

মনিরুজ্জামান মনির, ভূরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি: সারা দেশের ন্যায় কুড়িগ্রাম জেলার শস্য ভান্ডার খ্যাত ভূরুঙ্গামারী উপজেলাতেও সরকারিভাবে সরাসরি 'কৃষকের অ্যাপ’-এর (ডিজিটাল) মাধ্যমে ধান সংগ্রহ করা হবে। কিন্তু মাঠ পর্যায় সরকারি এই 'কৃষক অ্যাপ' সম্পর্কে পুরোপুরি ধারণা নেই অনেক কৃষকের।
উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কথা হয় কৃষকদের সাথে। তাদের ভাষ্য, এখনো গ্রামের অনেক কৃষকের সরকারি এই অ্যাপ বিষয়ে নেই কোন ধারণা। আবার কেউ জানেন না কীভাবে আবেদন করতে হয়। কোন কোন কৃষক বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সরকারের এই ডিজিটাল পদ্ধতিতে ধান কেনার কথা শুনে।
উপজেলা খাদ্য বিভাগের দেওয়া তথ্য মতে, চলতি ইরি-বোরো মৌসুমে ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় কৃষকদের কাছ থেকে ১ হাজার ৬৮৩ মেট্রিক টন ইরি-বোরো ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যার সরকারি মূল্য ধরা হয়েছে কেজি প্রতি ৩৬ টাকা। যাতে প্রতিমণ ধানের মূল্য ১ হাজার ৪৪০ টাকা।
সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ কার্যক্রমের নিবন্ধন শুরু হয়েছে চলতি মাসের ৫ মে থেকে। যা আগামী ২০ মে পর্যন্ত চলবে। প্রয়োজন হলে সময় আরও বাড়ানো হতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কৃষকদের ভোগান্তি ও অনিয়ম ঠেকাতে ২০১৯ সালে এই অ্যাপ চালু করে খাদ্য বিভাগ। পরীক্ষামূলকভাবে প্রথমে দেশের ৮টি বিভাগের ১৬টি উপজেলায় কার্যক্রম শুরু করা হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে দেশের সব উপজেলায় এ কার্যক্রম চালু করে সরকার।
উপজেলা কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১০টি ইউনিয়নে ১৬ হাজার ৪৮৫ হেক্টর জমিতে ধান চাষ করা হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার ৩৪১ মেট্রিক টন। আর সরকারিভাবে ধান ক্রয় করা হবে ১ হাজার ৬৮৩ মেট্রিক টন।
জানা যায়, গুগল প্লেস্টোর থেকে অ্যাপ ডাউনলোড দিয়ে সেই কৃষক অ্যাপে নিজের জমির তথ্য, জাতীয় পরিচয়পত্র, কৃষক কার্ডের তথ্য ও সচল মোবাইল দিয়ে আবেদন করত হবে। পরে এই সব তথ্য যাচাই করে উপজেলা প্রশাসনের উন্মুক্ত লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত কৃষকদের তালিকা চূড়ান্ত করা হবে। নির্বাচিত কৃষক মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমে জানতে পারবেন ধান সরবরাহের তারিখ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচিত কৃষকরা সরকারি খাদ্য গুদামে ধান সরবরাহ করতে পারবেন।
এ বিষয়ে অনেক কৃষক দাবি করেন, সরকারি কৃষকের অ্যাপ সম্পর্কে তারা কিছু জানেন না। আর অনেক কৃষকের নাই স্মার্টফোন। এছাড়াও অ্যাপে নিবন্ধন জটিলতা, সার্ভার সমস্যার কারণে সরকারি মূল্যে ধান বিক্রয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।
পাইকেরছড়া ইউনিয়নের গছিডাঙা গ্রামের কৃষক এরশাদ আলী ও কফিলুর রহমান এর ভাষ্য, শুনেছি সরকার অ্যাপের মাধ্যমে ধান কিনবে। কিন্তু এই অ্যাপ কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, তা জানি না।
সরকারিভাবে কৃষক অ্যাপের মাধ্যমে ধান কিনবে সরকার এই প্রতিবেদকের কাছে এমন কথা শুনে উত্তর ধলডাঙা গ্রামের কৃষক শাহিন মিয়া বিস্ময় প্রকাশ করে জানালেন, সরকারি পর্যায়ে অ্যাপের মাধ্যমে ধান কেনা হবে, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কিছুই জানেন না। আমার মতো এই গ্রামের অনেক কৃষক অ্যাপের মাধ্যমে ধান কেনার বিষয়ে জানেন না বলে যোগ করেন তিনি।
উপজেলার তিলাই ইউনিয়নের পশ্চিম ছাট গোপালপুর গ্রামের কৃষক মাইদুল ইসলাম জানালেন, খাদ্য গুদামে শুকনা ধান ছাড়া নেয় না। তিন বিঘা জমির ধান কেটে বাড়িতে আনার পর থেকেই বৃষ্টি। কোন মতে মাড়াই করে ৬৫ মণ ভেজা ধান ৭২০ টাকা দরে প্রতি মণ ধান বিক্রি করেছি। এছাড়াও সরকারি খাদ্য গুদামে শুকনা ধান জমা দিতে গেলেও নানা হয়রানির শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
উপজেলার জয়মনিরহাট খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাজেদুল ইসলাম গুদামে ধান জমা দেওয়ার সময় কৃষকদের হয়রানির বিষয়টি অস্বীকার করেন জানান, বিষয়টি সঠিক নয়। এমন অভিযোগ আমাকে কেউ করেনি।
ভুরুঙ্গামারী উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হামিদুল ইসলামের ভাষ্য, অ্যাপের মাধ্যমে ধান কেনার বিষয়টি কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার কৃষক অ্যাপের মাধ্যমে আবেদন করেছে। কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠানে ও উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তাগণের মাধ্যমে মাঠ পর্যায় কৃষকদের নিবন্ধনে সহায়তা করা হচ্ছে। আশা করি কৃষক এতে লাভবান হবেন।

