

মশক নিধন কার্যক্রমের ব্যয় নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি)। বছরের ব্যবধানে মশক নিধনে ২৯ গুণ ব্যয় বাড়লেও মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ নগরবাসী।
নগরবাসীর অভিযোগ, বাস্তবে কার্যকর মশক নিধন কার্যক্রম চোখে না পড়লেও কাগজে-কলমে ব্যয়ের হিসাব বেড়েছে কয়েক গুণ। বিশেষ করে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যেখানে মশা মারার খরচ ছিল ২১ লাখ টাকার কিছু বেশি, সেখানে পরের অর্থবছরে সেই ব্যয় দেখানো হয়েছে সাড়ে তিন কোটিরও বেশি। আর চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ছয় কোটির বেশি।
‘সিটি করপোরেশন থেকে যে কবে কবে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় তাই জানি না।’
বরিশাল নগরীর ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মহাবাজ এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওই এলাকায় কোনো মশক নিধনের কার্যক্রম পরিচালনার দৃশ্য দেখননি তারা। তবে মশক নিধনে সিটি করপোরেশনে প্রতি বছর বরাদ্দের কথা শুনেছেন বলে জানান।
দু’বছরে বিসিসির মশা মারার ব্যয় ২১ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৬ কোটি
ওই এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা শামীম হোসেন বলেন, সিটি করপোরেশন থেকে যে কবে কবে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় তাই জানি না।
মশক নিধনে সিটি করপোরেশন ফগার মেশিন ব্যবহার করে কি না জানতে চাইলে তিনি প্রথমবারের মতো এই নাম শুনেছেন বলে জানান তিনি।
‘অবস্থা এমন যে মশার উপদ্রব থেকে বাঁচতে দিনেও কয়েল জ্বালিয়ে রাখতে হয়। সন্ধ্যার পর বাইরে বের হলে মশা যেভাবে ঘিরে ধরে, মনে হয় উড়িয়ে নিয়ে যাবে। আর বাচ্চাদের তো মশারির মধ্যেই রাখতে হয়।’
অথচ বিসিসির ব্যয় বিবরণীতে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মশা নিধনে চার কোটি টাকা খরচ দেখানো হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয় হয়েছে ফগার মেশিন কেনায়।
বিসিসির হিসাব শাখার তথ্য অনুযায়ী প্রকাশিত বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পরিচ্ছন্নতা শাখার মোট ব্যয় ছিল ৩৫ লাখ ৯৪ হাজার ১৪৫ টাকা। এর মধ্যে মশা নিধনে ২১ লাখ ৪৯ হাজার ১৪৫ টাকা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ১৪ লাখ ১৪ হাজার ২০০ টাকা এবং পরিচ্ছন্নতাসামগ্রী কেনায় ৩০ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়।
অন্যদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মশা নিধনে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৩ কোটি ৫৪ লাখ ৩৩ হাজার ৪৭১ টাকা। একই সময়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৫৮ লাখ ৬৯ হাজার ৬৪২ টাকা এবং পরিচ্ছন্নতাসামগ্রী কেনায় ব্যয় দেখানো হয়েছে ১ কোটি ২ লাখ ৮১ হাজার ১৭২ টাকা।
‘সাধারণত মশক নিধনে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের তেমন একটা চোখে পড়ে না। তাদের অনুরোধ করে ডেকে এনে কাজ করাতে হয়। তাছাড়া নগরীতে মশা নিধনে যে রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে তা নিম্নমানের।’
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে মশা নিধনের জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৬ কোটি ৩০ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এর মধ্যে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় রাখা হয়েছে ১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা এবং পরিচ্ছন্নতা সামগ্রী ক্রয়ে বরাদ্দ এক কোটির বেশি।
বিসিসির হিসাব শাখার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মশা নিধনের জন্য ফগার মেশিন ক্রয়সহ মোট ছয় কোটি ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ অর্থ এরই মধ্যে ব্যয় হয়েছে বলেও উল্লেখ রয়েছে।
এই ব্যয়ের অসামঞ্জস্যতা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন নগরবাসী। তাদের দাবি, ফগার মেশিনে মশা মারার কার্যক্রম কখনো চোখে পড়েনি। বরং হাতে বহনযোগ্য স্প্রে মেশিন ব্যবহার করতে দেখা গেছে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের।
এদিকে বছরে বছরে মশক নিধনে সিটি করপোরেশনের ব্যয় বাড়লেও কমছে না মশা। মশার উপদ্রবে দিন-রাত অতিষ্ঠ নগরবাসী। এমনকি দিনেও কয়েল জ্বালিয়ে রাখতে হচ্ছে।
নগরীর ১৪নং ওয়ার্ডের গাজী বাড়ি এলাকার বাসিন্দা মিঠু খান জানান, অবস্থা এমন যে মশার উপদ্রব থেকে বাঁচতে দিনেও কয়েল জ্বালিয়ে রাখতে হয়। সন্ধ্যার পর বাইরে বের হলে মশা যেভাবে ঘিরে ধরে, মনে হয় উড়িয়ে নিয়ে যাবে। আর বাচ্চাদের তো মশারির মধ্যেই রাখতে হয়। অথচ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের এ ব্যাপারে কার্যকর তেমন কোনো উদ্যোগ দেখি না।
নগরীর ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের হাসপাতাল রোড এলাকার বাসিন্দা রাজ্জাক হাওলাদার বলেন, বর্ষা মৌসুম চলে এসেছে। বৃষ্টি হলেই এডিস মশা বাড়বে। আবার গরমে বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলেও মশা বাড়বে। তাতে ডেঙ্গুর প্রকোপও বৃদ্ধির আশঙ্কা আছে। সাধারণত জুন-সেপ্টেম্বর সময়ে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশি। এ সময়কে ডেঙ্গুর মৌসুম বলা হয়। তবে সিটি করপোরেশন যে ওষুধ ছিটাচ্ছে, তা মশা মারতে কতটা কার্যকর তা পরীক্ষা করে দেখা দরকার।
নগরীর ১১নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা অধ্যাপক শাহ্ সাজেদা বলেন, নগরীর সবখানেই মশার উৎপাত। সিটি করপোরেশনের মশকনিধন কার্যক্রম চাললেও মশা কমছে না। মশা নির্মূলে আগাম ব্যবস্থা না নিলে ডেঙ্গুর প্রদুর্ভাব বেড়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমি নিয়মিত ট্যাক্স দিই। নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়া আমার অধিকার। সেই জায়গা থেকে মশা থেকে রেহাই পেতে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনার দাবি জানাচ্ছি।
সাবেক জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেছেন, কাগজে কলমে মশক নিধনে অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে সিটি করপোরেশনের অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, বিসিসির পরিচ্ছন্নতা শাখার ব্যয় ব্যবস্থাপনায়ও রয়েছে বড় ধরনের অসঙ্গতি।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা শাখার প্রধান ইউসুফ আলী বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মশা মারায় সাড়ে তিন কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। এ বিষয়ে আমরা কিছু জানি না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবে। মশা মারতে রাসায়নিক আনার যে খরচ হয়, তার চেয়ে বেশি কোনো বিল সাধারণত হয় না। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২১ লাখ টাকা খরচ হলে সেখান থেকে সাড়ে তিন কোটি টাকায় যাওয়া অবশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ।
তবে তিনি দাবি করেন, মশার উপদ্রব বৃদ্ধি ও ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহতার কারণে এই খাতে বরাদ্দ ও ব্যয় আগের চেয়ে বৃদ্ধি করা হয়েছে। তাছাড়া মশা নিধনের কাজ নিয়মিত রুটিন অনুযায়ী চলছে।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) বরিশালের নেত্রী ও বাসদ জেলা সমন্বয়ক ডা. মণীষা চক্রবর্তী বলেন, সাধারণত মশক নিধনে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের তেমন একটা চোখে পড়ে না। তাদের অনুরোধ করে ডেকে এনে কাজ করাতে হয়। তাছাড়া নগরীতে মশা নিধনে যে রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে তা নিম্নমানের।
তিনি আরও বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২১ লাখ টাকা ব্যয় যুক্তিসঙ্গত মনে হলেও পরের বছর সাড়ে তিন কোটি টাকা ব্যয় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এত বড় অঙ্কের ব্যয় দেখানোর পরও নগরীতে মশার উপদ্রব কমেনি, বরং বেড়েছে। এতে পুরো বিষয়টি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বলেন, এই ব্যয়ের বিষয়গুলো আমার দায়িত্ব গ্রহণের আগের। তাই এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা নেই। তখন দায়িত্বে ছিলেন বর্তমান বন ও পরিবেশ সচিব এবং সাবেক বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার রায়হান কাওছার। বিষয়টি সম্পর্কে তিনিই ভালো বলতে পারবেন। এছাড়া মশা নিধনে ব্যবহৃত রাসায়নিক কার্যকর না হওয়ায় এরই মধ্যে ঠিকাদার পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সুত্র: জাগো নিউজ

