

হাওরাঞ্চলের সাত জেলা সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ ও মৌলভাবাজারের প্রায় ৬০টি উপজেলার দুই কোটি মানুষের বেশির ভাগের জীবন-জীবিকা, অর্থনীতি প্রধানত কৃষিনির্ভর। মাছ, গবাদি পশু, জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্রে সমৃদ্ধ এ অঞ্চলকে একসময় জালের মতোই জড়িয়ে রেখেছিল ছোট-বড় প্রায় ৩৫৪টি নদী। পলি জমে, দখলে-দূষণে ও অপরিকল্পিত উন্নয়নে এসব নদীর ৩০০টিই ভরাট হয়ে গেছে। ভরাট হয়ে গেছে এ অঞ্চলের প্রায় তিন হাজার খাল-বিলও।
সীমান্ত থেকে আসা ২২টি নদীর স্থানে স্থানে চর জেগেছে। স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড ও হাওর গবেষক-সংগঠক সূত্রে এ পরিস্থিতির কথা জানা গেছে। স্থানীয় ভুক্তভোগীরা বলছেন, নদী-নালা ও খাল-বিলের তলদেশ ভরাট হওয়ায় হাওর পানি ধারণের ক্ষমতা হারিয়েছে। আর তাতে বাড়ছে বন্যা এবং অকাল বন্যার ঝুঁকি।
সর্বশেষ ২০২২ সালে সিলেট অঞ্চলসহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যার কারণ হিসেবে ভারতের উজানে অতিবৃষ্টির পাশাপাশি নদী ভরাটকে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই কারণে প্রতিবছর অকাল বন্যায় বাড়ছে ফসলহানির শঙ্কাও। নদীগুলো কার্যত ধারণক্ষমতা হারিয়ে ফেলায় ভারতের মেঘালয়-চেরাপুঞ্জীর বৃষ্টির পানিতে সৃষ্ট পাহাড়ি ঢল নেমে দ্রুতই হাওরে ঢুকে পড়ে। এ অবস্থায় এবারও অকাল বন্যার দুঃস্বপ্নে কাঁপছেন হাওরের কৃষকরা।
বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা চালুর আগে মূলত নৌপথেই পণ্য ও যাত্রী পরিবহন চলত। এখনো এই নৌপথেই সীমান্ত অঞ্চল থেকে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ সারা দেশে জ্বালানি ও নির্মাণসামগ্রী কয়লা, পাথর, বালু, সিমেন্ট প্রভৃতি পরিবহন করা হয়। খরচ কম হয় বলে নৌপথকে এখনো প্রাধান্য দেওয়া হয়। তবে পরিকল্পিত খননের অভাবে হাওরের নদীগুলো ভরাট হওয়ায় মানুষের জীবন-জীবিকার ওপরও এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। পরিবেশ বিপর্যয়ের পরও নদী-খাল খননে সরকারের যুতসই মহাপরিকল্পনা চোখে পড়ছে না।
অবশ্য পানি উন্নয়ন বোর্ড-পাউবো বিআইডব্লিউটিএ, বিএডিসি, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর-এলজিইডিসহ বিভিন্ন সংস্থা বিচ্ছিন্নভাবে নদী খনন করলেও এতে কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। এ ধরনের কার্যক্রমকে বরং ‘অর্থ লোপাটের যজ্ঞ’ বলে অভিহিত করেছে হাওরবাসী। এদিকে নদীর সংখ্যা নিয়েও বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে রয়েছে ভিন্নতা।
হাওরের কৃষক, প্রাণ-প্রকৃতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাওর বাঁচাতে পরিকল্পিত নদী খনন ও পরিবেশবান্ধব স্থায়ী ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ খুবই জরুরি। প্রাণ-প্রকৃতি ও প্রতিবেশ গবেষক পাভেল পার্থ মনে করেন, বহু পাহাড়ি ছড়া, ঝিরি, নালা, মৌসুমি প্রবাহ মিলে সুনামগঞ্জের হাওরের নদী প্রণালি জটিল করেছে, যার বেশির ভাগ অভিন্ন আন্ত সীমান্ত নদী। ‘উজান-ভাটি সর্বত্র এই নদীপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘উজানে মেঘালয় পাহাড়ে অপরিকল্পিত খনন, বন উজাড়, পাথর উত্তোলনে ভাটির বাংলাদেশে নদীপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আবার ভাটিতে নদী ও হাওর জলাভূমিতে বাঁধ, রাস্তাঘাট নির্মাণ, নির্বিচার পাথর ও বালু বাণিজ্যও নদীধারা বিলীনের কারণ।’
পাহাড়ি নদীপ্রবাহের বাধার ফলে নানিদ, লোচ, মহাশোল, পিপলিশোল, তারাবাইন, রানী, গুতুম, বাঘাইড় মাছ হারিয়ে যাচ্ছে। নদী না থাকায় হাওর-জলাভূমির প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হয়ে হাওরের জলাবন, হিজল-করচ বিকশিত হচ্ছে না, গভীর পানির ধান হারিয়ে যাচ্ছে।
পাউবো সুনামগঞ্জ সূত্র জানায়, তিন বছর আগে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে ৪৩টি নদীর তালিকা দিয়ে ৯২৫ কিমি খননের প্রস্তাব দেওয়া হয়। ২০১৮-১৯ সালের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় সরকার ‘হাওর এলাকায় আগাম বন্যা প্রতিরোধ ও নিষ্কাশন প্রকল্পের’ আওতায় ছয়টি নদী খননে ২০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। রক্তি নদী ছয় কিমি, বৌলাই ১৬ কিমি, যাদুকাটা ৬.১২৫ কিমি খনন করাও হয়। নদী খননের ক্ষেত্রে রক্তি নদীর জন্য ১০ কোটি ৭০ লাখ টাকা, বৌলাই নদীর জন্য ৩৪ কোটি ৪১ লাখ টাকা, যাদুকাটা নদীর জন্য ১২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। রক্তি, যাদুকাটা, পুরান সুরমা, চামতি ও নলজুর নদীর চার হাজার ৪৮০টি ক্রস-সেকশন খননে আরো ৭২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া বিএডিসি ও এলজিইডি বিভিন্ন প্রকল্পে জেলায় আরো শত কোটি টাকার খাল খনন করেছিল। এসব খননকাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। সূত্র জানায়, এলজিইডির ‘হাওর অঞ্চলের বন্যা ব্যবস্থাপনা ও জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্পের’ আওতায় হাওরের সঙ্গে যুক্ত খালগুলো খনন প্রকল্পের পুরো বরাদ্দই লোপাট হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে সরকার খাল খননকে প্রাধ্যান্য দিয়ে গত ১৬ মার্চ সুনামগঞ্জে খাল খনন কর্মসূচি চালু করেছে। সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুরের বড়ছড়ার বাসিন্দা প্রবীণ কৃপেশ চক্রবর্তী বলেন, পাহাড়ি ঢল আইয়া বড়ছড়া খালটি ভরাট কইরা নষ্ট কইরা দিছে। কৃষিও নষ্ট করে দিছে।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, কোথাও বাঁধ দিয়ে আবার কোথাও সড়ক নির্মাণ করে অনেক নদী ও খাল হত্যা করা হয়েছে। গুরমার হাওরের ফসল রক্ষার কথা বলে টাঙ্গুয়ার হাওরের গোলাবাড়ির পাটলাই নদীর খালগাঙে স্থায়ী বাঁধ দেওয়া হয়েছে। নদীর দক্ষিণ পারেও আলাদাভাবে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এর পূর্বে নজরখালিতেও স্থায়ী বাঁধে নদী মরে গেছে। পরিণতিতে বিলগুলো ভরাট হয়ে হাওরের প্রকৃতিও বদলে যাচ্ছে। কানাইখালী নদীতীরের গ্রাম কামারগাঁওয়ের কৃষক মমিন মিয়া বলেন, ‘ছোটবেলায় দেখছি নদী অনেক গভীর ছিল। বড় বড় নৌকা চলত। আর এখন নদীতে গরু ঘাস খায়।’
সুরমা নদী থেকে সুনামগঞ্জ শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত ঝাউয়ার হাওরে পাঁচটি খাল ছিল পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম। সব ভরাট করে বাসাবাড়ি ও স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। ছাতকের বোকা নদী, সদরের মিয়ারখাল, জয়নাখালী, ওজিখালী, চামারখাল, কানাইখালী, গজারিয়া, নোওয়াগাঁও নদী, শাহপুরের খালে স্থায়ী বাঁধ দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ২০১৩ সালে তাহিরপুরে কালাগাঙ নদীতে বাঁধ দিয়ে বাসাবাড়ি ও বাজার স্থাপন করা হয়েছে। এই উপজেলার মনাই ও সরমরা নদীও বাঁধ দিয়ে বন্ধ করা হয়েছে।
গবেষণা বলছে, হাওরের নদী-খাল খননের দাবি উঠছে যুগের পর যুগ ধরে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনসহ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি নির্বাচনের আগে এই দাবি জোরালো হয়। এ অঞ্চলের সুরমা, কুশিয়ারা, কালনী, বরাক, ধনু, কংস, সোমেশ্বরী, বাউলাই, ভোগাই, মগড়া, যাদুকাটাসহ ২২টি বড় নদী প্রায় সারা বছরই প্রবহমান থাকে। এসব নদীর বিপুল পানি প্রধানত ভৈরবের কাছে মেঘনা হয়েই সমুদ্রে গড়ায়। কিন্তু পরিকল্পিত খননের অভাবে এসব নদীও ভরাট হয়ে যাচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। বর্ষাকাল ছাড়া বছরের অন্যান্য সময় হাওরের জ্বালানি, নির্মাণসামগ্রী ও ব্যবসায়ী পণ্য পরিবহন হুমকির মুখে পড়েছে।
