ঢাকা
২৫শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
দুপুর ১২:৫৭
logo
প্রকাশিত : জুন ২৫, ২০২৬

সিটি গ্রুপের ঋণ বিপর্যয়ের জন্য দায়ী ব্যাংকাররা

দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী ‘সিটি’ গ্রুপের ঋণ সংকট এখন ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। একসময়ের নির্ভরযোগ্য করপোরেট গ্রাহক হিসেবে বিবেচিত গ্রুপটি বর্তমানে প্রায় ২৪ হাজার ৭৭৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়ে চাপে রয়েছে।

প্রশ্ন উঠেছে- এ পরিস্থিতির জন্য করা দায়ী? অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সংকটের পেছনে সবচেয়ে বড় দায় ব্যাংকারদের নীতিগত ভুল সিদ্ধান্ত ও তদারকি না করা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশ যে গ্যাসের অভাবসহ ভয়াবহ জ্বালানি সংকটে পড়তে যাচ্ছে, সে লক্ষণ দৃশ্যমান হয়েছিল প্রায় এক দশক আগে। দেশে উত্তোলিত গ্যাসে শিল্প-কারখানা সচল রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি শুরু করে সরকার। তারও আগে থেকে বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় নতুন গ্যাস সংযোগ দিতে ব্যর্থ হচ্ছিল পেট্রোবাংলা।

অথচ গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত না করেই ২০২০ সাল-পরবর্তী সময়ে এক সঙ্গে ছয়টি বৃহৎ শিল্প-কারখানা গড়ে তুলেছে ‘সিটি গ্রুপ’। এক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা।

মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে গড়ে তোলা এ শিল্প-কারখানাগুলোই মূলত গ্রুপটিকে বিপদে ফেলেছে। আর ঝুঁকি পর্যালোচনা না করে কেবল সুনামের ওপর ভিত্তি করে গ্রুপটিকে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ দিয়ে বিপদ ডেকে এনেছে ব্যাংকগুলো।

আর এক্ষেত্রে নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলেন দেশের ভালো ব্যাংক ও ভালো ব্যাংকার হিসেবে পরিচিত শীর্ষ নির্বাহীরা।বাংলাদেশ ব্যাংক ও গ্রুপটিতে অর্থায়নকারী ব্যাংকগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল শেষে সিটি গ্রুপের মোট ঋণ স্থিতি ছিল ২৪ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা। দেশি-বিদেশি মোট ৪৮টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে এ ঋণ নেওয়া হয়েছে। গ্রুপটিকে ঋণ দেওয়া শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় রয়েছে বহুজাতিক দ্য হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন (এইচএসবিসি) ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের মতো ব্যাংক। আর দেশের বেসরকারি খাতের সেরা ব্যাংকগুলোও গ্রুপটিকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে।

এ তালিকায় রয়েছে সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি), ইউসিবি ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক ও ব্যাংক এশিয়ার মতো বেসরকারি ব্যাংকগুলো। এসব ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ব্যাংকাররা দেশের ‘সেরা ব্যাংকার’ হিসেবে পরিচিত।

এর মধ্যে এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. মাহবুব উর রহমান। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ২০২০ সালের মার্চ থেকে বহুজাতিক ব্যাংকটির শীর্ষ নির্বাহীর পদে রয়েছেন তিনি। আর ২০১৭ সাল থেকে টানা নয় বছর স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের শীর্ষ নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করেছেন নাসের এজাজ বিজয়। সম্প্রতি তিনি এ পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।

দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে সিটি ব্যাংক পিএলসির এমডি ও সিইও পদে রয়েছেন মাসরুর আরেফিন। ২০১৯ সাল থেকে এ পদে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। আর ২০০৭ থেকে টানা ১৮ বছর ইস্টার্ন ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করেছেন আলী রেজা ইফতেখার। চলতি বছর তিনি ব্যাংকটি থেকে অবসরে গেছেন। আরেক জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার সেলিম আর এফ হোসেন ২০১৫ সাল থেকে টানা ১০ বছর ব্র্যাক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করেন। গত বছর তিনি ব্যাংকটি থেকে পদত্যাগ করেন। আর ২০২১ সাল-পরবর্তী সময়ে প্রাইম ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর দায়িত্বে ছিলেন হাসান ও. রশীদ।

সম্প্রতি তিনি ইস্টার্ন ব্যাংকের এমডি পদে যোগদান করেছেন। দেশের জ্যেষ্ঠ শীর্ষ নির্বাহীদের মধ্যে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে আছেন সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। ২০১৯ সাল থেকে এ পদে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। এর আগে ব্র্যাক ব্যাংক ও ঢাকা ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।

বিপুল বিনিয়োগের পরও স্থাপিত শিল্প-কারখানায় গ্যাস সংযোগ না পেয়ে সিটি গ্রুপ বড় ধরনের বিপদের মুখে পড়েছে। ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমে যাওয়ায় ৫০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গ্রুপটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নীতিসহায়তা চেয়ে আবেদন জানিয়েছে। শিল্প গ্রুপটির বিপদে পাশে দাঁড়াতে একতাবদ্ধ হয়েছেন অর্থায়নকারী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীরা। গত ১৮ জুন একসঙ্গে সিটি গ্রুপের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তারা। সেখানে সিটি গ্রুপের ঋণ পুনর্গঠনে একটি কমিটিও গঠন করা হয়।

এক্ষেত্রে শীর্ষ নির্বাহীদের বক্তব্য হলো দীর্ঘদিনের উজ্জ্বল ভাবমূর্তির কারণে ব্যাংকগুলো সিটি গ্রুপকে ঋণ দিয়েছে। এখন গ্রুপটি খেলাপি হয়ে গেলে দেশি-বিদেশি ৪৮টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিপদে পড়বে। এর মধ্যে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ও ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) মতো বৈশ্বিক উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। যে ভালো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এখন ২ শতাংশ বা তার আশপাশে, সিটি গ্রুপের ঋণ খেলাপি হলে সেটি ৫-৭ শতাংশে গিয়ে ঠেকবে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো নিজেদের স্বার্থেই সিটি গ্রুপের পাশে দাঁড়াতে চায়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকেরও ইতিবাচক সায় রয়েছে বলে জানা গেছে।

কয়েকটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী ও অতিরিক্ত বা উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২০ সাল-পরবর্তী সময়ে সিটি গ্রুপকে অতিরিক্ত ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রথম সারির কিছু ব্যাংকের অতি উৎসাহ ছিল। তারা জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি বিবেচনায় না নিয়েই গ্রুপটিকে ঋণ দিয়েছে। এক্ষেত্রে প্রকৃত বিনিয়োগ সম্ভাবনা নয়, বরং সিটি গ্রুপের নামের ওপরই ঋণ দেওয়া হয়েছে। শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর নাম দেখে ছোট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও একই পথে হেঁটেছে। আর গ্রুপটিও একসঙ্গে অনেকগুলো শিল্প-কারখানা গড়ে তুলতে গিয়ে ব্যাংকগুলোকে বিপদে জড়িয়েছে।

সিটি গ্রুপের কাছে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি ঋণ রয়েছে এইচএসবিসি ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের। এর মধ্যে এইচএসবিসির ঋণের স্থিতি এখন ২ হাজার ২৬২ কোটি টাকা। আর গ্রুপটির কাছে ২ হাজার ৭২ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের। বহুজাতিক এ দুটি ব্যাংকই এখন সিটি গ্রুপের ঋণ নিয়ে বিপাকে পড়েছে। এ ব্যাংক দুটির খেলাপি ঋণের হার এখন যৎসামান্য। সিটি গ্রুপের ঋণ খেলাপি হলে দুটি ব্যাংকেরই খেলাপি ঋণে উল্লম্ফন ঘটবে।

বিদেশি এ দুটি ব্যাংকের পাশাপাশি সিটি গ্রুপের কাছে কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের ঋণ রয়েছে ৪৬৫ কোটি টাকার। আর ব্যাংক আলফালাহ-এর ৮৪ কোটি, হাবিব ব্যাংকের ৩৫ কোটি ও উরি ব্যাংকের ২৯ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে গ্রুপটির কাছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর মধ্যে এডিবির ১১৩ কোটি, আইএফসির ১০১ কোটি ও আইসিডির ৩০৩ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে।

সিটি গ্রুপের বিপদে দেশে কার্যরত এ বিদেশি ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরেও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। গ্রুপটির ঋণ আদায় নিয়ে এইচএসবিসি, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের মতো বৈশ্বিক জায়ান্ট ব্যাংকগুলোর আঞ্চলিক কার্যালয় উদ্বিগ্ন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে আভাস মিলেছে। প্রায় নয় বছর দায়িত্ব পালন শেষে সম্প্রতি নাসের এজাজ বিজয় স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) পদ ছেড়েছেন। ২০১৭ সালে বাংলাদেশে ব্যাংকটির সিইও হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন তিনি।

নাসের এজাজ বিজয়ের পদত্যাগের পর স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সিইওর দায়িত্ব পালন করছেন মো. এনামুল হক। সিটি গ্রুপের ঋণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘১৯০৫ সাল থেকে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশে ব্যবসা করছে। আর সিটি গ্রুপের সঙ্গেও আমাদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক বহুদিনের। আমরা গ্রুপটিকে ভালো গ্রাহক হিসেবে জানি। ২০২২ সাল-পরবর্তী ডলারের বিনিময় হারজনিত ক্ষতি ও প্রতিষ্ঠাতা ফজলুর রহমানের মৃত্যুর কারণে গ্রুপটি বিপদে পড়েছে। আর পারিপার্শ্বিক অন্যান্য সংকটও ছিল। আমরা গ্রুপটির ঋণের বিষয়ে পর্যালোচনা করছি।’

দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সিটি গ্রুপে সবচেয়ে বেশি ঋণ রয়েছে সিটি ব্যাংক পিএলসির। গত এপ্রিল শেষে এ ঋণের স্থিতি ছিল ১ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা। এছাড়া ইউসিবির ১ হাজার ৫৭৯ কোটি, ইস্টার্ন ব্যাংকের ১ হাজার ৪০৭ কোটি, ব্র্যাক ব্যাংকের ১ হাজার ৭০ কোটি ও প্রাইম ব্যাংকের ১ হাজার ৩০ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। এ ব্যাংকগুলো দেশের সেরা ব্যাংক হিসেবে পরিচিত। আর ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরাও ভালো ব্যাংকার হিসেবে সমাদৃত।

প্রায় সাত বছরের বেশি সময় ধরে সিটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মাসরুর আরেফিন। তিনি ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান পদেও রয়েছেন। সিটি গ্রুপের ঋণের বিষয়ে জানতে চাইলে মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘সিটি গ্রুপের বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি একক প্রতিষ্ঠানের সংকট হিসেবে না দেখে বৃহত্তর করপোরেট ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা উচিত। দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে সিটি গ্রুপের সঙ্গে ৪৭টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা রয়েছে এবং প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক টার্নওভার ও ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান এর সঙ্গে জড়িত। তাই বিষয়টি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।’

এতগুলো ব্যাংক একযোগে সিটি গ্রুপকে অর্থায়নের বিষয়ে মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘এটি কোনোভাবেই বাংলাদেশের ব্যাংকিং মডেল বা ব্যাংকিং ব্যবস্থার কাঠামোগত ব্যর্থতা নয়। বরং বাংলাদেশের আর্থিক খাতের বাস্তবতায় ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরে এমন অনেক দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগে অর্থায়ন করে আসছে, যেগুলোর অর্থায়নের একটি বড় অংশ আদর্শভাবে শক্তিশালী পুঁজিবাজার থেকে আসার কথা। কিন্তু দেশে দীর্ঘমেয়াদি করপোরেট অর্থায়নের জন্য পর্যাপ্ত ও শক্তিশালী পুঁজিবাজার এখনো গড়ে না ওঠায় ব্যাংকগুলোকেই সেই ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে। এখন ৩৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংক সমন্বিতভাবে গ্রুপটির ব্যবসা পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সংরক্ষণ এবং দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল সচল রাখার লক্ষ্যে কাজ করছে। এ অভিজ্ঞতা থেকে গ্রুপ এক্সপোজার, নগদ প্রবাহ বিশ্লেষণ, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং আন্তঃব্যাংক সমন্বয় আরো শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সহযোগিতায় এ সংকটের সফল সমাধান এবং ব্যবসা পুনরুদ্ধার সম্ভব বলে আমি আশাবাদী।’

সিটি গ্রুপ যে বিপদে পড়তে যাচ্ছে, সেটি আগেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বলে জানান এ শীর্ষ নির্বাহী। তিনি বলেন, ‘আমি বিপদ টের পাচ্ছিলাম। বড় বড় প্রজেক্ট হচ্ছে কিন্তু সেগুলো থেকে রেভিনিউ আসছে না, এটা যে বিপদের তা বোঝা যাচ্ছিল।’

অবশ্য ব্র্যাক ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলছেন, ‘ব্যাংকগুলোকে তাদের অনুমোদিত ঋণনীতি ও বিচক্ষণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা অনুসরণ করে প্রতিটি ঋণ প্রস্তাবের একটি পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করতে হবে। কোনো গ্রাহকের অতীত সম্পর্ক, সুনাম বা দীর্ঘদিনের পরিচিতির ভিত্তিতে নয়; বরং ঋণগ্রহীতার বর্তমান আর্থিক সক্ষমতা, নগদ অর্থ প্রবাহ (ক্যাশ ফ্লো) তৈরি করার সামর্থ্য, সুশাসনের মান, সংশ্লিষ্ট শিল্প খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং সামগ্রিক ঝুঁকি বিবেচনা করে তার ঋণ গ্রহণের সক্ষমতা নির্ধারণ করা উচিত। একই সঙ্গে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোরও নিজ নিজ আর্থিক অবস্থান, ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ফলাফল, সম্ভাব্য দায় (কনটিনজেন্ট লায়াবিলিটি) এবং উদীয়মান ঝুঁকি সম্পর্কে সম্পূর্ণ, সঠিক ও সময়োপযোগী তথ্য প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। স্বচ্ছতা ও তথ্য প্রদানে সততা বজায় রাখা যথাযথ ঋণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং একটি টেকসই ব্যাংকিং সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য অপরিহার্য।’

সিটি গ্রুপের কাছে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ঋণ রয়েছে ৯৬৪ কোটি টাকা। এছাড়া ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ৯৪৬ কোটি, পূবালী ব্যাংকের ৯১৩ কোটি, ব্যাংক এশিয়ার ৯০৮ কোটি, সাউথইস্ট ব্যাংকের ৮১৮ কোটি, ওয়ান ব্যাংকের ৭৪৩ কোটি, এনসিসি ব্যাংকের ৭৩৩ কোটি, ঢাকা ব্যাংকের ৭০৪ কোটি, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ৬৯৬ কোটি, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ৬৪৯ কোটি, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের ৬২২ কোটি, ট্রাস্ট ব্যাংকের ৫৯০ কোটি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ৪৮৩ কোটি, মেঘনা ব্যাংকের ২৩২ কোটি, উত্তরা ব্যাংকের ২০৬ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে গ্রুপটিতে। এর বাইরে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ১৮৬ কোটি, মিডল্যান্ড ব্যাংকের ১৬৭ কোটি, সোনালী ব্যাংকের ১০০ কোটি, কমিউনিটি ব্যাংকের ৯৬ কোটি, এনআরবি ব্যাংকের ৭৫ কোটি, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের ৭৩ কোটি, সীমান্ত ব্যাংকের ৬৮ কোটি, রূপালী ব্যাংকের ৫১ কোটি, সিটিজেন্স ব্যাংকের ৪৭ কোটি, এনআরবিসি ব্যাংকের ৪৫ কোটি ও এক্সিম ব্যাংকের ৩২ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আইডিএলসির ৪৯৪ কোটি, ইডকলের ২৬৮ কোটি, বিআইএফএফএলের ২১০ কোটি, আইপিডিসির ১৫০ কোটি, লংকাবাংলা ফাইন্যান্সের ১১৯ কোটি, সাবিনকোর ৮০ কোটি, অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্সের ৪৫ কোটি ও ইউনাইটেড ফাইন্যান্সের ৩৪ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে সিটি গ্রুপে।

গ্যাসের সংকটের মধ্যেও সিটি গ্রুপের একসঙ্গে ছয়টি বৃহৎ কারখানা স্থাপন ও ব্যাংকগুলোর অর্থায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ব্যাংকার হিসাবে আমরা অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে প্রতিষ্ঠিত শিল্প-কারখানায় অর্থায়নে গুরুত্ব দেই। আমরা মনে করি, গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগ আগে এ ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানে দেয়া হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য বিগত সরকার কেবল নামেই অর্থনৈতিক অঞ্চলের লাইসেন্স দিয়েছে। গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগ দেবে বলে টাকা নিয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই করেনি। এটি উদ্যোক্তা ও ব্যাংকারদের ব্যর্থতার চেয়েও বিগত সরকারের বড় ব্যর্থতা।’

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান আরো বলেন, ‘এটি স্বীকার করতে বাধা নেই যে সিটি গ্রুপকে আমরা হয়তো বেশি ঋণ দিয়েছি। এতগুলো ব্যাংক একসঙ্গে ঋণ না দিলেও হতো। আবার গ্রুপটিও একসঙ্গে এতগুলো কারখানা নির্মাণ না করলে পারত। আবার এটিও দেখতে হবে, দেশে ঋণ দেয়ার মতো ভালো কোম্পানি খুব বেশি নেই। ছোট একটি অর্থনীতির দেশে ৬২টি ব্যাংক ও ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতা করছে।’

সিটি গ্রুপ দেশের ভোগ্যপণ্য বাজারের শীর্ষস্থানীয় কনগ্লোমারেট হিসেবে পরিচিত। গ্রুপটির প্রতিষ্ঠাতা ফজলুর রহমান ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রয়াত হন। কর্মস্পৃহা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য এ শিল্প উদ্যোক্তা দেশের ব্যাংকিং ও করপোরেট জগতের চোখে এক সম্মানীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। দেশের শিল্পায়নে তার অবদানকে স্মরণ করেন সংশ্লিষ্টরা। স্বাধীনতা-পরবর্তী পাঁচ দশকে সিটি গ্রুপের অংশ হিসেবে ৪০টিরও বেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন তিনি। ভোজ্যতেল ও চিনি পরিশোধন, চাল-ডাল, আটা-ময়দা, প্রক্রিয়াজাত খাবার, পোলট্রি খাদ্য, জাহাজ নির্মাণ, চা বাগান, ব্যাংক ও বীমা, হাসপাতালসহ বিভিন্ন খাতে এ গ্রুপের ব্যবসা বিস্তৃত। এ গ্রুপের তিনটি অর্থনৈতিক জোন ও একটি হাই-টেক পার্কও রয়েছে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় এ শিল্প গ্রুপটি নিয়ে গত ৬ মে একটি জাতীয় দৈনিকে ‘‍আর্থিক চাপ সামলাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সহায়তা চাইল ‘‍সিটি গ্রুপ’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশ হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠার পর ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করা সিটি গ্রুপ আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে। বৈশ্বিক ও স্থানীয় নানা সংকটের কারণে গ্রুপের কোম্পানিগুলোর ব্যাংক ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে নীতিসহায়তা চেয়ে লিখিত আবেদন করেছে গ্রুপটি। আবেদনে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঋণ শ্রেণীকরণ (খেলাপি) না করাসহ সাত ধরনের নীতিসহায়তা চাওয়া হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বরাবর লেখা আবেদনে সিটি গ্রুপ উল্লেখ করে, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে টানা ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সিটি গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো কখনো খেলাপি হয়নি। এমনকি ব্যাংকের ঋণের কিস্তি পরিশোধেও কোনো বিলম্ব ছিল না। কিন্তু চার বছর ধরে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের প্রভাবে গ্রুপটি তীব্র আর্থিক ও পরিচালনাগত চাপের মুখে পড়েছে। এটি সিটি গ্রুপের নগদ প্রবাহ ও ঋণ পরিশোধ সক্ষমতাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে। এ কারণে গ্রুপটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নীতিসহায়তা চাইতে বাধ্য হয়েছে।

