

এমএ জলিল সরকার, পার্বতীপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: উচ্চ আদালতের আদেশ, আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত পক্ষে থাকার পরও স্থায়ী নিয়োগ মিলছে না দিনাজপুরের পার্বতীপুরে বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির ৮৭ জন আউটসোর্সিং (তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নিয়োজিত) কর্মচারীর। খনি কর্তৃপক্ষ নানা টালবাহানা করে সময়ক্ষেপণ করছেন।
স্থায়ী নিয়োগ না দেওয়ার নেপথ্যে অন্যতম কারণ প্রফিট বোনাস। কয়লাখনি প্রতিবছর মোটা অঙ্কের টাকা মুনাফা করে। নীট মুনাফার ৫ শতাংশ প্রফিট বোনাস হিসেবে পায় স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ। প্রফিট বোনাসের পরিমাণ কমে যাবে- এ জন্যই দীর্ঘদিন ধরে এসব কর্মচারীর স্থায়ী নিয়োগ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিতে বর্তমানে ১৭৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। গত বছর কর্মকর্তা-কর্মচারীর ফান্ডে প্রায় ১৮ কোটি টাকা প্রফিট বোনাস আসে। এতে করে প্রত্যেকে প্রায় ১১ লাখ টাকা করে পায়। কিন্তু ৮৭ জনকে নিয়োগ দেওয়া হলে পরিমাণ কমে যেতো। ৮৭ জনকে নিয়োগ দেওয়া হলে তখন ২৬২ (১৭৫+৮৭) জন ৭ লাখ টাকার নীচে পেত।
সুত্র জানায়, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিতে প্রায় ২০ বছর ধরে ৮৭ জন আউটসোর্সিং কর্মচারী রয়েছেন। ২০০৯ সালের ১৫ মে খনি কর্তৃপক্ষ ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসীর মধ্যে সম্পাদিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী এসব কর্মচারীর স্থায়ী নিয়োগ দেওয়ার কথা। কিন্তু খনি কর্তৃপক্ষ নানা টালবাহানা করে তাদের স্থায়ী নিয়োগ আটকে রেখেছে। চাকুরী স্থায়ী না হওয়ায় প্রফিডেন্ট ফান্ড, পেনশন, ইনক্রিমেন্ট, প্রফিট বোনাস ও ডাস্ট এলাউন্সসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা হতে বঞ্চিত। এছাড়া রয়েছে যে কোন সময়ে বিনা কারণে চাকুরিচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি।
এ অবস্থায় নিরুপায় হয়ে চাকুরী স্থায়ীকরণের লক্ষ্যে ৮৭ জন আউটসোর্সিং কর্মচারীর পক্ষে মোঃ সোহেল রানা হাইকোর্টে রিট পিটিশন (নম্বর-১২৮৮/২০১৮) দায়ের করেন। গত ০৮-১০-২০১৮ তারিখে হাইকোর্টের মহামান্য বিজ্ঞ বিচারপতিগণ উভয়পক্ষের যুক্তিতক শুনে এবং দাখিলকৃত কাগজপত্রাদি পর্যালোচনা করে এই মর্মে রায় প্রদান করেন যে, খনিতে কর্মরত আউটসোর্স কর্মচারীদের বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করে ২০০৯ সালের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির অধীনে সেই সময়ে বিদ্যমান বিসিএমসিএল এর সাংগঠনিক কাঠামো (অর্গানোগ্রাম) অনুযায়ী কর্মচারী পদে স্থায়ী নিয়োগে অগ্রাধিকারপূর্বক নিয়োগ প্রক্রিয়াটি ৩ (তিন) মাসের মধ্যে সম্পন্ন করার নির্দেশনা প্রদান করেন। মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে বিসিএমসিএল কর্তৃপক্ষ গত ৩১-০৭-২০১৯ তারিখে আপীল বিভাগে সিপিএলএ নং-২৩২৭/২০১৯ দায়ের করে। মহামান্য আপিল বিভাগ গত ৩০-০৪-২০২৩ তারিখে হাইকোর্ট-এর আদেশ বহাল রেখে খনি কর্তৃপক্ষের সিপিএলএ নং-২৩২৭/২০১৯ ডিসমিস করে দেয়। পরবর্তীতে বিসিএমসিএল কর্তৃপক্ষ মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে গত ১৯-০৬-২০২৩ তারিখে রিভিউ পিটিশন দায়ের করে (পিটিশন নং-২০০/২০২৩)। মহামান্য আপিল বিভাগ গত ২৫-০১-২০২৪ তারিখে পূর্বের আদেশ বহাল রেখে রিভিউ পিটিশন ডিসমিস করে দেয়। এরপর খনি কর্তৃপক্ষ আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতামত চায়। “হাইকোর্টের রিট পিটিশন নং-১২৮৮/২০১৮ এর রায় বাস্তবায়নে আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে” বলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের মতামত অনুবিভাগ থেকে গত জুন মাসের শেষে খনি কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেওয়া হয়। এরপরও স্থায়ী নিয়োগ প্রদানে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি কর্তৃপক্ষ।
রিট আবেদনকারী মাসুদ রানাসহ তোফায়েল আহমেদ, আল মেহেদি, তাজমুল ইসলাম জানান, উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে তারা ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়ার জন্য সময়সীমা বেধে দিয়েছিল খনি কর্তৃপক্ষকে। এ অবস্থায় দিনাজপুর জেলা প্রশাসন, পার্বতীপুর উপজেলা প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর মধ্যস্থতায় খনি কর্তৃপক্ষে সাথে ২২ জুলাই তাদের বৈঠক হয়। বৈঠকে স্থায়ী নিয়োগের আশ্বাস দিয়ে আগামী ৬ আগস্ট পর্যন্ত সময় চাওয়া হয়। তারা তা মেনে নিয়েছেন। এ সময়ের মধ্যে দাবি বাস্তবায়নে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে কঠোর কর্মসূচীর মাধ্যমে দাবি আদায় করা হবে বলে তারা জানান।
বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিএমসি এল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মোঃ সাইফুল ইসলাম জানান, উচ্চ আদালতের রায় বাস্তবায়নে তারা কাজ শুরু করেছেন। ইতোমধ্যে একটি নিয়োগ কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন, আদালয়ের রায়ে ৮৭ জনকে নিয়োগ দেওয়ার কথা সরাসরি বলা হয়নি। রায়ে “শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বয়স শিতিল করে নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের নিয়োগ দিতে” বলা হয়েছে। কিন্তু রিটকারীরা ৮৭ জনেরই নিয়োগ চাচ্ছে। এ বিষয়ে সুস্পষ্ট মতামতের জন্য তারা (খনি কর্তৃপক্ষ) সংশ্লিষ্ট আদালতে আবেদন করেছেন। আদালতের মতামত এলে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে বলে এমডি জানান। তবে রিট আবেদনকারী মাসুদ রানা এমডি’র বক্তব্যের সাথে ভিন্নমত পোষণ করে বলেন, ৮৭ জনের মধ্যে ইতিমধ্যে দু’জন মারা গেছেন। কয়েকজন চাকুরী ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। তারা এখন ৮২ জন রয়েছেন। ৮২ জনের নিয়োগ চাওয়া হয়েছে ৮৭ জনের নয়।
