

নুরুল ইসলাম আসাদ, উজিরপুর (বরিশাল) প্রতিনিধি: বরিশালের উজিরপুরে মুক্তিযুদ্ধের নবম সেক্টর কমান্ডার, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে অসামান্য ভূমিকায় অবিস্মরণীয় বীরযোদ্ধা মেজর এম.এ. জলিলের ৩৬তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা ও স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯ নভেম্বর রোজ বুধবার সকাল ৯টায় তাঁর পৈতৃক বাড়িতে, তাঁরই নামে প্রতিষ্ঠিত মেজর এম.এ. জলিল নূরানী মাদ্রাসা ও এতিমখানার মাঠ প্রাঙ্গণে এ স্মরণসভা ও দোয়া আয়োজন করা হয়। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, শিক্ষক, ছাত্রসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ আলোচক হিসেবে বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবীবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধকালীন স্মৃতিচারণ করে বলেন, মেজর এম.এ. জলিল ছিলেন নবম সেক্টরের এক সাহসী ও বিচক্ষণ কমান্ডার, যিনি জীবন বাজি রেখে জাতির জন্য কাজ করেছেন। তাঁর নেতৃত্বের দৃঢ়তা ও অদম্য মনোবল মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানাতে মেজর জলিলের কর্মময় জীবনকে আরও ব্যাপকভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।
সভায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শহীদুল ইসলাম খান তাঁর বক্তব্যে বলেন, মেজর এম.এ. জলিলের মতো দেশপ্রেমিক মানুষ জাতির সম্পদ। স্বাধীনতার পর তিনি যেভাবে সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণে ভূমিকা রাখতে চেয়েছিলেন, আজকের প্রজন্মের উচিত সেই আদর্শকে ধারণ করা। তিনি বলেন, এমন আয়োজন নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে আরও সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরবে।
মঞ্চে সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ড. এস.এম. আবুল হাসান। তিনি বলেন, একজন সেক্টর কমান্ডারের জীবন শুধু যোদ্ধার জীবন নয়—তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পথনির্দেশনা। তিনি মেজর জলিলের দৃঢ়তা, সততা ও মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসার কথা স্মরণ করেন এবং তাঁর স্মৃতিকে জাতির ইতিহাসে অমর রাখার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি উজিরপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মহেশ্বর মন্ডল বলেন, “মেজর এম.এ. জলিল ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর নেতৃত্ব, বীরত্ব ও দায়িত্ববোধ জাতিকে শক্তিশালী করেছে।” তিনি আরও বলেন, এমন আয়োজন যুবসমাজকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্দীপ্ত করবে এবং দেশগঠনে অনুপ্রাণিত করবে।
অনুষ্ঠানের আবেগঘন মুহূর্ত ছিল ডাঃ আব্দুর রহিমের বক্তব্য। তিনি ও মেজর এম.এ. জলিল ছিলেন মামাতো-ফুপাতো ভাই। তাই তিনি স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, “তিনি শুধু জাতির বীর ছিলেন না-তিনি ছিলেন আমার রক্তের মানুষ। ছোটবেলা থেকে তাঁর দেশপ্রেম, সততা ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা দেখে আমরা অনুপ্রাণিত হয়েছি। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে মন ভেঙে আসে। এমন মহৎ মানুষ দেশকে আলোকিত করেন, সমাজকে পথ দেখান।” তিনি মেজর জলিলের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন উজিরপুর পৌর বিএনপির সভাপতি শহিদুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, “মেজর এম.এ. জলিল ছিলেন নির্ভীক, সৎ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের এক শক্তিশালী কণ্ঠস্বর। তাঁর মতো নেতৃত্ব আজকের সমাজ ও রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রয়োজন।” তিনি বলেন, তাঁর দেশের প্রতি আনুগত্য ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে ছিল এবং তাঁর স্মৃতি জাতীয় ইতিহাসে চিরস্মরণীয় থাকবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডাঃ আব্দুর রহিম, সাবেক বিভাগীয় পরিচালক-স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বরিশাল বিভাগ। সঞ্চালনা করেন মাঈনুল আহাদ মামুন সিকদার ও আলী হোসেন সিকদার রূপক। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এম এ জাকারিয়া, মোঃ আকরাম আলী, সমাজসেবক নুরুল ইসলাম সিকদার, পৌর বিএনপির সহ-সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক, সাংগঠনিক সম্পাদক সোহেল হাওলাদার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা জামান সুমন বালী, সবুর হাওলাদার, মোঃ সোহেল সিকদার ও মোঃ সানজিদুল ইসলাম মিঠু সিকদারসহ রাজনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষাঙ্গনের নেতৃবৃন্দ এবং মাদ্রাসার শতশত ছাত্র-শিক্ষক।
অনুষ্ঠান শেষে মেজর এম.এ. জলিলসহ সকল শহীদ মুক্তিযোদ্ধার রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। অত্র মাদ্রাসার আলেম এ মোনাজাত পরিচালনা করেন। এরপর সবাই তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
