

আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার, উন্নত জাতের বীজ এবং মাঠপর্যায়ে নিবিড় তদারকির ফলে চলতি মৌসুমে জলঢাকা উপজেলায় আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। মাঠজুড়ে আশানুরুপ ফলন হলেও বাজারে অস্বাভাবিক দরপতনে সেই সাফল্য রূপ নিয়েছে হতাশায়। উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দামে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় জেলার হাজারো কৃষক লোকসানের মুখে পড়েছে।
জলঢাকার আলুচাষি আব্দুল আজিজ বলেন, এক বিঘা জমি থেকে তিনি প্রায় ৪০-৪৫ বস্তা (প্রতি বস্তায় ৬০ কেজি) আলু পেয়েছেন। বর্তমানে বাজারে প্রতি বস্তা আলু বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায়। বর্তমান বাজার মূল্যে এক বিঘা জমি থেকে তার আয় দাঁড়াচ্ছে সর্বোচ্চ ১৮-১৯ হাজার টাকা, অথচ উৎপাদন খরচ হয়েছে ৪০-৪৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি বিঘায় ২০ হাজার টাকারও বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছে।
একই অভিযোগ ইউপি সদস্য ও কৃষক হাবিবুল্লাহ মিয়ার। তিনি বলেন, ধারদেনা ও নিজস্ব পুঁজি বিনিয়োগ করে ভালো ফলনের আশা করেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে প্রতি কেজি আলুর দাম নেমে এসেছে ৪ থেকে ৫ টাকায়। উৎপাদন খরচ না উঠায় অনেক কৃষক দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
জেলার প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতেও একই চিত্র। মীরগঞ্জ এলাকার কৃষক একরামুল হক বলেন, প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে তার খরচ হয়েছে ১৪ থেকে ১৫ টাকা। কিন্তু বিক্রি করতে হচ্ছে ৭ থেকে ৮ টাকায়। সার, বীজ, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি দিতে গিয়ে তিনি ঋণের বোঝায় জর্জরিত।
শিমুলবাড়ি এলাকার কৃষক লোকমান হাকিম বলেন, আলু চাষই তার পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস। হিমাগারে সংরক্ষণের সামর্থ্য না থাকায় লোকসানে আলু বিক্রি করা ছাড়া উপায় নেই। সংসার চালানো ও সন্তানদের পড়াশোনা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে।
কৃষকদের অভিযোগ, মৌসুমের শুরু থেকেই আলুর বাজারে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। তাদের কারসাজিতেই কৃষক পর্যায়ে দাম কৃত্রিমভাবে কমিয়ে রাখা হয়েছে। এতে লাভবান হচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগীরা, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন চাষীরা।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নীলফামারী জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, অনুকূল আবহাওয়া ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে এবার জেলায় আলুর ফলন ভালো হয়েছে। চলতি মৌসুমে ২১ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। চাষ হয়েছে ২২ হাজার ৮১২ হেক্টরে জমিতে। গত বছরের তুলনায় যা ৯৬২ হেক্টর বেশি। ইতোমধ্যে ৬ হাজার ২১২ হেক্টর জমি থেকে আগাম জাতের আলু সংগ্রহ করা হয়েছে। হেক্টরপ্রতি গড় ফলন হয়েছে ১৫ দশমিক ১২ মেট্রিক টন।
বাজার পরিস্থিতি প্রসঙ্গে জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা এ টি এম এরশাদ আলম খান বলেন, উৎপাদন বেশি হলে দাম কিছুটা কমা স্বাভাবিক। তবে কৃষক যেন উৎপাদন খরচের নিচে বিক্রি করতে বাধ্য না হন, সে বিষয়ে নজর রাখা হচ্ছে। বাজারে সিন্ডিকেট বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, আলু সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে হিমাগার ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং সরকারি পর্যায়ে আলু ক্রয়ের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
