ কূপ খননে সময় ধরা হয়েছে আরও ৬ মাস।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে সাধারণত ২৬শ মিটার থেকে চার হাজার মিটার পর্যন্ত কূপ খনন করে গ্যাস তোলা হয়। তবে ফেঞ্চুগঞ্জ-২ সহ কিছু কূপে চার হাজার ৯০০ মিটার পর্যন্ত খনন করা হয়েছে। গ্যাস স্তরের নিচে রয়েছে কঠিন শিলা বা পাথরের স্তর। বাপেক্সের একটি ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) জরিপে বলা হচ্ছে এর নিচে গ্যাস স্তর থাকতে পারে। ওই থ্রিডিতে বলা হয়েছে শ্রীকাইলে ৯২৬ বিসিএফ (বিলিয়ন ঘনফুট) আর তিতাসে এক দশমিক ৫৮ টিসিএফ গ্যাস থাকতে পারে। সব মিলিয়ে মজুদের পরিমাণ আড়াই টিসিএফও হতে পারে। তবে কূপ খনন শেষ করে চূড়ান্ত ফল পাওয়ার পর সব বলা যাবে।

এদিকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মাটির নিচে ৩ হাজার ৭৫০ মিটার পার হলেই শুরু হবে উচ্চ গ্যাসের উচ্চচাপ। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এই চাপ সামাল না দিলে বিপদ হতে পারে। পুরো খনন প্রক্রিয়া ভেস্তে যাবে। ফলে তিতাস ৩১ নাম্বার কূপে ১৫ হাজার পিএসআই সক্ষমতার প্রেসার থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রযুক্তি সংযুক্ত করা হয়েছে। অতীতের ১০ হাজার পিএসআইয়ের সীমাবদ্ধতা থেকে এবার ১৫ হাজার পর্যন্ত বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সিসিডিসি কাজটি বাস্তবায়ন করছে।

বিজিএফসিএলের কর্মকর্তারা বলছেন, এমন উচ্চক্ষমতার রিগ আগে বাংলাদেশে ছিল না। প্রযুক্তিও এত উন্নত ছিল না। তাই এই প্রকল্পে শুধু প্রযুক্তির উন্নয়ন নয়, আছে বড় প্রত্যাশাও। চীনা প্রতিষ্ঠানটির তাদের দেশে ১০ হাজার মিটার গভীরে কূপ খননের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে তারা বাংলাদেশেও যথাযথভাবে কাজ করতে পারবে, এমন প্রত্যাশা প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের।

logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram