

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি: চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে শিশুদের হাম রোগে আক্রান্তের সংখ্যা। আজ রোববার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে ৯৩ জন শিশু এই ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে। আর গত ৩ মাসের ৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চলতি মাসেই ২ জনের মৃত্যু রয়েছে।
মারা যাওয়া শিশুরা হচ্ছে, জেলার নাচোল উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের পাহাড়পুর গ্রামের মোসাঃ তনিমা(৭ মাস), শিবগঞ্জ উপজেলার ছত্রাজিতপুর ইউনিয়নের রানিহাটি গ্রামের মোঃ ইমাম মাহমুদ(৮ মাস), চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার নয়াগোলা মহল্লার মারিয়া(৭ মাস) ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার সাইফা(৬ মাস)।
জেলা হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ মাহফুজ রায়হান বলেন, আজ রোববার নতুন করে আরো ৪৩ জন হামের রোগী ভর্তি হয়েছে। ভর্তিকৃত এক শিশুর অবস্থা ঝুকিপূর্ণ হওয়ায় তাকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। আর সুস্থ্য হয়ে উঠায় ১৫ জন রোগী কে ছাড়পত্র দেয়া হয়। বর্তমানে ৭৭ জন রোগী ভর্তি রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, গত ৩ মাসে থেকে এই হাসপাতালে হাম রোগী ভর্তির সংখ্যা বেড়েই চলছে। আর গত ৩ মাসে ৬০০ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। আর জানুয়ারী মাসে ১ জন, ফেব্রুয়ারী মাসে ১ জন এবং চলতি মার্চ মাসে এ রির্পোট লেখা পর্যন্ত ২ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
জেলা হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ মাহফুজ রায়হান হামের লক্ষণ সম্পর্কে জানান, আক্রান্ত শিশুর শুরুতে তীব্র জ্বর, সর্দি, কাশি এবং চোখ লাল হয়ে জল পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। জ্বরের কয়েক দিন পর মুখগহ্বরের ভেতরে ছোট সাদাটে দাগ দেখা দিতে পারে এবং এর পরপরই কান ও মুখ থেকে শুরু করে সারা শরীরে লালচে দানা বার্ যাশ ছড়িয়ে পড়ে। এই সময়ে শিশুরা প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে এবং খাবারে অরুচি দেখা দেয়।
তিনি বলেন, হাম রোগটি পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য, কিন্তু অবহেলা করলে এটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। শিশুদের ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে দুই ডোজ হাম-রুবেলার টিকা দিতে হবে। যাদের এখনো টিকা দেয়া হয়নি, তাদের দ্রুত টিকা নেয়ার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এছাড়া ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের যেহেতু টিকার সুযোগ নেই, তাই তাদের জনসমাগম এড়িয়ে বাড়িতে রাখতে হবে এবং আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
হাসপাতালের বিশেষায়িত ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিতে আসা এক শিশুর মা মোসা. সুফিনা খাতুন বলেন, প্রথমে ভেবেছিলাম সাধারণ জ্বর কিন্তু শরীরে লাল দানা উঠতে শুরু করলে ভয় পেয়ে দ্রুত হাসপাতালে আসি। এখানে আসার পর দেখছি অনেক শিশু এই রোগে ভুগছে। চিকিৎসকরা চেষ্টা করছেন, কিন্তু রোগীর চাপে সেবা পেতে অনেক সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
একই ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা অপর এক শিশুর বাবা মোঃ শাহ্ আলম জানান তার উদ্বেগের কথা। তিনি বলেন, আমার বাচ্চার বয়স মাত্র ১৩ মাস। জানতাম না এত ছোট শিশুরও এই রোগ হতে পারে। আশেপাশে আরও অনেকের হচ্ছে শুনে খুব আতঙ্কে আছি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ মশিউর রহমান জানান, সম্প্রতি হাসপাতালে হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। চিকিৎসক ও নার্স সংকটের কারণে আমাদের প্রচণ্ড হিমশিম খেতে হচ্ছে। রোগটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে হওয়ায় আক্রান্ত শিশুদের জন্য এবং সংক্রমণ রোধে পুরাতন ভবনের তৃতীয় তলায় আলাদা ওয়ার্ড প্রস্তুত করে চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম শাহাব উদ্দিন বলেন, সংক্রমণ রোধে আক্রান্তদের আলাদা রাখা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, হাঁচি-কাশির সময় মুখ ঢেকে রাখা এবং শিশুদের ভিড় এড়িয়ে চলা জরুরি। কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া আবশ্যক।
তিনি হাম রোগী বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বলেন, ২০১৯-২০ সালে সারাদেশে হাম-রুবেলার টিকা ক্যাম্পেইন হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতা হিসেবে ২০২৪-২৫ সালে আবারো হামের টিকা ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু দেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারণে এই ক্যাম্পেইন আজ পর্যন্ত হয়নি। তবে, আগামী মে মাসে এই ক্যাম্পেইন হতে পারে। বতর্মানে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের বাড়ির ঠিকানা অনুসারে আশপাশে শিশুদের টিকাদানের আওতায় আনা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, গত ২৫ মার্চ পর্যন্ত ৩৭ জন রোগীর নমুনা পরীক্ষায় ২০ জনের পজিটিভ রিপোর্ট আসে।
