ঢাকা
logo
প্রকাশিত : August 9, 2026

হোর্হে মেসি— বাবা তো বটেই, লিওর ফুটবলীয় ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় প্রভাবক ছিলেন যিনি

বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হয়ে ওঠার নেপথ্যে যেমন ছিল লিও মেসির প্রতিভা ও পরিশ্রম, তেমনই ছিল বাবার অবিচল সমর্থন, দূরদৃষ্টি এবং সঠিক সময়ে নেওয়া কঠিন সিদ্ধান্ত। ৬৮ বছর বয়সে হোর্হে মেসির প্রয়াণে তাই মেসি পরিবারের পাশাপাশি শোকের ছায়া নেমে এসেছে ফুটবল বিশ্বেও। ছেলেবেলার সবচেয়ে বড় ভরসা, কঠিন সময়ে পাশে থাকা, বাবা থেকে এজেন্ট হয়ে ওঠা, বার্সা-পিএসজি-মায়ামি পর্ব কিংবা মেসির সবচেয়ে বড় সমর্থক— তার বাবা হোর্হে রয়েছেন সবখানে।

ফুটবল মাঠের সবুজ গালিচায় লিওনেল মেসির জাদুকরী পায়ের কারুকার্য দেখে মুগ্ধ হয়নি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। একের পর এক রেকর্ড, অসংখ্য শিরোপা আর অতুলনীয় ফুটবলশৈলীতে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে। কিন্তু এই মহাতারকার গল্পের শুরুটা কেমন ছিল?

রোজারিওর সেই ছোট্ট ছেলেটির বিশ্বজয়ের হাতেখড়ি শুরু হয়েছিল যেভাবে, তার অন্যতম অনুঘটক ছিল বাবা হোর্হের ফুটবলীয় আগ্রহ। ফুটবল ছিল মেসি ও তার বাবার সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেতু। হোর্হে নিজেও ফুটবল দেখতে ও খেলতে ভালোবাসেন।

সন্তানের প্রতিভাকে বিকশিত করার সুযোগ করে দিতে নিজের জীবনের বড় একটি অংশ উৎসর্গ করেছিলেন হোর্হে। কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং ছেলের প্রতি অবিচল বিশ্বাস— সবকিছু মিলিয়েই তিনি ছিলেন মেসির পথচলার অন্যতম প্রধান সহযাত্রী।

২০০২ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে মেসি তখনও আর্জেন্টিনার ফুটবল মহলে খুব পরিচিত নাম ছিলেন না। সেই সময় হোর্হে মেসি তার ছেলের প্রথম এজেন্ট হোরাসিও গাজ্জিওলিকে একটি বিশেষ অনুরোধ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আর্জেন্টিনা জাতীয় দল আসছে। লিওর খেলার ভিডিও কি তাদের দেখানো যায় না?’

বার্সার তৈরি একটি ভিডিও ক্যাসেট নিয়ে গাজ্জিওলি পৌঁছে যান আর্জেন্টিনা দলের শিবিরে। প্রথমে ভিডিওটি দেখানো হয় মার্সেলো বিয়েলসার সহকারী ক্লদিও ভিভাসকে। পরে বিয়েলসাও সেটি দেখে মুগ্ধ হন। এর পর সেটি পৌঁছায় আর্জেন্টিনা অ-২০ দলের কোচ উগো টোকাল্লির কাছে।

কয়েকটি ক্লিপ দেখেই টোকাল্লি বুঝে যান, এই ছেলের মধ্যে অসাধারণ কিছু আছে। তিনি কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন, ‘বার্সেলোনার সেই ছেলেটিকে আমার দরকার।’

মাঠে মেসি যখন একের পর এক গোল করে আলো ছড়িয়েছেন, তখন আড়ালে থেকে তাকে আরও ভালো হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তার বাবা। জন্মদাতা তো বটেই, ছিলেন মেন্টর, সমালোচক এবং সবচেয়ে বড় আশ্রয়। বাবার কাছ থেকে পাওয়া সেই শিক্ষা আজও নিজের সন্তানদের বড় করার ক্ষেত্রে অনুসরণ করেন লিও।

বাবাকে নিয়ে মেসির নানা স্মৃতিচারণ উঠে এসেছে আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম ‘ওলে’-তে। সেখানে বাবার কঠোর সমালোচনা, কর্মব্যস্ত জীবন, ফুটবল নিয়ে তাদের আলোচনা এবং নিজের উন্নতির পেছনে বাবার ভূমিকার কথা বলেছেন লিও মেসি। হোর্হের গঠনমূলক সমালোচনার কথা বলতে গিয়ে মেসি বলেন, ‘আমার বাবা আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন। তিনি আমার ব্যাপারে ভীষণ কঠোর সমালোচক ছিলেন। সেটিই আমাকে সবসময় আরও ভালো করার তাগিদ দিত। অবশ্য তিনি জানতেন, আমি নিজেই নিজের সবচেয়ে বড় সমালোচক।’

