ঢাকা
১৮ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
সন্ধ্যা ৭:৫১
logo
প্রকাশিত : মে ১৮, ২০২৬

সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত বাঁশখালীর লবণ চাষিরা

শিব্বির আহমদ রানা, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি: চট্টগ্রামের উপকূলীয় জনপদ বাঁশখালী। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে সাদা সোনার মতো ঝলমল করছে লবণের স্তূপ। প্রকৃতির অনুকূল আবহাওয়ায় এবার উৎপাদনও হয়েছে বাম্পার। কিন্তু সেই প্রাচুর্যের মধ্যেও নেই চাষিদের মুখে হাসি। ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, মধ্যস্বত্বভোগী ও কার্গো বোট মালিকদের সিন্ডিকেট, সংরক্ষণ সংকট এবং সাম্প্রতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির কারণে চরম হতাশায় দিন কাটছে হাজার হাজার লবণ চাষির।

বাঁশখালীর পশ্চিম পুঁইছড়ি, ছনুয়া, শেখেরখীল, গন্ডামারা, চাম্বল ডিপুটিঘোনা, শীলকূপ, সরল, কাথরিয়া ও খানখানাবাদ (আংশিক) এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক পরিসরে লবণ উৎপাদন হয়। চলতি মৌসুমে কয়েক হাজার চাষি মাঠে নেমে রেকর্ড পরিমাণ লবণ উৎপাদন করলেও বাজারে ধস নামায় লোকসানের ভারে নুয়ে পড়েছেন তারা।

চাষিদের অভিযোগ, বর্তমানে প্রতি মণ লবণ উৎপাদনে খরচ পড়ছে প্রায় ৩৫০ টাকা। অথচ বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ২৪০ থেকে ২৫০ টাকায়। ফলে প্রতি মণে গড়ে ১৫০ থেকে ১৭০ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে প্রতি কেজি লবণ বিক্রি করে চাষিদের হাতে আসছে পাঁচ টাকারও কম, অথচ শহরের খুচরা বাজারে সেই লবণই প্যাকেটজাত হয়ে বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা কেজি দরে।

উপকূলের লবণচাষিদের ভাষ্য, পুরো বাজারব্যবস্থাই এখন একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। বিশেষ করে মধ্যস্বত্বভোগী ও কার্গো বোট মালিকদের একচেটিয়া প্রভাবের কারণে তারা স্বাধীনভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লবণ পাঠাতে পারছেন না। ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, খুলনাসহ বিভিন্ন জেলায় সমুদ্রপথে লবণ পরিবহন করতে হয়। আর পরিবহন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণকে পুঁজি করেই অসাধু চক্র বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ চাষিদের।

উপকূলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে পড়ে আছে শত শত টন লবণ। আধুনিক সংরক্ষণাগার না থাকায় অনেকে বাধ্য হয়ে মাঠে গর্ত খুঁড়ে লবণ মজুত করছেন। কেউ কেউ ভবিষ্যতে দাম বাড়ার আশায় অপেক্ষা করছেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট থেকে মুক্তির পথ দেখছেন না তারা।

লবণ চাষি মো. মিনহাজ, রবিউল আলম ও মো. ইউনুস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'উৎপাদন বাড়লেও লাভ তো দূরের কথা, মূলধনই তুলতে পারছি না। উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে লবণ চাষ করেছি। এভাবে চলতে থাকলে অধিকাংশ চাষিই পথে বসবে।' তারা আরও বলেন, সরকার যদি দ্রুত বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে দেশের ঐতিহ্যবাহী লবণশিল্প বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

এরই মধ্যে নতুন করে দুর্ভোগ বাড়িয়েছে বৈরী আবহাওয়া। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও আকস্মিক দুর্যোগে উপকূলের হাজার হাজার টন লবণ পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে চাষিদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শুধু বাঁশখালী নয়– কক্সবাজারের কুতুবদিয়া, চকরিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া ও টেকনাফ অঞ্চলের লবণ চাষিরাও একই সংকটে রয়েছেন। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং ন্যায্যমূল্য সংকটের কারণে দেশের উপকূলীয় লবণশিল্প এখন অস্তিত্ব সংকটের মুখে।

এ পরিস্থিতিতে গত শনিবার (১৬ মে) বাঁশখালীর গন্ডামারা ইউনিয়নের জলকদর খালস্থ খাটখালী মোহনায় লবণ ও মৎস্য চাষিদের অধিকার আদায় এবং উপকূলীয় শিল্প রক্ষার দাবিতে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তারা বলেন, জমির ভাড়া, শ্রমিকের মজুরি, পলিথিন, সেচ পাম্প ও জ্বালানি তেলসহ উৎপাদন সংশ্লিষ্ট প্রায় সব উপকরণের দাম কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। অথচ মাঠ পর্যায়ে চাষিদের কাছ থেকে অস্বাভাবিক কম দামে লবণ কিনে বিপুল মুনাফা করছে একটি অসাধু ব্যবসায়ী চক্র।

বক্তারা আরও বলেন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতি বছর উপকূলীয় লবণ মাঠ ও মৎস্য ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারপরও উপকূলের মানুষ দেশের খাদ্য ও শিল্পখাতের চাহিদা পূরণে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের দুর্ভোগ লাঘবে কার্যকর উদ্যোগ এখনও দৃশ্যমান নয়।

সভা থেকে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের প্রতি কয়েক দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে–লবণ ও মৎস্য চাষিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, সহজ শর্তে বিনা সুদে ঋণ প্রদান, ভর্তুকি মূল্যে পলিথিন ও সেচ পাম্প সরবরাহ, নদীভাঙন রোধে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং উপকূলীয় লবণশিল্প রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা প্রণয়ন। উপকূলের চাষিদের প্রশ্ন এখন একটাই–'সাদা সোনা' খ্যাত লবণ যদি উৎপাদকের ঘরেই লোকসানের বোঝা হয়ে থাকে, তাহলে এই শিল্প টিকবে কীভাবে?

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram