

রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি: শখ ছিলো দু-একটা পাখির, চঞ্চল ডানায় ভর করা হাওয়ার ঠাণ্ডা ছোঁয়া। সেই শখই আজ বুক ভরে বলে স্বপ্ন একদিন সত্যিই উড়তে পারে। বাড়ির আঙিনায় এখন রঙধনু নামে লাভবার্ড কিচিরমিচিরে গান শোনায় সকালবেলা। কুনুরদের লাফালাফি, ময়নাদের ছলছল চোখ সব মিলিয়ে মোশাররফের উঠোনে উৎসব দেখতে আসে মানুষ। কেউ পাখি কিনতে, কেউ শুধু সৌন্দর্য দেখতে, কেউ আবার স্বপ্ন শেখার জন্য। এ ডানা শুধু পাখির নয়, আমারও স্বপ্নের ডানা। কম খরচে, কম জায়গায়, কম ঝুঁকিতে এক তরুণ গড়ে তুলেছেন নতুন এক সম্ভাবনা। সরকারি কর্মকর্তারাও মুগ্ধ, কারণ এই খামারে শুধু পাখি নয়, লুকিয়ে আছে বেকারত্ব দূর করার পথ।
রঙিন ডানার ভীড়ে দাঁড়িয়ে মোশাররফ বলেন, যদি ভালোবাসা থাকে, তবে প্রতিটি শখই একদিন হয়ে উঠতে পারে সাফল্যের আলো। ঠিক এমনই দৃশ্য এখন দেখা যায় ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার বাচোর ইউনিয়নের সহদোর গ্রামে। যেখানে শখের বশে পাখি পালন শুরু করে আজ বাণিজ্যিক সাফল্যের উজ্জল উদাহরণ হয়ে উঠেছেন তরুণ উদ্যোক্তা মোশাররফ হোসেন। পাঁচ বছর আগে তেমন কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই কয়েক জোড়া পাখি কিনে পালন শুরু করেছিলেন তিনি। তখন শুধু ভালোবাসা, শখ আর আগ্রহ ছাড়া কিছুই ছিল না। কিন্তু সময়ের সাথে সেই শখই পরিণত হয় পেশায়। ধীরে ধীরে তিনি বাড়ির আঙিনায় গড়ে তুলেছেন রঙিন পাখির এক দৃষ্টিনন্দন খামার, যেখানে আজ রয়েছে শানকুনুর, পাইনআপেল, কুনুর, সোনালী ময়না, কোকাটেল, লাভবার্ডসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশিবিদেশি পাখি। শুধু পাখিই নয় মোশাররফের খামারে রয়েছে আমেরিকান লাতামেক্স কুকুর এবং পার্ফিয়ান বিড়ালও। এগুলো দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করেন আশপাশের মানুষ, এমনকি দূর-দূরান্ত থেকেও আসেন অনেকেই। কেউ আসে পাখি কিনতে, কেউ আসে শুধু রঙিন পাখিদের সৌন্দর্য দেখতে।
স্থানীয়রা জানান, পাখির প্রতি মোশাররফের ভালোবাসা ও নিষ্ঠা সত্যিই অবাক করার মতো। দিনে কয়েকবার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, সময়মতো খাবার দেওয়া, পাখির স্বাস্থ্যের যত্ন তিনি সবকিছু করেন গভীর মনোযোগ দিয়ে। আর সেই যত্নের কারণেই তার পাখি দ্রুত বড় হয়, রোগবালাই কমে, বিক্রি বাড়ে। শখের এই কাজ এখন তাকে এনে দিয়েছে পরিচিতি, আর্থিক লাভ আর উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা।
মোশাররফ বলেন, শখের বশে শুরু করেছিলাম। আস্তে আস্তে দেখলাম মানুষ আগ্রহী, চাহিদা বাড়ছে। তাই বাণিজ্যিকভাবে শুরু করলাম। এখন আমি নিয়মিত আয় করছি। সামনে আরও বড় করে পাখির খামার করতে চাই। সরকারিভাবে সহায়তা পেলে এলাকার বেকার যুবকদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে পারবো।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা রুপম চন্দ্র মহন্ত বলেন, পাখির রোগবালাই খুব কম। তাই বিদেশি পাখি পালন কম খরচে এবং কম ঝুঁকিতে অত্যন্ত লাভজনক। আমরা তার খামার নিয়মিত মনিটরিং করছি এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছি। মোশাররফের মতো তরুণরা এগিয়ে এলে এলাকায বেকারত্ব কমবে।
অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাজিদা বেগম বলেন, প্রাণিসম্পদ মেলায় মোশাররফের খামারের পাখি দেখে খুব ভালো লেগেছিল। তাই আমার ছোট ভাগিনার জন্য এখান থেকে একটি পাখি কিনেছি। আমি মনে করি, এমন সৃজনশীল কাজ তরুণ সমাজকে বদলে দিতে পারে। মোশাররফের এই সাফল্য এখন এলাকার তরুণদের জন্য প্রেরণার নাম। পাখির রঙিন ডানা শুধু তার বাড়িতে সৌন্দর্য সৃষ্টি করেনি, বরং তার জীবনসংগ্রামে এনেছে আলোর দিশা। গ্রামবাংলার এক সাধারণ উঠোন আজ হয়ে উঠেছে সম্ভাবনার কেন্দ্র। আর সেই সম্ভাবনার ডানা ঝাপটানো তরুণের নামমোশাররফ হোসেন।

