

সাইফুল ইসলাম, বাবুগঞ্জ (বরিশাল) প্রতিনিধি: বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়নের মীরগঞ্জ এলাকায় বসবাসরত বেদে সম্প্রদায়ের অর্ধশতাধিক শিশু দীর্ঘদিন ধরে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে। এমন বাস্তবতায় দুই নারীর স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগে শিক্ষার আলো পৌঁছাতে শুরু করেছে তাদের জীবনে। তবে এই উদ্যোগ টিকিয়ে রাখতে এখন প্রয়োজন উপজেলা প্রশাসনের সহায়তা।
সমাজের মূলধারা থেকে দীর্ঘদিন ধরেই বিচ্ছিন্ন বেদে সম্প্রদায়। যাযাবর জীবনযাপন আর জীবিকার তাগিদে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরে বেড়ানোই তাদের নিত্যদিনের বাস্তবতা। সেই জীবন সংগ্রামের ভার বইতে হচ্ছে তাদের শিশুদেরও। ফলে শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বাবুগঞ্জ উপজেলার প্রায় দুই শতাধিক বেদে শিশু।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়নের লোহালিয়া গ্রামের মীরগঞ্জ ফেরিঘাট সংলগ্ন নদী তীরে প্রায় ৭০টি বেদে পরিবার অস্থায়ীভাবে বসবাস করছে। বাঁশ ও পলিথিন দিয়ে তৈরি ছোট ছোট ঘর কিংবা নৌকাই তাদের আশ্রয়স্থল। এসব পরিবারের অধিকাংশ শিশুই বিদ্যালয়ের মুখ দেখার সুযোগ পায়নি।
যে বয়সে শিশুদের হাতে বই-খাতা থাকার কথা, সে বয়সেই তারা জীবিকার তাগিদে বাবা-মায়ের সঙ্গে মাছ ধরা ও অন্যান্য কাজে যুক্ত হয়ে পড়ে। পারিবারিক পেশার ধারাবাহিকতায় অল্প বয়সেই এসব কাজে জড়িয়ে পড়ায় তারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
এছাড়া, অভিভাবকদের অধিকাংশই নিরক্ষর হওয়ায় পরিবার থেকেই প্রাথমিক শিক্ষার কোনো ভিত্তি গড়ে ওঠে না। ফলে বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগেই শিক্ষার পথ থেকে ঝরে পড়ে এসব শিশু।
এমন বাস্তবতায় এগিয়ে এসেছেন স্থানীয় দুই মানবিক নারী মোসাম্মৎ মুন্নি আক্তার ও মিতু আক্তার। নিজেদের উদ্যোগে তারা প্রতিদিন বিকেলে নদীর তীরে খোলা আকাশের নিচে প্রায় ৫০ জন বেদে শিশুকে এক ঘণ্টা করে পাঠদান করছেন।
সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে তাদের এই উদ্যোগ ইতোমধ্যেই স্থানীয়ভাবে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
বেদে নারী হেলেনা বিবি (৪০) বলেন, আমাদের জীবনে সংগ্রামই বাস্তবতা। বেঁচে থাকার জন্য শিশুরাও কাজে সাহায্য করে। তাদের পড়াশোনার আগ্রহ থাকলেও পরিবেশের কারণে তা সম্ভব হয় না। সরকার যদি সুযোগ করে দিত, তাহলে আমাদের সন্তানরাও শিক্ষিত হতে পারত।
উদ্যোগী মুন্নি আক্তার বলেন, আমরা চাই এই শিশুরা শিক্ষার আলো পাক। কিন্তু পর্যাপ্ত পরিবেশ, বই ও শিক্ষা উপকরণের অভাবে নিয়মিত পাঠদান চালিয়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে। প্রশাসন বা কোনো বেসরকারি সংস্থা সহযোগিতা করলে এই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করা সম্ভব।
স্থানীয়দের দাবি, নদীর তীরে অন্তত একটি ছোট ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হলে এবং প্রয়োজনীয় বই-খাতা ও শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা হলে এই শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে বাবুগঞ্জ উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মো. শামীম হোসেন বলেন, মীরগঞ্জের বেদে শিশুদের শিক্ষার জন্য দুই নারীর এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। প্রশাসনের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা উল হুসনা বলেন, বেদে সম্প্রদায়ের শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় আনতে উপজেলা প্রশাসন সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।
শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত এই শিশুদের জীবনে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখাচ্ছে দুই নারীর এই ছোট্ট উদ্যোগ। তবে এ উদ্যোগকে টেকসই করতে এখন প্রয়োজন প্রশাসন, সমাজ ও সচেতন মহলের সমন্বিত উদ্যোগ। তাহলেই আলোকিত হতে পারে বেদে শিশুদের ভবিষ্যৎ।
