ঢাকা
logo
প্রকাশিত : September 15, 2026

রাবিতে শিবির সন্দেহে রাতভর হেনস্তার অভিযোগ ছাত্রদলের বিরুদ্ধে

‎আবু হেনা সাকিল, রাবি প্রতিনিধি: শিবিরের হয়ে ছাত্রদলে অনুপ্রবেশের সন্দেহে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শহীদ শামসুজ্জোহা হলের এক শিক্ষার্থীকে রাতভর হেনস্তা ও মারধরের অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।

সোমবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে হলটির ভেতরে এ ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে। ‎ভুক্তভোগী মোহাম্মদ আসিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।

‎ভুক্তভোগীর অভিযোগ, হল ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাকে হলে সিট দেওয়ার কথা বলে তার মোবাইল ফোন নিয়ে শিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ খোঁজা হয় এবং তাকে ‘শিবিরের স্পাই’ আখ্যা দিয়ে রাতভর জিজ্ঞাসাবাদ, হেনস্তা ও মারধর করা হয়।

‎তবে হল ছাত্রদলের দাবি, তিন মাস ধরে অবৈধভাবে হলেই অবস্থান করছিলেন আসিফ। হল প্রাধ্যক্ষ তাকে হলে থেকে নামার কথা জানালে সে আর্থিক অস্বচ্ছলতার কথা জানিয়ে হল ছাত্রদল সভাপতির সাথে দেখা করতে চেয়েছিল। তাকে কোনরকম হেনস্তা করা হয়নি।

‎হল ছাত্রদল আরও দাবি করে, ওই শিক্ষার্থী পূর্বে শাখা শিবিরের ওয়ালফেয়ার ভবনে সাত মাস অবস্থান করেছিলেন। তিনি হল শিবিরের সভাপতির সাথে গোপনে যোগাযোগ করে নিজে থেকেই ছাত্রদলে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন। গোপনে তিনি ছাত্রদলের তথ্য শিবিরকে দেওয়ার কথাও শিবির সভাপতিকে হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজে জানিয়েছেন।

‎এদিকে আসিফ বলেন, ‘পরিবারের পরিস্থিতির কারণে হলে একটি সিটের জন্য কয়েকবার প্রভোস্ট স্যারের কাছে অনুরোধ করেছি। পরে গণরুমে ফাঁকা সিটের বিষয়ে জানতে গেলে আমাকে ছাত্রদলের হল সভাপতি ফুয়াদ ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়। তার সঙ্গে কথা বললে তিনি ছাত্রদল করতে হবে এবং ছাত্রদল করলেই সিট দেওয়া হবে বলে জানান। পরিবারের পরিস্থিতির কারণে আমিও সিটের আশায় ছাত্রদলের সঙ্গে প্রোগ্রাম করার বিষয়ে রাজি হই।’

‎তিনি বলেন, ‘পরে রাতে তার কক্ষে গেলে একটি গ্রুপে যুক্ত করে দেওয়ার কথা বলে তিনি আমার মোবাইল ফোন নেন। এরপর ফোনের বিভিন্ন বিষয় চেক করে আমাকে শিবির করার এবং ‘শিবিরের স্পাই’ হিসেবে হলে আসার অভিযোগ করেন। আমি বিষয়টি অস্বীকার করে সিটের ব্যবস্থা করে দেওয়ার অনুরোধ করি। একপর্যায়ে তিনি আমাকে ধমক দেন এবং পরে ছাত্রদলের আরও কয়েকজন নেতাকর্মী সেখানে আসেন। তারা আমাকে টেনে গণরুমে নিয়ে যান এবং সেখানে আমার ওপর হাত তোলা ও মারধর করা হয়।’

‎আসিফ আরও বলেন, ‘পরে আমার মোবাইল ফোন ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের ভিডিও ধারণ করা হয়। আমার কাছ দিয়ে বিভিন্ন কথা বলিয়ে ভিডিও করা হয়। এমনকি আমাকে দিয়ে লিখিয়েও নেওয়া হয় যে আমি নাকি নেতা হতে চাই। এভাবে আমার কাছ থেকে একটি স্বাক্ষরও নেওয়া হয়েছে।’

‎তিনি বলেন, ‘আমি এখন খুবই আতঙ্কের মধ্যে আছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, তা কখনো ভাবিনি। আমি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ, আমার বিভাগ ও শিক্ষকদের কাছে সহযোগিতা চাই। আমার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং আমি যেন নিরাপদে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারি।’

‎অভিযোগের বিষয়ে জোহা হল ছাত্রদল সভাপতি মেহেদী হাসান ফুয়াদ বলেন, ‘পাশাপাশি এলাকার হওয়ায় আসিফ আমাকে জানায় যে সে প্রায় তিন মাস ধরে অবৈধভাবে হলে অবস্থান করছে। সে যেই সিটে অবস্থান করছিল সেই সিটটি নতুন করে অন্য একজনকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। থাকার জায়গা না থাকায় কী করবে জানতে চাইলে আমি তাকে প্রভোস্ট স্যারের সঙ্গে কথা বলতে বলি।’

‎ফুয়াদ বলেন, ‘এসময় সে আমাকে বলে তার পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড বিএনপির এবং তাকে ছাত্রদলে নেওয়া হলে সে ছাত্রদল করবে। এরপর তাকে আমাদের হল ছাত্রদলের গ্রুপে যুক্ত করার জন্য তার ফোন হাতে নিই। তখন তার ফোনে হল শিবিরের সভাপতি রাফসানের সঙ্গে কথোপকথন দেখতে পাই। ওই কথোপকথনে দেখা যায়, তাদের দীর্ঘদিনের পরিচয় রয়েছে এবং বিভিন্ন বিষয়ে যোগাযোগ হয়েছে।’

‎তিনি আরও দাবি করেন, ‘সেখানে রাফসান তাকে আমার সঙ্গে কথা বলার সময় রেকর্ড চালু রাখতে এবং প্রভোস্টের রুমে যাওয়ার আগে ও ভেতরে কথাবার্তা রেকর্ড করে তাদের দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে এমন তথ্যও আমি দেখতে পাই। হলের সেকশন অফিসারের রুমে গিয়েও নজরদারি করার বিষয়ে তার ফোনে তথ্য পাওয়া যায়।’

‎মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করে ফুয়াদ বলেন, ‘তাকে কোনধরনের মারধর করা হয়নি। আমি মনে করি, আসিফকে ব্যবহার করে ছাত্রদলকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। শিবির তাকে একটি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জোহা হলের মাধ্যমে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে।’

‎শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, ‘ওই ছেলে যখন হল সভাপতির রুমে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ে, তখন হল ছাত্রদলের সভাপতি আমাকে ফোন করে জানতে চান, এখন কী করা উচিত। আমি তাকে স্পষ্টভাবে নির্দেশনা দিই, কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যেন না ঘটে। পরবর্তীতে কোনো ধরনের হয়রানি বা অপ্রীতিকর আচরণ ছাড়াই তাকে হল প্রশাসনের মাধ্যমে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।’

‎এদিকে এ ঘটনায় সকালে শিক্ষার্থীকে হয়রানি, হেনস্তা ও মারধরের প্রতিবাদ জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে দেখা করে শাখা ইসলামী ছাত্রশিবির।

‎এসময় শিবিরের পক্ষ থেকে ৪ দফা দাবি জানানো হয়। তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, হল প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগ, জড়িত ছাত্রদল নেতাদের শাস্তি নিশ্চিত, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও নিরাপত্তা প্রদান এবং সিট বণ্টনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

‎ওই শিক্ষার্থীর শিবির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শাখা শিবিরের সাধারণ সম্পাদক হাফেজ মেহেদী হাসান বলেন, ‘ওই শিক্ষার্থীর সঙ্গে শিবিরের কোন সম্পর্ক নেই। ওই ছেলে মুলত ছাত্রদলের সভাপতির সাথে যেভাবে দেখা করেছে, ঠিক একইভাবে হল সংসদের ভিপি এবং হল শিবির সভাপতির সঙ্গেও যোগাযোগ করেছে।’

‎শিবিরের ওয়েলফেয়ার ভবনে ওই শিক্ষার্থীর অবস্থানের বিষয়ে মেহেদী হাসান বলেন, ‘আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল প্রথম বর্ষের প্রায় ১০০ শিক্ষার্থী আমাদের এখানে থাকে। তাদের সবাই শিবিরের রাজনীতি করেনা। আর ওই শিক্ষার্থী আমাদের এখানে ছিল বলে আমার জানা নেই।’

‎ঘটনার বিষয়ে শহীদ শামসুজ্জোহা হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক আল আমিন সরকার বলেন, ‘রাতে আমি বিষয়টি জানতে পেরে হলে উপস্থিত হই। এসময় আমি বাইরে তাদের সঙ্গে কথা না বলে আমার অফিসে তাদের সবাইকে নিয়ে বসি। এসময় ওই শিক্ষার্থী মারধর করা হয়েছে এমন কিছু আমাকে জানায়নি। আমি জিজ্ঞেস করলে সে জানিয়েছে তার সঙ্গে এমন কিছু করা হয়নি।’

‎ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর ফোন বাজেয়াপ্ত করার বিষয়ে প্রাধ্যক্ষ বলেন, ‘ফোনে যেহেতু ওই শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত তথ্য আছে এবং অন্যরা ওর ফোনটি নেওয়ার চেষ্টা করছিল তাই আমি ফোনটি আমার অফিসে রেখে দিয়েছি। এর বাইরে কিছু নয়।’

‎এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মামুনুর রশীদ বলেন, ‘আমরা শিক্ষার্থী এবং প্রভোস্টের বক্তব্য শুনেছি। বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। তবে এখনো সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর বক্তব্য আমরা শুনতে পারিনি।’

‎উপ-উপাচার্য বলেন, ‘প্রকৃত ঘটনা জানার জন্য অবশ্যই তার বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন। বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করা। যেহেতু ঘটনাটি অনেক রাতে ঘটেছে, তাই আসলে কী ঘটেছে, কী ঘটেনি- তা নিশ্চিতভাবে জানতে উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনা জরুরি। এরপর তদন্তের ভিত্তিতে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram