

ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানিসংকটের প্রভাবে ক্রমে চাপের মুখে পড়ছে বাংলাদেশ। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কারখানাগুলো সংকটে এবং সেবা খাতের কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। জ্বালানিসংকটে ভুগছে দেশ। জনগণের বাড়তি চাপের কথা চিন্তা করে সরকার শুরুতে জ্বালানির দাম বাড়াতে না চাইলেও শেষ পর্যন্ত বাড়াতে হয়েছে।
সেচের জন্য জ্বালানিসংকটে রয়েছেন কৃষক। হচ্ছে লোডশেডিংও। অন্যদিকে চলছে এসএসসি পরীক্ষা। বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ করতে গিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে কয়েকটি সার কারখানা।
এদিকে দেশে দেখা দিয়েছে হামের প্রাদুর্ভাব। এমন পরিস্থিতির মধ্যে জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে সংবিধান সংস্কার, জুলাই সনদ, গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ রহিত বা বাতিলের তর্ক-বিতর্কের মধ্যে ‘গুপ্ত’ শব্দ নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলো।
এ নিয়ে শেষ পর্যন্ত ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির ‘সংঘাতে’ জড়াল। প্রশ্ন উঠেছে, ছাত্রশিবির কেন হঠাৎ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল? চলমান সংকটে অন্যকোনো সুবিধাভোগী পক্ষ থেকে ‘আগুনে ঘি ঢালা হচ্ছে না তো’? এমন প্রশ্নও তুলছেন কেউ কেউ।
তবে কেউ এই ইস্যুর নেপথ্যে ক্ষমতা ও ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারের মূল কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন। তবে সময়ই বলে দেবে এই পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে থামে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অতীতে দেখা গেছে ক্যাম্পাসগুলোতে আধিপত্য বজায় রাখতে চায় ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন। বর্তমানে ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রসংসদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রয়েছে ছাত্রশিবিরের নেতৃত্ব। এদিকে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলও তাদের অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চায়।
জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হক বলেন, ‘ক্যাম্পাসগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষমতার লড়াই ও দলীয় আধিপত্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতার পর প্রতিটি সরকারের ছাত্রসংগঠন ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণকে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। আমি মনে করি, বর্তমান উত্তেজনাও তারই ধারাবাহিকতা।’
তিনি আরো বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে সরকার ও বিরোধী উভয় দলের ছাত্রসংগঠনগুলো এই সংঘাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে ক্যাম্পাসের শিক্ষার পরিবেশ হুমকির মুখে। যদি এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকে, তাহলে ৫ আগস্টের আগের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়া অনিবার্য; যা দেশের জন্য মঙ্গলকর নয়। এই সংঘাতের অবসান জরুরি।’
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে পানিসম্পদমন্ত্রী (ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি) শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন, ‘জ্বালানিসংকটের মতোই ছাত্ররাজনীতি নিয়েও সংসদে আলোচনা করে পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। দেশের যে ছাত্ররাজনীতি চলছে, তা নিয়ে সংসদে গভীর আলোচনা তুলে ধরা প্রয়োজন। কারণ এখনো যে ছাত্ররাজনীতি দুই-তিন দিন যাবৎ লক্ষ করা যাচ্ছে, এ প্রজন্ম তা পছন্দ করে না। ফ্যাসিস্টের ধারাবাহিকতায় চাপাতি, অস্ত্র, রামদা, হকিস্টিক নিয়ে…৫ আগস্টের পর সেই ছাত্ররাজনীতি থাকবে, ছাত্ররাজনীতির ময়দানটাকে কলুষিত করা হবে…।’
সম্প্রতি চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে গ্রাফিতিতে ‘গুপ্ত’ শব্দ লেখা নিয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের পর দুই সংগঠনের পরস্পরবিরোধী অবস্থানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ওই ঘটনার প্রতিবাদে পরস্পরকে দায়ী করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির। গত বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপত্তিমূলক ফটোকার্ড তৈরি করা নিয়ে শাহবাগ থানায় আবারও সংঘর্ষ হয় দুই পক্ষের। এ ছাড়া পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ, কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে সংঘর্ষে জড়ায় দুই পক্ষ। চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ ও শোডাউন করেছে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির। কুড়িগ্রাম, নরসিংদীসহ বিভিন্ন জায়গায় দুই সংগঠনের মধ্যে উত্তেজনাকরণ পরিস্থিতির তৈরি হয়। সর্বশেষ গত শুক্রবার রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক হলে সিট বরাদ্দকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনেকেই ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্বে থাকার বিষয়টি সামনে আনেন। তাঁদের কেউ কেউ এর আগে ছাত্রলীগে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে প্রচার রয়েছে। শিবিরের কেউ কেউ আবার সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকার জন্যও পরিচিত ছিলেন। দলীয় পরিচয় প্রকাশ্যে না আনার এই বিষয়টিকে রাজনীতিতে নানা সময় আলোচনার বিষয়বস্তু হয়। এবং ‘গুপ্ত’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। যদিও শিবির বলছে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে এমন ‘ট্যাগিং’ দিচ্ছে ছাত্রদল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার পর ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘শিবিরের গুপ্ত রাজনীতি অব্যাহত থাকলে এ ধরনের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি আরো ঘটতে থাকবে। শিবিরকে গুপ্ত রাজনীতি পরিহার করে প্রকাশ্য রাজনীতিতেই মনোযোগ দিতে হবে।’
চলমান অস্থিরতার জন্য ছাত্রশিবিরকে দায়ী করে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামে শিবির কর্মীরাই ছাত্রদলের ওপর হামলা চালিয়েছে। আমরা হল বা ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি না। বরং সাধারণ শিক্ষার্থীদের বেশে শিবিরই হল দখল ও ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। তারাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম দখল করে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে। বুয়েট থেকে শুরু করে গ্রামের কলেজ পর্যন্ত একই অবস্থা।’
অন্যদিকে ছাত্রশিবির সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলছেন, ‘ছাত্রদলের বর্তমান নেতৃত্ব ফেসবুক প্রোপাগান্ডা দ্বারা অত্যন্ত প্রভাবিত। কেউ তাদের ব্যাপারে নেতিবাচক কোনো মন্তব্য করলেই তাকে ছাত্রশিবিরের কর্মী বলে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। ছাত্রশিবির অনেক আগেই তাদের সব স্তরের কর্মীদের ফেসবুকে আপত্তিকর কোনো বক্তব্য দেওয়া বা লেখা থেকে বিরত থাকার কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে। সমালোচনা হবে রাজনৈতিক ভাষায়, যৌক্তিক ও গঠনমূলক। এর ব্যত্যয় ঘটলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো ক্যাম্পাসে সংঘর্ষ চাই না; চাই সহাবস্থান। আধিপত্য ও ভয়ের রাজনীতি চিরতরে বিলীন হোক। ক্যাম্পাসে ভালো কাজের প্রতিযোগিতা হোক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। বিভাজন ও ট্যাগিংয়ের রাজনীতি কখনোই ভালো কিছু বয়ে আনে না।’

