

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি: চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ ও সদর উপজেলায় পদ্মা নদীর প্রায় ৮ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। ভারতের ফারাক্কা ব্যারেজের গেট খুলে দেয়ার সাথে সাথে পদ্মার এই ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। নতুন নতুন এলাকায় ভাঙনদেখা দেয়ায় ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ প্রতিদিনই ঘরবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শিবগঞ্জের দুর্লভপুর ইউনিয়নের যে স্থানে ভারতের গঙ্গা নদী পদ্মা নাম ধারণ করেছে, সেই স্থান থেকে ফারাক্কা বাঁধের দূরত্ব মাত্র ১৮ কিলোমিটার। ভারী বর্ষায় পাহাড়ি ঢল নেমে এলেই ফারাক্কা ব্যারেজের বেশকয়েকটি গেট খুলে দিয়েছে। এর ফলে পদ্মা আরো বেশি রাক্ষসী ও খরস্রোতা হয়ে উঠেছে। তখনই শুরু হয়েছে তীব্র নদী ভাঙন। সেসময় বালিভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে লাভ হয় না। বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো স্রোতের তোড়ে তলিয়ে যায়। ফারাক্কার গেট খুলে দেয়ার ফলে গত ৩ সপ্তাহ ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মা নদীতে অস্বাভাবিক হারে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। হঠাৎ করে পানি বৃদ্ধিতে নদীতে তীব্র স্রোত থেকে ভাঙন দেখা দিয়েছে পদ্মা নদীর তীরবর্তী বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে।
কয়েকদিনের পদ্মার ভাঙনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের গাউনিয়া বাগপাড়া থেকে খলিফার চর পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটারের বেশী এলাকা জুড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। আর নারায়ণপুর ইউনিয়নের বাতাসার মোড়, দেবীপুর, রুস্তম মোড়লপাড়া, খলিফার চর, আলাতুলি ইউনিয়নের, পোল্লাডাঙ্গা বিজিবি ক্যাম্প এলাকার বতন বাড়ি, ফসলি জমি, মসজিদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আর ভাঙনের হুমকির মুখে পড়েছে নারায়ণপুর বাতাসার মোড় কমিউনিটি ক্লিনিক, বাতাসার মোড় হাটবাজার, নারায়ণপুর ইউনিয়ন পরিষদ, ফিল্ডবাজার, ফিল্ডবাজার কমিউনিটি ক্লিনিক, ফিল্ডবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দোভাগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চর জগনাথপুর মহিলা গার্লস স্কুল ও বাদশাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
অন্যদিকে, ভারতের ফারাক্কার ব্যারেজের সম্মুখভাগ শিবগঞ্জ উপজেলার দূর্লভপুর ও পাঁকা ইউনিয়নের শিবগঞ্জের মনোহরপুুুর ও আইয়ুবের ঘাট এলাকায় প্রায় ৩ কিলোমিটারের বেশী এলাকা জুড়ে পদ্মা নদীর বামতীরে ভাঙন চলছে। আর মনোহরপুর, দোভাগী ঝাইলপাড়া, ফিল্ডবাজার, বাদশাপাড়া, বোনপাড়া এলাকার বহু বসতবাড়ি, ফসলি জমি, মসজিদ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
নারায়ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজির হোসেন জানান, নারায়ণপুর ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের একাংশে নদী ভাঙন শুরু হয়েছে। যে কোনো সময় পুরো ভবনটি নদীতে নেমে যেতে পারে। সেজন্য পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, সম্পদ সরানোর কাজ চলছে। তিনি আরো জানান, নারায়ণপুর ইউনিয়নের ১, ৩ ও ৭ নং ওয়ার্ডের শতাধিক ঘরবাড়ি ফসলি জমি, গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
ফিল্ড বাজারের সৈয়ব আলী জানান, গত ২০ দিন ধরে এই এলাকার বাড়িঘরগুলো নদীতে নেমে যাচ্ছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমরা বসবাস করছি। রাতের অন্ধকারে দেবে গেলে এলাকার বহু মানুষের ক্ষতি হবে। জীবনের ভয়ে কেউ কেউ নিজ ঘরবাড়ি সরিয়ে নিয়ে অন্যত্র স্থানান্তরিত হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নারায়ণপুর এবং শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁকা, দুর্লভপুর ও উজিরপুর ইউনিয়ন নদী ভাঙন কবলিত। এসব এলাকার হাজার হাজার হেক্টর আবাদি জমি ও বসতবাড়ি এর আগে পদ্মা নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এ অঞ্চলের প্রতিটি পরিবারই কমপক্ষে ৭/৮ বার করে নদী ভাঙনের কবলে পড়েছেন। হাজার হাজার পরিবার অন্যত্র ঠাঁই নিতে বাধ্য হয়েছেন, বললেন দোভাগী ঝাইলপাড়া এলাকার আব্দুর রহমান।
সরকারি হিসাব মতে, গত এক দশকে ভিটেমাটি হারিয়েছেন প্রায় এক হাজার শ্রমজীবী মানুষ। আর এলাকাবাসীর মতে, এই সংখ্যা অন্তত ৫ হাজার। বিলীন হওয়া আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ২ হাজার হেক্টর। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪’শ কোটি টাকার মতো। তথ্যানুযায়ী, ১৯৯৫ সাল থেকে শুরু করে নদী ভাঙন প্রতিরোধে সরকার বেশ কয়েকবার পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই বিপুল পরিমাণ অর্থ ও কর্ম পরিকল্পনা অনেকটায় বিফলে গেছে।
চলতি বছরের ৩ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মানদী ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. আ. ন. ম. বজলুর রশীদ। ওই সময় তিনি জানিয়েছিলেন, ভারত থেকে বয়ে আসা পদ্মা নদীর ভাটিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রায় ২৫ কিলোমিটার নদী ভাঙন কবলিত এলাকা রক্ষায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বসতবাড়ি ও ফসলী জমি স্থায়ীভাবে নদী ভাঙনের কবল থেকে রক্ষা পাবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম আহসান হাবীব জানান, সদর উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের গাউনিয়া বাগপাড়া থেকে খলিফার চর পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার, শিবগঞ্জের মনোহরপুুুর ও আইয়ুবের ঘাট এলাকায় প্রায় দেড় থেকে ৩ কিলোমিটার জুড়ে পদ্মা নদীর বামতীরে ভাঙন চলছে। নদী তীরের মানুষ ঘরবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ও জিওটিউব ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়া সদর উপজেলার আলাতুলি ইউনিয়নের পোল্লাডাঙ্গা বিজিবি ক্যাম্প এলাকায় জিওব্যাগ ও জিওটিউব ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি আরো জানান, পদ্মা নদীর ভাঙন প্রতিরোধে বাঁধ নির্মাণের প্রকল্পটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সেটি এখনো একনেকে পাস হয়নি। সকল প্রক্রিয়া শেষ হলে সরেজমিনে কাজ শুরু হতে পারে আগামী বছর।
প্রসঙ্গত, পদ্মা নদীর বামতীর স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে কিছু অংশ এখনো বাঁধ নির্মাণ করা হয়নি। অন্যদিকে ডান তীরের মানুষ এখন পর্যন্ত রয়েছে ভাঙন আতঙ্কে।