হোর্হের কঠোর পরিশ্রমের কথাও স্মরণ করেছেন মেসি। তিনি বলেন, বাবার অনেক স্বভাবই নিজের মধ্যে পেয়েছেন। তবে কাজের ব্যস্ততার কারণে বাবাকে খুব বেশি সময় কাছে পেতেন না।

লিওর ভাষায়, ‘উনি সারাদিন কাজ করতেন বলে আমাদের সঙ্গে খুব বেশি সময় কাটাতে পারতেন না। ভোর ৪টায় উঠতেন এবং রাতের খাবারের সময় বাড়ি ফিরতেন। যখনই দেখা হতো, উনি সেই সময়টা বেশ উপভোগ করতেন। কখনো আমার ওপর চিৎকার পর্যন্ত করেননি। আমি ওনাকে খুব মিস করতাম।’

নিজ পরিবারে বাবা-মায়ের সেই জীবনযাপন মেসির ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। নিজের সন্তানদের সঙ্গে বেশি সময় কাটাতে পারাকে তাই সৌভাগ্য মনে করেন তিনি। সন্তানদের মানুষ করার ক্ষেত্রে নিজের বাবা-মায়ের কাছ থেকেই শেখার চেষ্টা করেন বলেও জানিয়েছেন মেসি।

বাবার কঠোরতার পাশাপাশি মায়ের ভালোবাসার কথাও স্মরণ করেছেন মেসি। তার ভাষায়, ‘আমার মায়ের কাছে আমিই সবসময় সেরা—এমনকি আমি যখন জঘন্য খেলতাম তখনও! মায়ের চোখে আমি প্রতিটি ম্যাচেই দুর্দান্ত খেলি, কোনো কিছুতেই আমার দোষ থাকে না। আর দশটা মায়ের মতোই উনি।’

মেসি বলেন, ‘হোর্হে ফুটবল দেখতে ও খেলতে ভীষণ ভালোবাসেন। আমার সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করেন। বার্সেলোনা এবং জাতীয় দলের হয়ে আমার ম্যাচগুলো নিয়ে আমাদের কথা হয়, ব্যাস অতটুকুই। তিনি ফুটবল ভালোই বোঝেন। ব্যক্তিজীবন এবং দলগতভাবে— দুই ক্ষেত্রেই আমরা বিষয়গুলোকে বেশ একইভাবে দেখি।’

দিনদিন লিও যত বড় তারকা হয়েছেন, বাবার চোখে ততটা ছাড় পাননি। বরং দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পরও হোর্হে তাকে ভুলগুলো মনে করিয়ে দিতেন।

স্মৃতির আয়নায় মেসি এমনটাই দেখেন, ‘ধরা যাক আমি একটা অসাধারণ ম্যাচ খেলেছি, তবুও তিনি আমাকে বলতেন, ‘তুই তো একটা সুযোগ মিস করেছিস!’ এই বলে আমাকে একটু খেপিয়ে দিতেন। এতে আমার ভালোই লাগত। নিজের ভুল শুধরে আরও ভালো করার জেদ বা তাগিদ পেতাম। আমরা দুজনেই নিজের কাজের কঠোর সমালোচক।’

মেসির কিংবদন্তি হয়ে ওঠার গল্পে তাই গোল, শিরোপা কিংবা ব্যক্তিগত পুরস্কারের পাশাপাশি জড়িয়ে আছে একজন বাবার নীরব ত্যাগের গল্পও। হোর্হে মেসির কঠোর পরিশ্রম, সমালোচনা ও নিরন্তর সমর্থন ছোট্ট লিওনেলকে ধীরে ধীরে পরিণত করেছে বিশ্ব ফুটবলের মহাতারকায়। মাঠের বাইরে বাবার সেই ছায়া আজও মেসির স্মৃতিতে অমলিন।

হোর্হে মেসি ছিলেন লিওর প্রথম দিকের পথপ্রদর্শক, প্রতিনিধি এবং সবচেয়ে কঠিন সময়ে পাশে থাকা মানুষ। ছোট্ট রোজারিও থেকে বিশ্বফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে পৌঁছনোর যাত্রায় তার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। মেসির কিংবদন্তি হয়ে ওঠার গল্পে তাই তার বাবার নামও চিরকাল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।

লিও মেসির বায়োপিক সিনেমা, বায়োগ্রাফি অথবা নিজ হাতে লেখা অটোবায়োগ্রাফি যদি কোনদিন আসে; একটি দৃশ্য, পরিচ্ছেদ কিংবা অধ্যায় নয়— বড় জায়গা জুড়ে থাকবেন হোর্হে।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram