

আবদুল জলিল, কাজিপুর (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি: সাত ভাই-বোনের সংসারে বেড়ে ওঠেন জরিনা খাতুন। সন্তানদের ভরণপোষণ করতে দরিদ্র কৃষক পিতার হিমশিম অবস্থা। পঞ্চম শ্রেণির পরে আর পড়ালেখার পাঠ এগিয়ে নেয়া সম্ভব হয়নি জরিনা খাতুনের। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়। কয়েক বছর পরেই শ্বশুরবাড়ি যমুনার করাল গ্রাসে হারিয়ে যায়। নিঃস্ব জরিনা খাতুন স্বামীকে সাথে নিয়ে তার বাবার বাড়ীতে বসবাস শুরু করেন। বাবার বাড়িতে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলেও পেটের ক্ষুধা মেটানোর তেমন কোন ব্যবস্থা ছিলো না। তাই বাবার সংসারে বোঝা না হয়ে অর্থ উপার্জনের জন্য পরিকল্পনা করেন তিনি। নিজের পরিশ্রম আর স্বামীর গতর খাটানো অর্থে কোনমতে ঘুরতে থাকে জরিনার সংসার। একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কর্মরত স্বামীর উপার্জনে চলা কঠিন হয়ে পড়ে। এরইমধ্যে জরিনার কোল জুড়ে এসেছে দুটো সন্তান। যমুনা জরিনাকে ভিটেমাটি ছাড়া করলেও স্বামীকে ঘিরে একটা স্বপ্ন ছিলো তার। কিন্তু বিধি বাম। বড় ছেলের বয়স যখন আট আর ছোটটির বয়স ৪ তখন জরিনার স্বামী মারা যান।
স্বামীর চলে যাওয়ার শোক সামলে জরিনা পুরোপুরি কাজে নেমে পড়েন। একটি সেলাই মেশিন ক্রয় করে হস্তশিল্পের কাজ করতে থাকেন। গ্রামের মহিলাদের সাথে নিয়ে কাগজের ঠোঙা বানিয়ে উপজেলার বিভিন্ন দোকানে দেন। বোরকা বানিয়ে পরিচিতজনদের দেন। এমনি করে হাতে আসতে থাকে অর্থ। কিন্তু জরিনার স্বপ্নের পরিধি এখানেই থেমে থাকেনি। নিজেকে আরও শাণিত করতে কাজিপুর মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরে মাসিক ৫০০/- (পাঁচশত) টাকা বেতনে মাস্টাররোলে সেলাইয়ের চাকুরি নেন তিনি। এই চাকুরির মেয়াদ শেষে তিনি “খুদবান্দি মহিলা উন্নয়ন সমিতি” নামে একটি সমিতি গঠন করেন। চলতে থাকে মহিলাদের নিয়ে তার সংগ্রাম। এরই মধ্যে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর থেকে তার সমিতি রেজিস্ট্রেশন পায়। কয়েকটি সেলাই মেশিন দিয়ে গ্রামের দরিদ্র মহিলাদের প্রশিক্ষণ প্রদান শুরু করেন তিনি।
কর্মের পরিধি বাড়াতে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর হতে ক্ষুদ্রঋণ নেন তিনি। সেই অর্থে বেশ কয়েকটি সেলাই মেশিন কিনে শুরু করেন প্রশিক্ষিত মহিলাদের নিয়ে বোরকা তৈরী ও নকশী কাঁথার কাজ। প্রতিদিন হাতে আসতে তাকে বেশ কিছু করে টাকা। এসব কাজের মাঝেও তার সন্তানদের শিক্ষার বিষয়ে কোন গাফিলতি করেননি। বড় ছেলে স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজে ভর্তি হয়।
জরিনার ভাবনায় এখন শুধু নিজের নয়, সমিতির সদস্যদের আয়েরও উৎস খোঁজার চেষ্টা। এই পরিকল্পনায় হাঁস মুরগীর খামার শুরু করেন তিনি। এর কিছুদিন পরে মেশিন ক্রয় করে ডিম হতে বাচ্চা ফুটানোর কাজ শুরু করেন। এই কাজে কয়েকজন মহিলাকেও নিয়োগ করেন। খামারের হাঁস মুরগী ও বাচ্চা বিক্রয়লব্ধ অর্থে ব্যবসার প্রসারে তিনি ২০ শতক জমি ক্রয় করেন এবং তাতে ৪টি টিনের ঘর তৈরীর মাধ্যমে খামার আরও বড় করেন। তার খামারে এখন ৩০টি ইলেক্ট্রিক্স সেলাই মেশিন ও তিনটি ডিম ফুটানোর মেশিন রয়েছে। বর্তমানে সেই খামার ও হস্তশিল্প তৈরির কাজ থেকে প্রায় ৪০,০০০/- (চল্লিশ) হতে ৫০,০০০/-(পঞ্চাশ) হাজার টাকা আয় হচ্ছে। এরইমধ্যে উপার্জনকৃত অর্থে তিনি প্রায় ৩০ (ত্রিশ) লক্ষ টাকার জমি ক্রয় করেছেন। এখন তার অর্জিত সম্পদের সর্বমোট মূল্য প্রায় ৫০ (পঞ্চাশ) লক্ষ টাকা। বর্তমানে জরিনার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে তার ২ ছেলেসহ মোট ২০ জনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে।
জরিনার এই কর্মের মূল্যায়ন করেছে কাজিপুর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার অফিস। এ বছর জরিনাকে তারা প্রদান করেছেন “অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারীর” পুরস্কার। শুধু তাই নয়, জরিনা খাতুন এই ক্যাটাগরিতে সিরাজগঞ্জ জেলায়ও প্রথম হয়ে সম্মাননা পেয়েছেন।
জরিনা খাতুন এই প্রতিবেদককে জানান, “ভবিষ্যতে আমার ব্যবসা আরও বড় করার চেষ্টায় আছি। শীঘ্রই একটি কোয়েল পাখির খামার করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে করে আরও কিছু মানুষের কর্মসংস্থান হবে।” তিনি আরও জানান, যখন কাজ শুরু করি তখন অনেকেই আমাকে নিরুৎসাহিত করতো। নানা মন্দ কথা বলতো। কিন্তু ক্রমান্বয়ে তাদের ধারণা পাল্টে যায়। আমি বিশ্বাস করি মানুষ ইচ্ছে করলে আর মনোযোগ দিয়ে কাজ করলে সে একদিন প্রতিষ্ঠা পাবেই।”
কাজিপুর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা চিত্রা রানী সাহা বলেন, “জরিনা খাতুন আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে কোন কাজই ছোট নয়। ইচ্ছে থাকলে কোন প্রতিবন্ধকতাই মানুষকে আটকাতে পারে না।”
কাজিপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “জরিনার সংগ্রামী জীবন অনেক নারীকে সামনে চলার পথে অনুপ্রেরণা জোগাবে বলে আমি বিশ্বাস করি। জরিনার মতো কেউ কাজ করতে চাইলে সরকারিভাবে তাকে প্রশিক্ষণ ও পরে ঋণ দিয়ে সহায়তা করা হবে।”
