

বিদেশি কারিকুলামে দেশে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো নিয়মের মধ্যে আনতে নীতিমালা করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা ও আইনের অভাবকে কাজে লাগিয়ে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল কর্তৃপক্ষ এতদিন ইচ্ছেমতো চললেও এবার সেই সুযোগ বন্ধ হচ্ছে। জানা গেছে, নীতিমালায় যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্তি হচ্ছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হবে। বর্তমানে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর ৭০ ভাগেরই নিবন্ধন নেই।
এদিকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষাপঞ্জি-টিউশন ফি-ছুটি নির্ধারণ করে দেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোন খাতে কত টাকা ফি আদায় করা হবে, তাও ঠিক করে দেওয়া হবে। নিয়মিত ম্যানেজিং কমিটি গঠন করতে হবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে। কমিটি প্রতিষ্ঠান প্রধানকে নিয়ে ব্যয়-বিবরণী তৈরি করবে। প্রতি অর্থবছর শেষে হিসাব নিরীক্ষা সম্পাদন করে সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠাতে হবে। নিবন্ধন, আয় ব্যয়ের হিসাব দেওয়া থেকে শুরু করে সব কাজে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন শিক্ষা অধিদপ্তর ও শিক্ষা বোর্ড।
জানা গেছে, গত ১৯ ফেব্রুয়ারি শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর জন্য নীতিমালা প্রণয়ণের নির্দেশ দেন। ঐ দিন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে প্রেস ব্রিফিংয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘অতীতে শিক্ষাব্যবস্থায় ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ধর্মীয় বিষয়গুলোর গুরুত্ব বাড়ানো হলেও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোকে নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মধ্যে আনা সম্ভব হয়নি। এবার এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে আনার কার্যকর ব্যবস্থা করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেই সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন থাকতে হবে। একই রাষ্ট্রে ভিন্ন নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা থাকা যুক্তিসংগত নয়। কেমব্রিজ ও ব্রিটিশ কাউন্সিলের মতো আন্তর্জাতিক কারিকুলাম অনুমোদিত হলেও সেগুলোকেও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মধ্যে আনার বিষয়ে ভবিষ্যতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ গত রবিবার শিক্ষামন্ত্রী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন এবং কোচিং সেন্টারের জন্য নীতিমালা সংক্রান্ত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোর প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে আলোচনা করে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের জন্য নীতিমালার খসড়া করা হয়। বর্তমানে খসড়ায় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হচ্ছে। ৭০০ জন বা তার বেশি শিক্ষার্থী, মানসম্মত শিক্ষক, শিক্ষা উপযোগী অবকাঠামোসহ আনুষঙ্গিক সুবিধা থাকলে তা ‘এ’ শ্রেণিতে পড়বে। ৪০০ থেকে ৭০০ শিক্ষার্থী থাকলে তা ‘বি’ শ্রেণিতে পড়বে। ৪০০ জনের নিচে শিক্ষার্থী থাকলে তা ‘সি’ শ্রেণিতে পড়বে।
অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর ৯৯ ভাগ বাংলাদেশি: ইংলিশ মিডিয়াম ও ইন্টারন্যাশনাল স্কুল দেশের শিক্ষা খাতের বড় একটি অংশ হলেও এর নিয়ন্ত্রণ নেই সরকারের হাতে। নেই কোনো সুস্পষ্ট নীতিমালা ও তদারকি প্রতিষ্ঠান। স্কুলগুলোতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর ৯৯ ভাগ বাংলাদেশি হলেও সেখানে কী পড়ানো হচ্ছে, কারা শিক্ষক, টিউশন ফি ও ভর্তি ফি কত তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই মন্ত্রণালয় বা সরকারের কোনো সংস্থার কাছে।
অনেক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষার্থীরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের নাম জানলেও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর নাম জানে না: বিগত দিনে কয়েকটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে। আবার কিছু প্রতিবেদনে উঠে আসে অনেক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষার্থীরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের নাম জানলেও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর নাম জানে না। তারা জানে না স্বাধীনতা বা বিজয় দিবস কী অথবা জাতীয় সংগীতের কত চরণ গাওয়া হয়। এছাড়া বছর বছর বেতন বৃদ্ধি ও বিভিন্ন ফির নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ায় অনেক বার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এসেছেন অভিভাবকরা। এসব নিয়ে সমালোচনার মুখে কয়েক বার ইংলিশ মিডিয়াম নিয়ে নীতিমালা তৈরি ও তদারকির উদ্যোগ নেওয়া হয়। দফায় দফায় সরকারের উচ্চপর্যায়ে বৈঠক হয়। গঠন করা হয় টাস্কফোর্স। তবে, অজ্ঞাত কারণে কোনোভাবেই ইংলিশ মিডিয়ামের লাগাম টানা যায়নি। রাজধানীর কয়েকটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের স্ট্যান্ডার্ড সিক্সের ভূগোল বই নিয়ে দেখা যায়, সেখানে আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ার ভৌগোলিক অবস্থার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। আবার ইতিহাস বইতে রয়েছে আমেরিকা মহাদেশের ইতিহাস। কীভাবে আমেরিকা সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটেছে সেটাই পড়ানো হয়। কয়েকটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল বাংলা বই পড়ায়। বাংলা বইয়ের চার থেকে পাঁচটি গল্প-কবিতা পড়িয়েই সিলেবাস শেষ করা হয়। এছাড়া বাংলা ভাষার অন্য কোনো বই নেই। শিশুদের ওপর অতিরিক্ত বইয়ের বোঝাও এসব স্কুলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। স্ট্যান্ডার্ড ওয়ানের শিক্ষার্থীদের পডানো হয় ১২ থেকে ১৪টি বই।
নিবন্ধন নেই ৭০ ভাগ প্রতিষ্ঠানের: সারা দেশের অলিতে-গলিতে গড়ে উঠেছে ইংলিশ মিডিয়াম বা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল নামধারী হাজারও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হলেও শতকরা ৭০ ভাগের বেশি প্রতিষ্ঠানেরই তা নেই। ‘রেজিস্ট্রেশন অব প্রাইভেট স্কুলস অর্ডিন্যান্স, ১৯৬২’-এর অধীনে ২০০৭ সাল থেকে একটি নীতিমালায় বেসরকারি (ইংরেজি মাধ্যম) বিদ্যালয়ের সাময়িক নিবন্ধন প্রদান শুরু হয়। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবের খাতায় দেশে এখন পর্যন্ত ১৫৯টি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের নিবন্ধন রয়েছে এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬৪ হাজার ৫০৭ জন। অন্যদিকে বাংলাদেশ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে সারা দেশে এ ধরনের স্কুলের সংখ্যা প্রায় ৩০০। শিক্ষার্থী প্রায় ৩ লাখ। আবার বেসরকারি নানা সূত্রের হিসাবে সারা দেশে এমন স্কুলের সংখ্যা সাড়ে ২৮ হাজারের ওপরে।
লাগামহীন ফিতে দিশাহারা অভিভাবক: নিয়ন্ত্রণ না থাকায় ভর্তি ফি, টিউশন ফি ও নানা অজুহাতে অভিভাবকদের থেকে লাগামহীনভাবে অর্থ আদায় করছে ইংলিশ মিডিয়ামগুলো। ধরনভেদে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি ফি ৫০ হাজার থেকে সাড়ে ৬ লাখ টাকা। টিউশন ফি বার্ষিক ৩০ হাজার থেকে ২৬ লাখ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া রয়েছে ভর্তি ফরম, ইন্টারনেট চার্জ, উন্নয়ন ফি, কম্পিউটার ল্যাব চার্জ, ডায়ারি, আইডি কার্ড, বই, এক্সারসাইজ বুক, স্টেশনারি ফিসহ হরেক খাত। প্রতি বছরই এ খাতগুলোয় টাকার অঙ্ক লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে। এ নিয়ে অভিভাবকদের হাজারো অভিযোগ থাকলেও এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অবশেষে আদালত পর্যন্ত গড়ায় বিষয়টি। ২০১৭ সালের মে মাসে আদালত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পুনঃ ভর্তি ফি না নেওয়ার নির্দেশ দিলে স্কুলগুলো চতুরতার সঙ্গে সেশন ফি বাদ দিয়ে টিউশন ফি ও অন্যান্য নানা ফি বাড়িয়ে দেয়। ফলে আদালতের নির্দেশ থাকলেও শিক্ষার খরচ কমেনি এতটুকুও।
মানছে না হাইকোর্টের নির্দেশনা: ২০১৭ সালের মে মাসে আদালত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল নিয়ে কিছু নির্দেশনা দেয়। এতে বলা হয়—অভিভাবকদের সব পক্ষের অংশগ্রহণে গণতান্ত্রিকভাবে ম্যানেজিং কমিটি গঠন, বিভিন্ন ফি ও স্কুলের যাবতীয় খরচ নির্ধারণ করবে ম্যানেজিং কমিটি। পরবর্তী ক্লাসে ওঠার সময় সেশন ফি বা অন্য যে কোনো ফি নেওয়া যাবে না। শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা থাকতে হবে। পাঠ্যবইয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, স্বাধীনতাযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় সম্পর্কে অভিভাবকদের অডিট রিপোর্ট প্রদান করতে হবে। রাজধানীর অধিকাংশ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে এ নির্দেশনা মানা হচ্ছে না বলে অভিভাবকদের অভিযোগ।