বোরো মৌসুমে নদীগুলো প্রায় শুকিয়ে যায়। জমিতে সেচের পানির সংকট তৈরি হয়। আবার অপরিকল্পিত বাঁধে হাওরে এবার জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। জলাবদ্ধতায় অন্তত ১০ হাজার হেক্টর জমির কাঁচা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এ অবস্থায় হাওরের নদী খননের দাবিতে সোচ্চার হয়েছে বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন। হাওর উন্নয়ন সংসদের সভাপতি সালেহীন চৌধুরী শুভ বলেন, ‘ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে খালগুলো স্থানীয় কৃষি সভ্যতাকে যুগ যুগ ধরে সচল রেখেছে। অবিলম্বে নদীর পাশাপাশি খালও খনন করতে হবে।’
অ্যাসোসিয়েটস ফর ইনোভেটিভ রিসার্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের পরিচালক আব্দুল হাই চৌধুরী বলেন, ‘হাওরের নদ-নদী-খালগুলো পলি, অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত বাঁধ, দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তনে সংকটে পড়েছে। পানিপ্রবাহ বাধাগ্রসত্ম হয়ে জীববৈচিত্র্য ও জীবিকা হুমকিতে আছে। হাওরে পরিকল্পিত অবকাঠামো, স্থানীয় সম্পৃক্ততা, কঠোর আইন প্রয়োগ ও প্রাকৃতিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।’
হাওরের জীববৈচিত্র্য বিষয়ক গবেষক কল্লোল তালুকদার চপল বলেন, ‘হাওরাঞ্চলের নদ-নদী ও খাল ভরাটের ফলে হাওরের মাটির উর্বরতা ও প্রতিবেশও নষ্ট হচ্ছে। পানিপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় কৃষি ও বাস্তুতন্ত্রে প্রভাব পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সময় এই প্রভাব আমাদের জন্য আগামীতে চরম সংকট ডেকে আনবে।’
হাওর আন্দোলনের নেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান বলেন, ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের আওতায় খননকাজ শুরু না হলে বন্যার সঙ্গে ফসলহানী ঘটবে নিয়মিত। এখন সেটাই হচ্ছে। হাওরের ভেতর দিয়ে নির্মিত রাস্তা, কালভার্ট-সেতু পরিবেশ ধ্বংস করছে। এতে নদী-খাল ও হাওরের ওপর প্রভাব পড়েছে। প্রতিবছর বিলম্বিত হচ্ছে বর্ষা।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মকসুদুল হাকিম চৌধুরী গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, ‘নদী রক্ষা অত্যন্ত জটিল ও দুরূহ কাজ। এ কাজে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। পাউবো, বিআইডব্লিউটিএ নদী খননের কাজ করছে। আমরা পরামর্শ দিচ্ছি। তবে বাজেটের সংকট আছে। বড় পরিসরে নদী খনন খুবই দরকার।’ প্রতিটি জেলায় নদী রক্ষা কমিশন থাকার তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতি মাসে ওরা বৈঠক করে। সেখানে স্থানীয় পর্যায় থেকে অবহিত করা হলে নদী বাঁচাতে জেলা কমিশনও ভূমিকা রাখতে পারে।
’ তিনি বলেন, ‘উজানের নদীর পলি এসে নামে। সব ধরনের বর্জ্য নদীতে ফেলা হয়। পৌরসভার বর্জ্যও নদীতে ফেলে। এসবে নদী ভরাট হয়। হয় দূষণ। আসলে নদী ভরাটের কারণগুলো খুঁজে বের করতে হবে। এড্রেস করতে হবে সমস্যাগুলো। এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ মনোযোগ দরকার। ৫০ বছর ধরে এ ক্ষেত্রে নৈরাজ্য চলছে। সরকারের সব বিভাগ, সিভিল সোসাইটি, বেসরকারি সংস্থা সবাইকে নদীর নাব্যতা রক্ষায় ভূমিকা রাখতে হবে। এ কাজে ধারাবাহিকতাও রাখতে হবে। তবেই নদী রক্ষা করা সম্ভব।’