ওই চিঠিতে সিটি গ্রুপ জানায়, ‘তীর’, ‘সান’ ও ‘ন্যাচারাল’সহ পরিচিত ব্র্যান্ডগুলোর মাধ্যমে সিটি গ্রুপ জাতীয় চাহিদার একটি বড় অংশ সরবরাহ করে। প্রায় ৩৫ শতাংশ ভোজ্যতেল, ৪০ শতাংশ চিনি, ২৫ শতাংশ আটা সরবরাহ এবং বিস্তৃত সরবরাহকারী ও পরিবেশক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মূল্য স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা বার্ষিক টার্নওভারের সিটি গ্রুপ সরাসরি প্রায় ২৫ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি কৃষক, সরবরাহকারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের একটি বৃহৎ ইকোসিস্টেমকে টিকিয়ে রাখছে। দেশব্যাপী ১ হাজার ৫০০ সরবরাহকারী, ৩ হাজার ৫০০ পরিবেশক এবং ১০ লক্ষাধিক খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ী এ গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত।

সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাইলে সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান বলেন, গত ১৮ জুন ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে আমরা বৈঠক করেছি। ওই বৈঠকে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। বৈঠকের পর্যালোচনা ও সুপারিশের ভিত্তিতে আমরা কিছু কাজ এগিয়ে নিচ্ছি।

হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে একসঙ্গে বেশ কয়েকটি শিল্প-কারখানা গড়ে তোলা ও এতগুলো ব্যাংক থেকে একসঙ্গে ঋণ নেওয়া ভুল সিদ্ধান্ত ছিল কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে মো. হাসান বলেন, ‘এদেশে ব্যাংক ছাড়া অর্থায়নের জন্য বিকল্প তেমন কোনো উৎস নেই। বিশ্বের প্রায় সব দেশে উদ্যোক্তারা পুঁজিবাজার থেকে তহবিল সংগ্রহ করে বিনিয়োগ করে। কিন্তু আমাদের পুঁজিবাজারে এ সুযোগ একেবারেই সীমিত। ব্যাংকগুলোর একক গ্রাহককে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ আছে। এ কারণে চাইলেও এক ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেয়া যায়নি। আর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর অর্থায়নের সক্ষমতাও দুর্বল হয়ে গেছে। ডলারের বিনিময় হারে অস্থিরতা, সুদহার বেড়ে যাওয়া ও হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে গ্যাসের সংযোগ না পাওয়ার কারণে সিটি গ্রুপ আজকের পরিস্থিতিতে এসে দাঁড়িয়েছে।’

তথ্য সূত্র : বণিক বার্তা

logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram