

নুরুল ইসলাম আসাদ, উজিরপুর (বরিশাল) প্রতিনিধি: উন্নয়ন আর স্মার্ট নাগরিক সেবার নানা প্রতিশ্রুতির মধ্যেও বরিশালের উজিরপুর পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক আজও অবহেলার নির্মম সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বীরেন মিস্ত্রির বাড়ি থেকে হুমায়ুন হাওলাদারের বাড়ির পাশের ভাঙা কালভার্ট পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার সড়কটি বছরের পর বছর সংস্কারের অপেক্ষায় পড়ে আছে। বাস্তবে এটি এখন আর সড়ক নয়, বরং গর্ত, কাদা, ঝোপঝাড় আর ভাঙাচোরা মাটির এক বিপজ্জনক জনপথ। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার অনেক অংশে কোথায় রাস্তা শেষ হয়েছে আর কোথায় পাশের জমি শুরু হয়েছে, তা বোঝারও উপায় নেই।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুষ্ক মৌসুমেও এই সড়ক দিয়ে একটি সাইকেল চালিয়ে নিরাপদে চলাচল করা প্রায় অসম্ভব। বর্ষা শুরু হলেই পুরো রাস্তা কাদা ও পানিতে তলিয়ে যায়। তখন অটোরিকশা, ভ্যান কিংবা মোটরসাইকেল কোনো যানবাহনই এই পথে চলতে চায় না। সন্ধ্যার পর পুরো এলাকায় নেমে আসে ঘন অন্ধকার। কারণ, দীর্ঘ সড়কজুড়ে নেই একটি ল্যাম্পপোস্টও। এতে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের চলাচল আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ধামুরা-পরমানন্দশাহা এলাকার হাজার হাজার মানুষের উপজেলা সদর, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও সরকারি অফিসে যাতায়াতের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ এটি। কিন্তু অবহেলার কারণে প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। স্থানীয়রা জানান, বছরের পর বছর ধরে জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার আবেদন জানানো হলেও দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন হয়নি। ফলে দিন দিন সড়কটির অবস্থা আরও নাজুক হয়ে পড়ছে।
সবচেয়ে করুণ চিত্র দেখা যায় জরুরি স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে। অসুস্থ রোগী, গর্ভবতী নারী কিংবা বৃদ্ধ মানুষকে হাসপাতালে নিতে হলে অ্যাম্বুলেন্স তো দূরের কথা, সাধারণ যানবাহনও প্রবেশ করতে পারে না। অনেক সময় রোগীকে কাঁধে তুলে, কোলে নিয়ে কিংবা হেঁটে প্রধান সড়ক পর্যন্ত পৌঁছে দিতে হয়। স্থানীয়দের ভাষায়, এই দুর্ভোগ শুধু কষ্টের নয়, অনেক সময় জীবন-মৃত্যুর প্রশ্নও হয়ে দাঁড়ায়।
সরেজমিনে কথা হয় পথচারী মো. রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, "এই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন চলতে গিয়ে মনে হয় দুর্ঘটনা নিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে। বর্ষাকালে কাদায় পড়ে আহত হওয়া এখন সাধারণ ঘটনা। উন্নয়নের এত কথা শুনি, কিন্তু আমাদের এই রাস্তার দিকে কেউ তাকায় না।"
আরেক পথচারী রহিমা বেগম বলেন, "রাতে অসুস্থ মানুষ নিয়ে বের হলে সবচেয়ে বেশি ভয় লাগে। গাড়ি আসে না, কাঁধে করে রোগী নিয়ে যেতে হয়। সন্তানদের স্কুলে পাঠাতেও ভয় হয়। আমরা বিলাসিতা চাই না, শুধু নিরাপদে চলার মতো একটি রাস্তা চাই।"
উজিরপুর পৌর বিএনপির সহ-সভাপতি মো. হেমায়েত উদ্দিন খলিফা বলেন, "এটি কোনো রাজনৈতিক দাবি নয়, এটি মানুষের মৌলিক নাগরিক অধিকার। এই সড়কের সঙ্গে হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা, চিকিৎসা ও শিক্ষার বিষয় জড়িয়ে রয়েছে। আমরা পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জোর দাবি জানাই, দ্রুত আরসিসি ঢালাইয়ের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে সড়কটি নির্মাণ করা হোক। মানুষের দুর্ভোগ আর দীর্ঘায়িত করা উচিত নয়।"
স্থানীয় অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য আবু সালেহ বেপারি বলেন, "একটি পৌর এলাকার ভেতরে এমন চলাচল-অযোগ্য রাস্তা সত্যিই দুঃখজনক। দীর্ঘদিনের অবহেলায় রাস্তার অস্তিত্বই আজ সংকটে। দ্রুত সংস্কার না হলে ভবিষ্যতে এই এলাকায় মানুষের বসবাস কমে যেতে পারে। আমরা চাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।"
সাংবাদিকদের সরেজমিন পরিদর্শনের সময় স্থানীয়দের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন বিড়ি শ্রমিক দলের সভাপতি কালাম হাওলাদার, ১ নম্বর ওয়ার্ড মহিলা দলের সভানেত্রী তাসলিমা বেগমসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। তারা সবাই একবাক্যে বলেন, এই সড়কটি শুধু একটি যোগাযোগপথ নয়, এটি হাজারো মানুষের জীবনরেখা। তাই আর কোনো আশ্বাস নয়, দ্রুত বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ এবং আরসিসি ঢালাইয়ের মাধ্যমে স্থায়ী সংস্কারই এখন সময়ের দাবি।
এ বিষয়ে এলাকাবাসী উজিরপুর পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের আশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত সড়কটি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করবেন। কারণ একটি পৌর এলাকার মানুষ বছরের পর বছর এমন মানবেতর দুর্ভোগে থাকবে, এটি কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
