

তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারসহ পুরো কমিশনের পদ শূন্য থাকায় কার্যত অচল হয়ে পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ, মামলা দায়ের, তদন্ত প্রতিবেদন অনুমোদনসহ দুর্নীতিবিরোধী গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। দুদকে দেখা দিয়েছে ফাইল জটও।
দুদকের কর্মকর্তারা জানান, প্রতিদিন দুর্নীতি সংক্রান্ত পাঁচ থেকে ছয় ডজন অভিযোগ জমা পড়লেও কমিশন না থাকায় এসব অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ করা যাচ্ছে না। অর্থাৎ দুদকের অভিযোগ যাচাই-বাছাই কমিটি থাকলেও তা অকার্যকর। কারণ, কমিশনের অনুমোদন ছাড়া দুর্নীতির নতুন অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ করা যায় না।
একইভাবে মামলা দায়ের, আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল, অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সম্পত্তি ক্রোক কিংবা অভিযুক্তদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা, আসামি গ্রেপ্তারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এসব কারণে কার্যত অচলাবস্থা বিরাজ করছে রাষ্ট্রের সংবিধিবদ্ধ দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটিতে।
জানা গেছে, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী কমিশনের ক্ষমতা অনেক বেশি। কমিশনের অনুমোদন ছাড়া নতুন অনুসন্ধান ও তদন্ত প্রতিবেদন অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সম্ভব না। এমন অবস্থায় কমিশন শূন্য থাকলে অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য এ সংক্রান্ত কাজে দুদক সচিবের ক্ষমতা বৃদ্ধির তৎপরতা চালানো হয়। এ বিষয়ে দুদক থেকে সরকারকে চিঠিও পাঠানো হয়। তবে এ বিষয়ে সায় দেয়নি সরকার।
এরই মধ্যে কমিশনার নিয়োগের জন্য সুপারিশ দিতে দুদক আইন অনুযায়ী যে বাছাই (সার্চ) কমিটি গঠন করতে হয়, ইতোমধ্যে সেই প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। এ লক্ষে গত মঙ্গলবার সভাপতি হিসেবে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের একজন ও সদস্য হিসেবে হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারক মনোনয়নের জন্য প্রধান বিচারপতির কাছে চিঠি পাঠিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। নাম দুটি পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ৫ সদস্যের একটি বাছাই কমিটি গঠন করা হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আইনে কমিশনের পদত্যাগের ৩০ দিনের মধ্যে পুনর্গঠনের কথা রয়েছে। কিন্তু সেটি সম্ভব না হলে বিকল্প কোনো নির্দেশনা আইনে নেই। ফলে কমিশন পুনর্গঠনে সরকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী সরকারকে কমিশন নিয়োগের জন্য একটি সার্চ কমিটি গঠন করতে হয়। সেই সার্চ কমিটি তিনজন কমিশনার নিয়োগের জন্য ছয়জনের একটি তালিকা রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেবেন। রাষ্ট্রপতি ওই তালিকা থেকে একজনকে চেয়ারম্যান করে তিন সদস্যের কমিশন পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ দেবেন।
বিএনপি সরকার গঠনের পর গত ৩ মার্চ পদত্যাগ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া সাবেক সচিব মোহাম্মদ আব্দুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের কমিশন। তখন থেকেই দুদকের অন্যতম কার্যক্রম অনুসন্ধান গ্রহণ, মামলা দায়ের ও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা যাচ্ছে না। যে কারণে দুদকের এসব গুরুত্বপূর্ণ ফাইল দিনের পর দিন জমা হলেও কমিশন পর্যায়ে আটকে আছে।
দুদকের কর্মকর্তারা জানান, এখন যেসব কর্মকর্তার কাছে কমিশন পদত্যাগের আগের গৃহীত অনুসন্ধান ও মামলার তদন্ত কার্যক্রম রয়েছে কেবল সেগুলোই এগিয়ে নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগের পরিচালক ও মহাপরিচালক বরাবর দাখিল করা হয়। কিন্তু সেসব ফাইল মহাপরিচালক থেকে কমিশনে উঠছে না। ফলে তৈরি হচ্ছে দুর্নীতির ফাইলজট। এতে শত শত ফাইল জমে গেছে। নতুন কমিশন নিয়োগ পেয়ে যোগদান করার পর সেসব ফাইলের জট খোলতে পারে বলে আশা করছেন তারা।
কমিশন নিয়োগ দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা না গেলে দুর্নীতি সংক্রান্ত ফাইলের জট আরও বড় হওয়ার শঙ্কার কথাও জানিয়েছেন দুদকের একাধিক ঊচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম (জনসংযোগ) জানান, কমিশন না থাকায় নতুন করে কোনো অনুসন্ধান শুরু হওয়ার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে মামলা দায়ের ও অভিযোগপত্র অনুমোদন কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে। দুদক নতুন কমিশনের অপেক্ষায় রয়েছে। আশা করা যাচ্ছে দ্রুত সময়ের মধ্যে কমিশন নিয়োগ কার্যক্রম শেষ হবে। কমিশন নিয়োগ হলে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু হবে।
দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম বলেন, কমিশনের সিদ্ধান্তের ওপরই দুদকের সার্বিক কার্যক্রম নির্ভরশীল। কমিশন না থাকায় নতুন করে অভিযোগ অনুসন্ধান, মামলা দায়ের কিংবা চার্জশিট দাখিল এসবের কোনোটিই এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই। এতে দুদকে অচলাবস্থা তো তৈরি হয়েছেই, তার ওপর কমিশন নিয়োগ আরও দীর্ঘায়িত হলে সংকট প্রকট হবে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেড় বছরে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করে। এসবের মধ্যে সংসদীয় বিশেষ কমিটির সুপারিশে দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ সহ আরও বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ রহিত করা হয়েছে। যে কারণে আগের দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী তিন সদস্যের কমিশন নিয়োগ দেওয়া হবে।
গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর পদত্যাগ করে মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আব্দুল্লাহর নেতৃত্বাধীন কমিশন। এরপর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর ড. আবদুল মোমেনকে দুদকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়। ওই কমিশনে অন্য দুই কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান সাবেক জেলা জজ মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদ। পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ পেলেও এ কমিশন মাত্র এক বছর দুই মাস দায়িত্ব পালন শেষে গত ৩ মার্চ পদত্যাগ করে।
