ঢাকা
logo
প্রকাশিত : April 4, 2026

কয়লার মজুদ ছাড়িয়েছে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ

দেশের একমাত্র কয়লাখনি বড়পুকুরিয়ায় কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডে (বিসিএমসিএল) কয়লার মজুদ বর্তমানে ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ ছাড়িয়ে গেছে। তাপ-বিদ্যুৎকেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের মাত্র একটি চালু থাকায় খনির উত্তোলন ও ব্যবহারে ফারাক দেখা যাচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টন কয়লা উত্তোলন হলেও ব্যবহার হচ্ছে মাত্র ৭০০-৭৫০ টন। দীর্ঘদিনের এই অব্যবস্থাপনায় ইয়ার্ডে আগুন লাগার ঝুঁকি, আর্থিক ক্ষতি এবং নীতিগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

জানা যায়, বর্তমানে খনির ১৩০৯ নম্বর ফেইস থেকে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৩ হাজার টন কয়লা উত্তোলন করা হলেও বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার হচ্ছে মাত্র ৭০০-৭৫০ টন। দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা বজায় থাকায় কয়লা উদ্বৃত্ত থেকে যাচ্ছে। এর ফলে ইয়ার্ডে কয়লা মজুদ এখন ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ ছাড়িয়ে গেছে।

বিসিএমসিএল থেকে জানা যায়, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির ইয়ার্ডের ধারণক্ষমতা ২ লাখ ২২ হাজার টন হলেও মার্চ মাসের ২৯ তারিখ পর্যন্ত কয়লার মজুদ রয়েছে প্রায় ৫ লাখ ২০ হাজার টন। আগে ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুতের তিনটি ইউনিট চালু থাকায় দৈনিক প্রায় ৪-৫ হাজার টন কয়লার চাহিদা ছিল। এখন মাত্র একটি ইউনিট চালু আছে, সে কারণে কয়লার চাহিদা নেমে এসেছে এক-তৃতীয়াংশে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০১৯ সালের পর থেকে বড়পুকুরিয়ার কয়লার একমাত্র ক্রেতা নির্ধারিত হয় তাপ-বিদ্যুৎকেন্দ্র। এর ফলে খোলাবাজারে বিক্রির সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। আগে টেন্ডারের মাধ্যমে বাইরের ক্রেতাদের কাছে কয়লা বিক্রি করা যেত, ফলে মজুদ নিয়ন্ত্রণে থাকত। এখন সেই পথ বন্ধ থাকায় পুরো উৎপাদন নির্ভর করছে একমাত্র ক্রেতার ওপর।

এ ছাড়া চাহিদা কমলেও উৎপাদন থামানো যাচ্ছে না। কারণ বিদেশি ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন উত্তোলন চালিয়ে যেতে হচ্ছে। খনি কর্তৃপক্ষ বলছে, মাঝপথে উত্তোলন বন্ধ করলে ভূগর্ভস্থ নিরাপত্তা ও কারিগরি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

দায়িত্বশীলরা বলছেন, কয়লার অতিরিক্ত মজুদ থেকে গুরুতর ঝুঁকির আশঙ্কা করা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন স্তূপ করে রাখা কয়লায় নিজে থেকেই আগুন জ্বলে উঠছে। এতে প্রতিনিয়ত কয়লা পুড়ে ক্ষতি হচ্ছে। কোল স্লাইডিং অতিরিক্ত উচ্চতায় স্তূপের ঢাল বাড়ায় ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যাতে প্রাণহানির শঙ্কা রয়েছে।

এ সংকটের জন্য খনি ও বিদ্যুৎকেন্দ্র- দুপক্ষই একে অপরকে দায়ী করছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের দাবি, তারা সাময়িকভাবে উত্তোলন বন্ধ রাখতে বললেও তা মানা হয়নি। খনি কর্তৃপক্ষ বলছে, চুক্তি অনুযায়ী উত্তোলন বন্ধ করা সম্ভব নয়, বরং বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়মিত কয়লা না নেওয়াতেই সংকট তৈরি হয়েছে। এই পারস্পরিক দায় চাপানো আসলে বড় একটি সমন্বয় ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।

খনি কর্তৃপক্ষ বাইরের ক্রেতাদের কাছে কয়লা বিক্রি করতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। ইয়ার্ডে মজুদ কয়লার মালিক বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। তারা বাইরে কয়লা বিক্রির পক্ষে নয়। বিশ্লেষকদের মতে, কয়লা বাইরে বিক্রি করার বিষয়টি সাময়িক সমাধান। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে প্রয়োজন-উৎপাদন ও ব্যবহার পরিকল্পনার সমন্বিত নীতিমালা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিটগুলো দ্রুত চালু করা, একক ক্রেতানির্ভরতা কমানো। বড়পুকুরিয়া তাপ-বিদ্যুৎকেন্দ্রের

প্রধান প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, বর্তমানে ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১ নম্বর ইউনিট চালু রয়েছে, যেখানে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৭০০ টন কয়লা প্রয়োজন। ২৭৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৩ নম্বর ইউনিটটি ওভারহোলিংয়ের কারণে বন্ধ থাকলেও আগামী মে মাসের শেষ নাগাদ এটি চালু হওয়ার আশা করা হচ্ছে। ইউনিটটি চালু হলে দৈনিক প্রায় তিন হাজার টন কয়লার চাহিদা তৈরি হবে এবং এতে বর্তমান মজুদ কয়লা ৭-৮ মাসের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কয়লা উত্তোলন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে খনি কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হলেও তারা তা মানেনি। ফলে ইয়ার্ডে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ টন কয়লা মজুদ হয়ে গেছে। তার মতে, কয়লা উত্তোলন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখলে এ ধরনের সংকট তৈরি হতো না।

অন্যদিকে, বিসিএমসিএলের মহাব্যবস্থাপক খান মো. জাফর সাদিক বলেন, সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী চীনের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খনিতে কয়লা উত্তোলনের কাজ করছে। এই প্রক্রিয়া মাঝপথে বন্ধ করা সম্ভব নয়। কারণ ভূগর্ভে খনির নিরাপত্তা ও নানা কারিগরি জটিলতার কারণে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী উত্তোলন চালিয়ে যেতেই হয়।

খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. শাহ আলম বলেন, বর্তমানে খনির ইয়ার্ডে ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ কয়লা জমে গেছে। এতে বড় বড় স্তূপ তৈরি হয়েছে এবং প্রায়ই সেখানে আগুন লাগার ঘটনা ঘটছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে রাখতে একটি বিশেষ দল সার্বক্ষণিক কাজ করছে। তবে আগুনে পুড়ে কয়লা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

উল্লেখ্য, বড়পুকুরিয়া তাপ-বিদ্যুৎকেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের মোট উৎপাদনক্ষমতা ছিল ৫২৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ২ নম্বর ইউনিটটি ২০২০ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে। ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর যান্ত্রিক ত্রুটিতে ২৭৫ মেগাওয়াটের ৩ নম্বর ইউনিটও বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১ নম্বর ইউনিটটি চালু থাকলেও সেখান থেকে মাত্র ৫৫-৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, যার জন্য প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৭০০ টন কয়লা প্রয়োজন।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram